সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ ১৯:০৩ Asia/Dhaka

ভারতে কৃষি সংক্রান্ত বিলের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকার থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দপ্তরের মন্ত্রী হরসিমরত কাউর বাদল ইস্তফা দিয়েছেন। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে তিনি ইস্তফা দেন। আজ (শুক্রবার) প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ তাঁর ইস্তফাপত্র অনুমোদন করেছেন। পাঞ্জাবের শিরোমণি অকালি দলের নেত্রী হরসিমরত কাউর খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন।

এদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিলের প্রতিবাদে পাঞ্জাবে বিভিন্ন কৃষক সংগঠন আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর বন্ধের ডাক দিয়েছে। কিষাণ মজদুর সংঘর্ষ সমিতির পক্ষ থেকে আগামী ২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবে ‘রেল রোকো’ কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে অকালি নেত্রী হরসিমরত কাউর বলেন, ‘কৃষকবিরোধী অর্ডিন্যান্স ও আইনের প্রতিবাদে আমি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়েছি। কৃষকদের কন্যা ও বোন হিসেবে আমি গর্বিত।’

গতকাল শিরোমণি অকালি দলের নেতা সুখবীর সিং বাদল সকলকে চমকে দিয়ে লোকসভায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আমার স্ত্রী হরসিমরত কাউর বাদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন। সেইমতো মন্ত্রিসভা থেকে হরসিমরত ওইদিন রাতেই ইস্তফা দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ 

এভাবে কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘এনডিএ’ জোট শরিক অকালি দলের মন্ত্রীর আচমকা ইস্তফায় মোদি সরকার বড় ধাক্কা খেলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হরসিমরত কাউরই প্রথম মন্ত্রী যিনি মোদি মন্ত্রীসভা থেকে ইস্তফা দিলেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের আনা দুটি বিলকে ‘অসংসদীয়’ বলে অভিহিত করে তৃণমূলের লোকসভার মুখ্যসচেতক আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের কটাক্ষ করে বলেন, সরকারের লক্ষ্যই হল সব কিছু বেচে দেওয়া। ফসলের উপরে এবার থেকে কৃষকদের আর কোনও অধিকারই থাকবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাহুল গান্ধী এমপি

প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী এমপি বলেন, ‘কৃষকদের উপার্জন বাড়াবেন বলেছিলেন মোদিজি। কিন্তু এখন ‘কালা কানুন’ এনে আর্থিক দিক দিয়ে শোষণ করতে চাচ্ছেন। এটা জমিদারিরই নতুন রূপ।’

বিরোধীদের অভিযোগ, অম্বানী, আদানিদের মতো ‘বন্ধু’ শিল্পপতিদের সুবিধা দিতেই সরকার পদক্ষেপগ্রহণ করেছে। যদিও বিরোধীদের তীব্র আপত্তি ও বিরোধিতা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার ‘কৃষি পণ্য লেনদেন ও বাণিজ্য উন্নয়ন’ অধ্যাদেশ ও ‘কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত করতে কৃষকদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন চুক্তি’ সংক্রান্ত বিল পাস হয়ে যায়। 

করোনাজনিত লকডাউনের মধ্যে গত জুনে কৃষিক্ষেত্রে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার। এতে অত্যাবশ্যক পণ্য আইনে সংশোধন করে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, গম, ভোজ্যতেল, তেলবীজ যত ইচ্ছে মজুত করার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ী, রফতানিকারী ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংস্থাগুলো যাতে চুক্তির ভিত্তিতে চাষ করিয়ে সরাসরি চাষিদের থেকে ফসল কিনতে পারে, তার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া, বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে ব্যবসায় ফসলের দাম নিশ্চিত করতে ও চাষীদের স্বার্থরক্ষায় অধ্যাদেশ জারি হয়। এবার তা বিল পাসের মধ্য দিয়ে আইনে পরিণত করার চেষ্টা হতেই বিভিন্নমহল থেকে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। বিশেষকরে কৃষিপ্রধান পাঞ্জাবে ওই ইস্যুত রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ড. ইমানুল হক

এ প্রসঙ্গে আজ (শুক্রবার) ‘ভাষা ও চেতনা সমিতি’র সম্পাদক ও কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমানুল হক রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘নতুন কৃষি আইন শুধু জমিদারি প্রথা ফিরিয়ে আনা  বললে কম বলা হবে। কিছু কিছু ভালো জমিদারও ছিলেন। এটা হচ্ছে ঔপনিবেশিক নীলকর প্রথা। চুক্তিভিত্তিক চাষে কৃষকদের সর্বনাশ হবে। জমি ও ফসলের উপরে তাঁরা অধিকার হারাবেন। বকলমে বৃহৎ শিল্পপতি  আদানি,  আম্বানি ও তাঁদের পোষ্যরা জমির মালিক হবে। কৃষকরা ঋণের জালে আরও জড়াবেন। খেতমজুর কাজ হারাবেন। বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহারে  শ্রমজীবীর সংখ্যা কমবে। ভিখারি বাড়বে। কমদামে চাষী ফসল তুলে দিতে বাধ্য হবে ‘নয়া নীলকর’দের। আর মধ্যবিত্ত, স্বল্পবিত্তকে বেশি দামে   কিনতে হবে। খাদ্যের হাহাকার তৈরি হবে। মজুতদারি বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন অধ্যাদেশ জারি করে তুলে নেওয়ার কুফল ফলছে। ৫ টাকায় চাষীর বিক্রি করা আলু এখন ৩৫/৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ৫ পয়সা কেজিতে বিক্রি করা পেঁয়াজ এখন ৪০ টাকা। আরও বাড়বে। মার্চ মাসে যে সর্ষে তেলের দাম ছিল ১০৫ টাকা লিটার এখন তা ১৩৫ টাকা লিটার। চালের দাম চড়ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই কৃষি আইন অন্ধা আইন। পাঞ্জাবের কৃষকরা চুক্তি চাষের কুফল জানেন। ২০০৪ সালে সাত হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছিলেন এই চুক্তি চাষের কুফলে।‌ তাঁরা ঘোষণা করেছেন, এই আইন যারা সমর্থন করবে,  তাদের এলাকায় ঢুকতে দেবে না। ফলে পাঞ্জাব থেকে জেতা অকালি দলের সাংসদ ও মন্ত্রী হরসিমরাত কাউর বাদল পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এটা মোদি সরকারের ওপরে একটা আঘাত। কিন্তু ওঁরা বিক্রি হয়ে গেছেন  আদানি-আম্বানিদের স্বার্থের কাছে। খোঁজ নেওয়া দরকার, আদানি, আম্বানির  সংস্থায় কাদের গোপন অর্থ খাটে। হরিয়ানার কৃষকরাও পথে নেমেছেন। ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার বীর কৃষকরা। তাঁদের অভিনন্দন। পশ্চিমবঙ্গের কৃষক আন্দোলন কৃষকদের দ্বারা পরিচালিত নয়। তাই তাঁরা ঘুমিয়ে আছেন। তৃণমূল ও বামেদের উচিত এই প্রশ্নে আসল শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা। মধ্যবিত্ত শ্রমিক কর্মচারীদেরও কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে দেশে খাদ্যের হাহাকার শুধু নয়, মনুষ্যসৃষ্ট মন্বন্তর দেখা দেবে। এই দুই আইন বাতিল করতেই হবে। আমরাও পথে নামবো কৃষকদের সমর্থনে।’#  

 

পার্সটুডে/এমএএইচ/এআর/১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

ট্যাগ

মন্তব্য