এপ্রিল ২৯, ২০২১ ১৮:০৮ Asia/Dhaka

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান বলেছেন, ইরান তাদের প্রতিবেশী দেশ এবং তিনি আশা করেন তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি আল আরাবিয়া টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে এ কথা বলেছেন।

বাদশাহ সালমান ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের ক্ষমতায় আসার পর তার পুত্র যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটির দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর তার ছত্রছায়ায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবে নিজের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করার সুযোগ পান। কেননা ট্রাম্প তার শাসনের পুরোটা সময়জুড়ে সৌদি আরবে কোটি কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রির পাশাপাশি যুবরাজ সালমানের প্রতি সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থনের নীতি গ্রহণ করেছিলেন।

যুবরাজ সালমানের একতরফা ও স্বেচ্ছাচারী নীতি কেবল সৌদি আরবের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় তিনি নিজের একপেশে নীতি ও একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রভৃতি পদক্ষেপ নিয়েছেন। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এ সব পদক্ষেপ বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থানের কারণে মার্কিন সরকার ও দখলদার ইসরাইল খুবই খুশী এবং এটাকে তারা স্বাগত জানিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের শত্রুতা ও বিদ্বেষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি ২০১৭ সালের জুনে ঘোষণা করেছিলেন পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ সংঘাত ইরানের ভেতরেও ছড়িয়ে দেবেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত সালমানের ওই বক্তব্য পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

যাইহোক, বর্তমানে সৌদি যুবরাজ অনেক মোলায়েম ও কূটনৈতিক ভাষায় ইরানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন যা খুবই ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস। তিনি বলেছেন, ‘সৌদি আরব ও ইরানের লক্ষ্য অভিন্ন। সৌদি আরব ইরানের উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায় এবং আমরা চাই না ইরান কঠিন অবস্থার মধ্যে থাকুক। ইরানে আমাদের স্বার্থ রয়েছে এবং গোটা অঞ্চল ও বিশ্বের উন্নয়ন ও অগ্রগতি প্রত্যাশা করে রিয়াদ’।

এদিকে, বার্তাসংস্থা রয়টার্স সৌদি যুবরাজের এ বক্তব্যের ব্যাপারে এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যেই ইরানের প্রতি শান্তি ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব মোকাবেলার উপায় নিয়ে বিরোধের জেরে তিনি দীর্ঘ দিনের শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে তেহরানের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে’।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরান ইস্যুতে সৌদি আরব কার্যত একা হয়ে পড়ায়, দেশটি ইয়েমেন যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকা পড়ায় এবং দেশের অভ্যন্তরেও অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়ায় যুবরাজ সালমান তার নীতিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন। তিনি বুঝতে পারছেন শুধু যে ট্রাম্পকে হারিয়েছেন তাই নয় একইসঙ্গে আরেক মিত্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানও ভালো নয়। মোটকথা, ইরানের প্রতি বিদ্বেষ সৌদি সরকার ও দেশটির যুবরাজ সালমানের স্বার্থকে তো রক্ষা করবেই না বরং এতে দখলদার ইসরাইলই লাভবান হবে। ইরানকে বাগে আনা তো দূরের কথা ছয় বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ করেও সেখানে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই অর্জিত না হওয়ায় সালমান প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছেন। এ অবস্থায় তিনি ইয়েমেন যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে পড়ে এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে যাতে ওই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যায়। সালমানের মধ্যপ্রাচ্যে নীতি ব্যর্থ হওয়ায় তিনি দেশের অভ্যন্তরেও চাপের মধ্যে পড়েছেন। 

যে কারণেই হোক যুবরাজ সালমান ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তাকে বিভিন্ন মহল থেকে স্বাগত জানানো  হয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘ইরানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে আমরা সমর্থন করি। ইরানও প্রথম থেকেই এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে আসছে’। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার সৌদি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ অবস্থায় পশ্চিম এশিয়ার প্রভাবশালী দুটি দেশ ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এ অঞ্চলে পরিবর্তনের বিরাট আভাস বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।#             

পার্সটুডে/এমআরএইচ/২৯

ট্যাগ