মে ২৪, ২০২০ ১৬:৫৯ Asia/Dhaka
  • ইরাকের নয়া প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমি
    ইরাকের নয়া প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমি

ইরাকে গত পাঁচ মাস ধরে চলে আসা রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত সাত মে সংসদে অনুষ্ঠিত আস্থাভোটে মোস্তফা আল কাজেমি'র নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা জয়লাভ করেছে। ইরাকের নয়া প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমির সামনে ছয়টি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা তাকে মোকাবেলা করতে হবে।

ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দামের পতনের পর গত ১৭ বছরে সেদেশে এ পর্যন্ত পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ৫৩ বছর বয়সী মোস্তফা আল কাজেমি হচ্ছে ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। এর আগে আইয়াদ আলাভি ২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত, ইব্রাহিম জাফারি ২০০৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত, নুরি মালিকি ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত, হায়দার আল এবাদি ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এবং আদেল আব্দুল মাহদি ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল  পর্যন্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ ইরাকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ফলে গত পাঁচ মাসের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটল। কিন্তু ইরাকের নতুন মন্ত্রিসভার সামনে অন্তত ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা তাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে।

প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমিকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ পূর্ণ করতে হবে। নতুন এ মন্ত্রিসভায় ২২টি মন্ত্রণালয় রয়েছে। এর মধ্যে আস্থাভোটে জয় লাভ করে ১৫টি মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত হয়েছে। প্রস্তাবিত পাঁচ জন মন্ত্রী আস্থাভোটে জিততে পারেননি এবং ভোটাভুটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ তেলমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদের জন্য নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমিকে আগামী এক মাসের মধ্যে অবশিষ্ট সাতটি মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে তেল, পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ও বিচারমন্ত্রীর পদে কাদেরকে নিয়োগ দেয়া হবে তা নির্ধারণ করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য খুবই কঠিন কাজ হবে। সংসদে বসরার প্রতিনিধি দাবি করেছেন তেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাকেই দিতে হবে। অন্যদিকে কুর্দি প্রতিনিধিরাও দাবি করেছেন বিচারমন্ত্রণালয়সহ হয় তেল অথবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদেরকে দিতে হবে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমিকে আবারো অবশিষ্ট ওই সাতটি মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে হবে। এভাবে সব পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভের জন্য চেষ্টা করায় কোনো সিদ্ধান্তে আসা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমির সামনে দ্বিতীয় যে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেটি হচ্ছে, ইরাকে মোতায়েন মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা।

আগামী মাসে এ ব্যাপারে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ইরাকের অনেক রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সে দেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। এমনকি মন্ত্রিসভায় অবশিষ্ট আস্থাভোটে জয় লাভের বিষয়টি মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। মোস্তফা আল কাজেমি যদি এ বিষয়টি উপেক্ষা করেন তাহলে তিনি নিজেও পার্লামেন্টে অভিশংসনের মুখোমুখি হতে পারেন। শুধু যে ইরাকের কয়েকজন রাজনৈতিক দল মার্কিন সেনাদের বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছে তাই নয় একইসঙ্গে এটি সেদেশের জনগণের একটা বিরাট অংশের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে আমেরিকাও যেকোনোভাবে ইরাকে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এমনকি ছোট ছোট কয়েকটি ঘাঁটি থেকে সেনাদেরকে মূল ঘাঁটিতে স্থানান্তর করেছে এবং তাদেরকে ইরাকের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কোনো চিন্তা যেন আমেরিকার নেই। তবে জনমতের চাপে পড়ে ইরাক সরকার যদি শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনাদেরকে বহিষ্কার করে তাহলে সন্দেহাতীতভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হবে ইরাক। এ হুমকি মার্কিন কর্মকর্তারা অনেক আগেই দিয়ে রেখেছেন।

এর আগে ৫ জানুয়ারি ইরাকের পার্লামেন্ট মার্কিন সেনা বহিষ্কারের জন্য একটি প্রস্তাব পাশ করেছিল। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, যদি মার্কিন সেনা বহিষ্কার করা হয় তাহলে তিনি ইরাকের বিরুদ্ধে শক্ত নিষেধাজ্ঞা দেবেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরাকে আমরা বহু অর্থ ব্যয় করে বড় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছি এবং সেখান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নই ওঠে না। তিনি এও বলেন, ঘাঁটি নির্মাণ বাবদ আমাদের অর্থ ফেরতা না দিলে আমরা কিছুতেই ইরাক ছাড়ব না।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমির সামনে তৃতীয় যে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেটি হচ্ছে,  করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করা। এ পর্যন্ত সাড় তিন হাজারের বেশি ইরাকি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে প্রায় দেড়শ' জন। ইরাকে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য আরব দেশের চেয়ে কম। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের পর ইরাকের অবস্থান। কিন্তু তারপরও এ ভাইরাসে আরো বেশি সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য কাজেমি সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইরাক সরকারের সামনে চতুর্থ বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলার উপায় খুঁজে বের করা। নতুন প্রধানমন্ত্রী ভাল করেই জানেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদেল আব্দুল মাহদির বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভের কারণ ছিল অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব নিরসনে তার ব্যর্থতা। বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও অর্থনৈতিক সংকট সবসময়ই ছিল কিন্তু আদেল আব্দুল মাহদিকে এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমিও এটা ভাল করেই জানেন যে, বেকারত্ব ও দরিদ্রতা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। আবারো যাতে সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে না ওঠে সেজন্য তাকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে এবং সংকট সমাধানে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, জনগণের বিভিন্ন দাবি দাওয়ার ব্যাপারে সরকারকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে জবাব দিতে হবে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নও কঠিন হতে পারে। পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাআদুল্লাহ যারেঈ মনে করেন, ইরাক বর্তমানে ৬০ লাখ কোটি ডলার ঋণভারে জর্জরিত। দেশটির আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে তেল। কিন্তু তেলের দাম বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। তাই অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে নতুন সরকারের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শুধু কাজেমির মন্ত্রিসভা নয় একইসঙ্গে আরবিলের স্থানীয় কুর্দি সরকারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

প্রধানমন্ত্রী কাজেমির মন্ত্রিসভার সামনে পঞ্চম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দায়েশ বা আইএস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। আমেরিকার সমর্থন নিয়ে আইএস আবারো ইরাকে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং হামলা চালিয়ে জনপ্রিয় হাশত আশ্‌ শাবির বহু সদস্যকে হত্যা করেছে। এ অবস্থায় আইএসের গতিরোধ করা সরকারের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ষষ্ঠ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আগাম সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। প্রধানমন্ত্রী নিজেসহ অধিকাংশ দল আগাম নির্বাচন চায়। তবে ধারণা করা হচ্ছে এ মুহূর্তে আমেরিকার সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণকে আশ্বস্ত করা এবং আইএস মোকাবেলা করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবে ইরাকের নতুন সরকার।#

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন

ট্যাগ

মন্তব্য