ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১ ২০:৩০ Asia/Dhaka
  • সৌদি আরবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও বিদেশি শ্রমিকদের অবস্থা
    সৌদি আরবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও বিদেশি শ্রমিকদের অবস্থা

সব সভ্য সমাজে সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রতি সম্মান জানানো হয়। সেই সমাজে অন্যান্য নাগরিকদের মতো সংখ্যালঘু মানুষদেরও সমান অধিকার দেয়া হয়।

তবে একইসঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশেই সংখ্যালঘুদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এ সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনার আজকের পর্বে আমরা আন্তর্জাতিক আইনে সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং সৌদি আরবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা  সম্পর্কে আলোচনা করব।

সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুন রয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণকারীদের বিচারেরও ব্যবস্থা রয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর সংখ্যালঘুদের প্রতি সমর্থন দেয়া বা তাদের অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক প্রথম ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পাশ হয় যেখানে জাতিগত, ধর্মীয় কিংবা ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও তাদের পরিচিতির প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলা হয়। এ ঘোষণা পত্রে বলা হয় তিনটি ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। প্রথমত, নিজস্ব বিশ্বাস বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ে জীবন যাপনের অধিকার। দ্বিতীয়ত নিজেদের ধর্ম প্রচার ও তা মেনে চলার অধিকার এবং তৃতীয়ত, সংখ্যালঘুদের ভাষার অধিকার বজায় থাকবে।

নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে জীবনযাপন করা সংখ্যালঘুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার যা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা যাবে না। জাতিসংঘে বর্ণবৈষম্য বিরোধী কমিশনের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক অধিকার বিষয়ক গবেষক প্যাট্রিক থ্রোনবেরি বলেছেন, কোথাও ভাষার কারণে, কোথাও ধর্মীয় কারণে, কোথাও জাতিগত কারণে মানুষ জুলুম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে প্রায় সব সমাজে কোনো না কোনে দিক থেকে সংখ্যালঘুদের বসবাস রয়েছে। বেশিরভাগ সমাজে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বা ভিন্নতাও রয়েছে।

ইসলাম ধর্ম কোনো ধরনের বৈষম্য ও সংখ্যালঘুদের অধিকার কেড়ে নেয়াকে সমর্থন করে না। ইসলাম ধর্মের মূল সূতিকাগার সৌদি আরবে সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক অধিকার বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর উত্তরে বলা যায় সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের ওপর জুলুম নির্যাতনের বহু অভিযোগ রয়েছে। সৌদি আরবের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে ওয়াহাবিরা। কিন্তু তারা শুধু যে সেদেশের সংখ্যালঘু শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে তাই নয় এমনকি ওয়াহাবি বিরোধী হওয়ার কারণে সুন্নি হানাফি মাজহাবের অনেক ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত করছে। সৌদি আরবে শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় চর্চার ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। শিয়াদের বিভিন্ন বই, ধর্মীয় শোকগাথা গাওয়া প্রভৃতি নিষিদ্ধ। এমনকি গবেষণামূলক বিভিন্ন বইপত্র সঙ্গে রাখাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য। ওয়াহাবিরা নিজস্ব শিক্ষা,  বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকেও শিয়া মুসলমানদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে। সৌদি আরবে শিয়া মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস ও শিক্ষা প্রচারের কোনো অনুমতি তো নেই এমনকি ওয়াহাবিদের নিজস্ব বিশ্বাস ও চিন্তাভাবনাকেও তাদেরকে শিখতে বাধ্য করা হয় যা কিনা চরম শিয়া বিদ্বেষে পরিপূর্ণ।

