ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ ১৬:৩২ Asia/Dhaka
  • শিরাজের একটি ভবনে আগুন দিয়েছে দুষ্কৃতিকারীরা
    শিরাজের একটি ভবনে আগুন দিয়েছে দুষ্কৃতিকারীরা

ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব সবসময়ই ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে এসেছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময় কিংবা ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচিতে বিভিন্ন বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে।

এসব নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে পাশ্চাত্য ইরানের ইসলামি সরকার ব্যবস্থার পতন ঘটানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে। 

পাশ্চাত্যের ইরান বিরোধী নানা অপকর্মের নেতৃত্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার ডেমোক্রেট কিংবা রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টরা যে যখনই ক্ষমতায় এসেছেন তারা সবাই গত ৪০ বছর ধরে ইরানের ইসলামি সরকারকে উৎখাত করার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তাদের কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। ইরানে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে গত ১৭ নভেম্বর থেকে রাজধানী তেহরানসহ বেশ কিছু শহরে সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইরানের এ গোলযোগকে সেদেশে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ হিসেবে লুফে নিয়েছিল। পাশ্চাত্য শুধু যে ইরানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের প্রতি সমর্থন দিয়েই ক্ষান্ত ছিল তাই নয় ইরান সরকার যাতে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেয় সেজন্য তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এটাও প্রমাণিত হয়েছে তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে একদল দৃস্কৃতিকারী যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার পেছনে পাশ্চাত্যের পরিকল্পনা ছিল। কারণ যেভাবে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা হয়েছে তা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ ছিল না বরং পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে তাণ্ডব চালানো হয়েছে।

ইরানে সাম্প্রতিক গোলযোগ সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা করতে গেল প্রথমেই এ ব্যাপারে মার্কিন অবস্থান এবং এরপর কয়েকটি ইউরোপীয় সরকারের অযাচিত মন্তব্য ও হস্তক্ষেপের বিবরণ তুলে ধরতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে এসেছেন। ওয়াশিংটনের অন্যায় নীতি মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য তিনি তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করেছেন। এজন্য তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হস্তক্ষেপ করার জন্য কোনো সুযোগকেই হাত ছাড়া করেননি। এমনকি তিনি নিজেকে ইরানের জনগণের বন্ধু বলেও দাবি করেছেন। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ইরানে গোলযোগ শুরুর পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অল্পসংখ্যক গোলযোগ সৃষ্টিকারী ও জ্বালাও পোড়াও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে বিবৃতি দেন। হোয়াইট হাউজ এক বিবৃতিতে জানায়, "ইরানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে এবং ওয়াশিংটন ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি দমন নীতির বিরোধী।"

ব্রায়ান হুক

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইরানের বিক্ষোভকারীদের ব্যাপারে হোয়াইট হাউজের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।

ইরান বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত ব্রায়ান হুক ইরানের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্য দিয়ে বলেছেন,"ইরানে ব্যাপক নাশকতামূলক তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের প্রতি আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।" অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ১৬ নভেম্বর টুইটবার্তায় তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দাবি করেন, "ইরানের জনগণের প্রতি আমেরিকার সমর্থন রয়েছে।" মার্কিন কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের পর ইরান সরকার মনে করে তারা আসলে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চায়।

ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন ইস্যুতে এ পর্যন্ত বহুবার তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও'র উত্থাপিত ১২টি অন্যায্য দাবি মেনে নিতে তেহরানকে বাধ্য করার জন্য ওয়াশিংটন ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি ইরানি জনগণের বন্ধু। অথচ তিনি পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়েছেন এবং ইরানের ভেতরে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন যার প্রভাব পড়ছে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর। ট্রাম্পসহ অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা বহুবার ইরানের ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টির হুমকি দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে তারা নিষেধাজ্ঞাসহ নানা কৌশলে ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরানের অধিকাংশ মানুষের সচেতনতার কারণে আমেরিকার সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও সাম্প্রতিক গোলযোগকে কেন্দ্র করে আমেরিকা সরাসরি নাশকতামূলক তৎপরতায় জড়িতদেরকে সংগঠিত ও পরিচালিত করেছে যাতে তাদের সে লক্ষ্য অর্জিত হয়।

মার্কিন থিঙ্কট্যাংক রনপলের পরিচালক দানিয়েল ম্যাক অদাময্‌ এ কথা ফাঁস করে দিয়েছেন যে, ইরানে গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের উস্কানি দেয়ার পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র ভূমিকা ছিল। তিনি গত ১৯ নভেম্বর আরটি টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে ইরানে সাম্প্রতিক গোলযোগের ব্যাপারে বলেছেন, "এ গোলযোগ তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদের কারণের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ নয় বরং ইরানে মার্কিন অনুচরদের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।" তিনি ইরানের বিপ্লব বিরোধী মোনাফেকিন গোষ্ঠীর সঙ্গে মার্কিন সখ্যতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে ইরানে সহিংসতা শুরুর পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ভূমিকা রয়েছে। ইরানে এ ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য গত বছর থেকেই সিআইএ কর্মকর্তা মাইকেল ডি আন্দ্রিয়াকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল যাকে মজা করে 'আয়াতুল্লা মাইক' নামে ডাকা করা হত।

মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ কথা ফাঁস করে দিয়েছে যে, সিআইএ কর্মকর্তা মাইকেল ডি আন্দ্রিয়া ইরানে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য অনেক আগে থেকে কাজ করে আসছিলেন এবং তার প্রতি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন রয়েছে। প্রতিবেদনে আরো এসেছে, "ইরানে গোলযোগের ধরন, পাশ্চাত্য মিডিয়ার রিপোর্টিং এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিবৃতি থেকে বোঝা যায় তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সৃষ্ট গোলযোগ শুরুর আগে থেকেই কিভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে তার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।"

মার্কিন সরকারের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ইসরাইলি দৈনিক হারেতয লিখেছিল, মার্কিন রাজনীতিবিদরা মনে করেন ইরানের ইসলামি সরকারের পতন ঘটানোর জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র এক প্রতিবেদনে ইরানে গোলযোগ সৃষ্টির নানা কারণ তুলে ধরেছে যাতে বোঝা যায় ইরানের অভ্যন্তরে যেকোনো নৈরাজ্য সৃষ্টির পেছনে আমেরিকার হাত থাকে।

যাইহোক, আমেরিকা গত বছর জানুয়ারি থেকে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় সরকার বিরোধী বিক্ষোভ উস্কে দেয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে।  জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ এ ক্ষেত্রে আমেরিকাকে সমর্থন দিচ্ছে এবং তারা সম্মিলিতভাবে ইরানের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের ইসলামি সরকারকে উৎখাতের জন্য তারা কোনো সুযোগকেই হাত ছাড়া করে না। কিন্তু ইরান গত ৪০ বছরে প্রমাণ করেছে পাশ্চাত্যের কাছে তারা মাথা নত করেনি বরং শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং শত্রুর সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে। আর ইরানের ইসলামি সরকারের প্রতি জনগণেরও সমর্থন রয়েছে। #

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/১

ট্যাগ

মন্তব্য