নভেম্বর ৩০, ২০২০ ১৬:১০ Asia/Dhaka
  • মাওলানা ড. কালবে সাদিক
    মাওলানা ড. কালবে সাদিক

উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষনৌতে অল ইন্ডিয়া পার্সোনাল ল’বোর্ডের সহ-সভাপতি, মুসলিম সমাজ সংস্কারক, লক্ষনৌতে শিক্ষাব্যবস্থায় বিপ্লব সৃষ্টিকারী,  উপমহাদেশের প্রগতিশীল আলেম মাওলানা কালবে সাদিক গত মঙ্গলবার  ইন্তেকাল করেছেন।

‘আমি সেই কথা বলতে যাচ্ছি, যা অনেক বড় বড় লোকেদের খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু আমি এসবের ধার ধারি না। আমি যখন লক্ষনৌয়ের ইমামবাড়ার উঁচু প্রাচীর থেকে নীচে দেখি,  তখন প্লাস্টিকের ফয়েল দিয়ে তৈরি কয়েক ডজন কুঁড়েঘর দেখা যায়। ওই কুঁড়েঘগুলো লক্ষনৌয়ের ইমামবাড়ার শান-শওকতের যারা প্রশংসা করেন তাঁদের প্রত্যেকের কাছে দৃশ্যমান। ওই দরিদ্র নিঃস্ব, গৃহহীন মানুষগুলো উচ্চতার নীচে প্রদর্শিত হয়।  আমি বলছি যে,   আমরা যদি দরিদ্র মানুষদের হৃদয়ে জায়গা করতে না পারি, যদি আমরা তাদের প্রতি করুণা না করতে পারি তবে খোদা উঁচু উঁচু ইমামবাড়া, মসজিদ এবং মন্দির তৈরিতে খুশি হবেন না। খোদার করুণার জন্য, আমাদের অসহায়, মজলুমের বেদনা বুঝতে হবে। তাদের প্রতি সহৃদয় হতে হবে।’

২০০৩ সালে, মীরাটে একটি সম্মেলনের সময় যখন কয়েক হাজার লোকের উপস্থিতিতে মাওলানা ড. কালবে সাদিক এসব কথা বলেছিলেন, তখন সমস্ত লোকজন নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। একবারে শান্ত। এমন শক্তিশালী কথা!  মীরাটে ফয়েজ-এ-আম ডিগ্রি কলেজে ময়দানে কয়েক হাজার সুন্নি মুসলিম এবং কয়েক ডজন বড় বড় উলামা (মাওলানা আঞ্জারশাহ কাশ্মীরি, মাওলানা আরশাদ মাদানী, মাওলানা জালালউদ্দীন উমরী) উপস্থিত ছিলেন। মাওলানা কালবে সাদিক তাঁদের মধ্যে গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর ২০ মিনিটের বক্তব্যের পরেও উপস্থিত জনতার মধ্যে সম্পূর্ণ নীরবতা ছিল। বক্তব্য শেষে মাওলানা যখন তাঁর নিজের জায়গায় বসেছিলেন, পুরো মজমা তাঁর সম্মানে নিজ জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর মঞ্চে চার কথা বলা মাওলানা কালবে সাদিকের বক্তব্যেরই এতটাই প্রভাব পড়েছিল।

তাঁর ইন্তেকালের পরে তাঁর দু’বার জানাজা নামাজ হয়েছিল। একবার শিয়া এবং দ্বিতীয়বার সুন্নি মুসলিমরা জানাজা নামাজ আদায় করেছেন। এ দিন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাজার সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ শোকে, দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁকে শেষবারের মত দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ রাস্তার পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়েছিলেন। শিয়া-সুন্নিরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাওলানার জানাজায় শেষবারের জন্য কাঁধ দেওয়ার জন্য দেড় কিমি পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিলেন। এই উন্মাদনার বৃহত্তম কারণ ছিলেন মরহুম মাওলানা কালবে সাদিক। তিনি এমন শিয়া আলেম ছিলেন যিনি সুন্নিদের অন্তরে ছিলেন। তিনি সুন্নিদের মধ্যে সুন্নি এবং শিয়াদের মধ্যে শিয়া ছিলেন।

লক্ষনৌয়ের উর্দু সাহিত্যিক সুহাইল ওয়াহিদ বলেন,  ‘তিনি ছিলেন মুসলিমদের প্রকৃত সমাজ সংস্কারক। তাঁর এখানে কারও সাথে কখনও বৈষম্য হয়নি। তিনি শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে কাজ করেছিলেন। তিনিই প্রথম শিয়া আলেম ছিলেন যিনি সুন্নি মুসলিমদের সাথে নামাজ পড়েছেন,  সুন্নি ইমামের পিছনেও নামাজ আদায় করেছেন এবং সুন্নি মুসলিমদের ইমামতিও করেছেন।