সৌদি আরবের শিয়া মুসলমানরা এ কারণে আতঙ্কিত যে এর ফলে তাদের সন্তানরা একদিকে নিজস্ব ধর্ম বিশ্বাস ও পরিচিতি জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অন্যদিকে তারা ওয়াহাবি চিন্তাধারায় প্রভাবিত হচ্ছে। এমনকি সৌদি আরবের অন্তত ৫০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিয়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো মামলা কমদ্দমায় আদালতেও শিয়া মুসলমানদের সাক্ষ্য দেয়ার কোনো অধিকার নেই। ওই দেশটিতে কোনো শিয়া মুসলমান আদালতের বিচারক হতে পারে না। আমেরিকার বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক আঙ্গোলা কোডভিলা বলেছেন, সৌদি আরবের শিয়া মুসলমানরা ব্যাপকভাবে জুলুম নির্যাতনের শিকার। ওয়াহাবিরা শিয়াদের ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর এবং তারা শিয়াদেরকে ইহুদিবাদীদের চাইতেও বিপদজনক বলে মনে করে। তিনি বলেন ওয়াহাবিরা তাদের উগ্র নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বিপদজনক হচ্ছে ওয়াহাবিরা শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে ওয়াহাবি নয় এমন সব মুসলমানকে কাফের মনে করে। তারা অন্যসব মুসলমানদের দীর্ঘ দিনের প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিকেও শিরিক মনে করে। এসব বন্ধের জন্য তারা উগ্রপন্থার আশ্রয় নিয়েছে।

সৌদি শাসকবর্গ ও উগ্র ওয়াহাবিদের এসব আচরণে সংখ্যালঘুরা সেখানে নিষ্পেষিত। তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে যা কিনা আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সংখ্যালঘু শিয়া মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি জুলুম-নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। শুধু শিয়া হওয়ার কারণে তাদেরকে মুসলমান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। ১৯২৭ সালে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সৌদি আরবের তৎকালীন পদস্থ আলেমরা এক ফতোয়া জারি করে বলেছিলেন, 'শিয়ারা হচ্ছে মোরতাদ এবং কাফের। তাই তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।' তারা আরো বলেছিলেন, 'নিজেদের মাজহাব অনুযায়ী শিয়াদের ধর্ম পালনের কোনো অধিকার নেই এবং যদি তারা বিধিনিষেধ অমান্য করে তাহলে সৌদি আরব থেকে তাদেরকে বের করে দেয়া হবে।' এর পর ১৯৯১ সালে সৌদি আরবের এক মুফতি বিন জাবরিন আবারো শিয়াদেরকে কাফের ফতোয়া দিয়ে বলেন তাদেরকে হত্যা করলে বেআইনি কিছু হবে না।

সৌদি আরবে সংখ্যালঘু শিয়া মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণ কিংবা তাদের কোনো ধর্মীয় স্থাপনা সংস্কারের ওপর কঠোরভাবে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে রাখা হয়েছে। এমনকি শিয়া মুসলমানরা কোনো ভবন নির্মাণ করতে গেলেও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ সাফওয়া এলাকায় মাত্র তিন থেকে চারটি হোসেইনিয়া বা ইমামবাড়ার কার্যক্রমের অনুমতি রয়েছে এবং শিয়া অধ্যুষিত বিশাল ওই এলাকায় নতুন আর কোনো ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। সৌদি আরবে শিয়া মুসলমানদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ ও তাদের ধর্ম চর্চার অধিকার হরণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেদেশের শাসকবর্গ ও ধর্মীয় নেতারা শিয়াদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করে। শিয়াদের শাফায়াত বা তাওয়াস্সুল করাসহ বিভিন্ন বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে মনে করে। এ কারণে তারা ইমামবাড়া নির্মাণ, শোকানুষ্ঠানে বিশেষ পোশাক পরিধান করা এমনকি বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনেও বাধা দেয়।  

অতি সম্প্রতি সৌদি আরবের শিয়া অধ্যুষিত কাতিফের ইমাম হোসাইন মসজিদটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। মসজিদটিতে শিয়াদের অন্যতম নেতা ও সৌদি রাজ পরিবারের সমালোচক শেখ নিমর বাকির আল-নিমর ইমামতি করতেন। এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফে ইমাম হোসাইন মসজিদটি সর্বশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হবে। সৌদি আরবের মানবাধিকার কর্মী আদেল আল-সাদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সৌদি নাগরিকদের শেখ নিমরের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় এমন সব কিছু ধ্বংস করার মিশন হিসেবে এ মসজিদটি ধ্বংস করা হচ্ছে।#

পার্সটুডে/এমআরএইচ/ মো.আবুসাঈদ/১৬

ট্যাগ