তাঁর ইন্তেকালের পরে শিয়া ও সুন্নি মুসলিমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জানাজা নামাজ পড়েছেন। সুন্নিরা আলাদাভাবেও তার জানাজা আদায় করেছেন। ভারতে শিয়া ও সুন্নি মুসলিমদের ভালোবাসা একসাথে পেয়েছেন, মাওলানা কালবে সাদিক ছাড়া এমন একজন আলেমের কথা বলা যায় না।

৮৩ বছর বয়সী মাওলানা কালবে সাদিক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। একইসঙ্গে তিনি ক্যান্সারেও ভুগছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রে প্রকাশ, তাঁকে ইরাকের শীর্ষ শিয়া আলেম গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানি শিয়া-সুন্নি ঐক্যের জন্য বলেছিলেন। তিনি ইরাকে গিয়েছিলেন এবং তারপর থেকে তিনি ভারতে শিয়া-সুন্নির মধ্যে ভালোবাসাকে শক্তিশালী করতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তিনি প্রায়ই সুন্নি মুসলিমদের সঙ্গে রোজা-ইফতার করতেন। তাঁদের সমস্ত সমস্যা শেয়ার করতেন।

২০১৫ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মাওলানা কালবে সাদিক বলেন, ইরাকে আমার সফরকালে ইরাকের শীর্ষ শিয়া আলেম গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানি সাহেব আমাকে তাঁর বাসায় ডেকে ভারতে গিয়ে সমস্ত শিয়াদের বলতে বলেছিলেন সুন্নিরা কেবল তাঁদের ভাই নয়, বরং রুহ ও জীবন। এরপরে মাওলানা কালবে সাদিক শিয়া-সুন্নি ঐক্যের জন্য নিজের গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

লক্ষনৌয়ের চিত্রশিল্পী হাফিজ কিদওয়াই বলেছেন, 'তিনি শিয়া ও সুন্নি নয়, সমস্ত মানবতার জন্য অসাধারণ কাজ করেছেন। যে শিশুদের পায়ে চপ্পল পর্যন্ত ছিল না, তাঁর প্রচেষ্টার কারণে তারা ডাক্তার হয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি তাঁর গোটা জীবন খিদমতে  উৎসর্গ করেছিলেন। লক্ষনৌয়ের সড়কে প্রবাহিত অশ্রু এর সাক্ষ্য দিচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে শেষবারের মতো কোনও সাধারণ জায়গায় মাওলানা কালবে সাদিক অসুস্থ অবস্থায় লক্ষনৌয়ের ঘণ্টাঘরে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি’র (এনআরসি) প্রতিবাদে অংশ নিতে পৌঁছেছিলেন। মূলত মুসলিম নারীদের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে সেসময়ে ওই প্রতিবাদ আন্দোলন চলছিল। তিনি মুসলিম নারীদের বীরত্ব ও সাহসিকতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তাঁরা জয়ী হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।

ঘণ্টাঘরের ওই প্রতিবাদ সভায় মাওলানা কালবে সাদিক তাঁর বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের তীব্র সমালোচনা করে  বলেছিলেন, ‘আজ দেশে যা কিছু ঘটছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এই দেশ মোদী-শাহের ইচ্ছায় নয়, সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হবে। কোনও মোদী বা  কোনও শাহ আমাদের ভবিষ্যত তৈরি করতে পারবেন না।’

সেই সময়ে ওই আন্দোলনকে প্রতিহত করতে ঘণ্টাঘর পার্কের আশেপাশের আলোর লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে মাওলানা কালবে সাদিক বলেন, ‘আজ প্রতিটি ঘরে আলো দেখা যায়, কিন্তু ঘণ্টাঘরের অন্ধকার এই সরকার দেখতে পাচ্ছে না। সিএএ এবং এনআরসি কালো আইন, এটি প্রত্যাহার করা উচিত’ বলেও মাওলানা কালবে সাদিক মন্তব্য করেন।

মাওলানা কালবে সাদিক বলেন, ‘কাউকে কারও থেকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশে বিদ্বেষ, নিপীড়ন ও নির্মমতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমি এখানে নারীদের সাহসের প্রশংসা করি। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা আমাদের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণভাবে তা চালিয়ে যাওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘জুলুম ও অত্যাচারের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এখানে গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র নয়।’  মাওলানা কালবে সাদিক গত দু’বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন। তিনি ওইদিন হুইল চেয়ারের সাহায্যে লক্ষনৌয়ের ঘণ্টাঘরে চলা মুসলিম নারীদের প্রতিবাদ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গোটা মুসলিম সমাজ এক প্রগতিশীল ও বলিষ্ঠ আলেম ও অভিভাবককে হারিয়েছে।    

পার্সটুডে/এমএএইচ/বাবুল আখতার/৩০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

 

ট্যাগ