জুন ২৮, ২০২২ ২০:০৫ Asia/Dhaka

সুপ্রিয় শ্রোতা/পাঠকবন্ধুরা! স্বাগত জানাচ্ছি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান স্বাস্থ্যকথার আসরে আমি গাজী আবদুর রশীদ। আশাকরি সবাই ভালো ও সুস্থ আছেন। হ্যাঁ শ্রোতাবন্ধুরা! ভালো থাকার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সুস্থ থাকা, রোগমুক্ত থাকা। যে কারণে বলা হয়ে থাকে স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল বা স্বাস্থ্য অমূল্য সম্পদ। কিন্তু সেই স্বাস্থ্য সবার ভালো থাকে না নানা কারণে। তার জন্য কখনও কখনও আমাদের জীবানাচারও দায়ী। তাই নিয়ন্ত্রিত ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করা উচিত আমাদের সবার।

তো যাই হোক আজ আমরা স্বাস্থ্যকথার আসরে  গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসা পদ্ধতি প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে কথা বলব আর আমাদের সাথে অতিথি হিসেবে আছেন – আফ্রিকার দেশ লেসোথো প্রবাসী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মোবাশ্বার হাসান মাসুম।

তো শ্রোতাবন্ধুরা!  প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিষয়টি হচ্ছে' খুব সহজ করে বললে' ভালোবাসায় রোগীর পাশে'।আর যদি আরও একটু স্পষ্ট করে বলি তাহলে দাঁড়ায়'নিরাময় অযোগ্য রোগী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা লাঘ করার জন্য একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার নাম প্যালিয়েটিভ কেয়ার। তো প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে আজ তৃতীয় পর্বের আলোচনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মোবাশ্বার হাসান মাসুমের কাছ থেকে বিস্তারিত জানব।

বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক লেসোথো ক্যান্সার ক্লিনিকে প্যালিয়েটিভ কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন।

জনাব, ডক্টর মোবাশ্বার হাসান মাসুম রেডিও তেহরানে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

ডা. মোবাশশার হাসান মাসুম:  অনেক ধন্যবাদ জনাব গাজী আবদুর রশীদ ভাই আপনাকে। আপনার এই সুন্দর উদ্যোগটির জন্য আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে রেডিও তেহরানের বাংলা বিভাগকে অনেক অনেক অভিনন্দন জানাই। প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে স্বাস্থ্যকথার আসরে আলোচনার জন্য নির্বাচন করেছেন এবং আমাকে সুযোগ দিয়েছেন কথা বলার জন্য। সেইসাথে রেডিও তেহরানের দর্শক শ্রোতাদেরকেও অভিনন্দন জানাই।

ক্যান্সারের ব্যথা উপশমে প্যালিয়েটিভ কেয়ার

রেডিও তেহরান: ডা. মোবাশশার হাসান মাসুম, প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে প্রথম দুই পর্বের আলোচনায় আপনি প্যালিয়েটিভ কেয়ার কি, এই চিকিৎসা পদ্ধতি কখন থেকে এসেছে, এতে রোগীর কতটা লাভ হতে পারে, চিকিৎসা পদ্ধতি কি সেসব আপনি পরিষ্কার করে বলেছেন। মৃত্যু ভয় মানুষের থাকে বিশেষ করে দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের ভেতর এই ভয় প্রকট আকার ধারণ করে। তো সে অবস্থায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার চিকিৎসা একজন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে। যা আপনার আলোচনা থেকে খানিকটা জেনেছি। তো আজ তৃতীয় পর্বের আলোচনার শুরুতে সে বিষয়টিই জানতে চাইব আপনার কাছে-রোগীর ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে এবং ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। একটা পর্যায়ে যখন  কেমোথেরাপি দেয়া হয় ঠিক তার আগে রোগীর যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তার উপশমে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ভূমিকা কি?

ডা. মোবাশশার হাসান মাসুম: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে এবং  শ্রোতাবৃন্দদের। সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমার আলোচনা শুরু করছি।

ক্যান্সার এবং অন্যান্য মারাত্মক ব্যধিতে যখন কেউ আক্রান্ত হয় তখন তাঁর মনো-দৈহিক অবস্থান নিদারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়। আর সেই রোগীকে সরাসরি ক্যান্সারের যেসব চিকিৎসা আছে যেমন-শৈল্য চিকিৎসা, কেমোথেরাপি তারপর রেডিয়েশন থেরাপি-এগুলোতে যদি সরাসরি রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে রোগীর পক্ষে বিষয়টি বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। যারফলে সরাসির চিকিৎসার খুব ভালো ফল পাওয়া যায় না।

রেডিও তেহরান: ডা. মাসুম, একজন রোগীর ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তখন ক্যান্সারের যে চিকিৎসা- শৈল্য চিকিৎসা, রেডিয়েশেন থেরাপি কিংবা কেমোথেরাপি-এসব চিকিৎসায় সরাসরি রোগীকে নিয়ে গেলে দেখা গেল খুব একটা ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না- যেকথাটি আপনি বললেন। তো সে সময় করণীয় কি?

ডা. মোবাশশার হাসান মাসুম: একজন মানুষ যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং পরীক্ষায় ধরা পড়ার সাথে সাথে যদি একজন প্যালিয়েটিভ চিকিৎসকের কাছে আনা হয় এবং চিকিৎসক তাঁকে যদি যথাযথভাবে প্যালিয়েটিভ কেয়ার চিকিৎসা রোগীর ওপর প্রয়োগ করেন তাহলে ঐ রোগী বুঝতে পারেন তার চিকিৎসার পরবর্তী ধাপটি কি হবে। সেটি কি কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নাকি সার্জারি।  যদি কেমোথেরাপি হয়-তাহলে এটি শুরুর আগে রোগীকে কেমোথেরাপি কি, কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে বুঝিয়ে বলেন একজন প্যালিয়েটিভ চিকিৎসক। এটি তার দায়িত্ব। যদি এটি রোগী এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে বুঝিয়ে বলা না হয় তাহলে রোগী এবং তার আত্মীয়-স্বজন এ বিষয়ে অন্ধকারে থাকবে।

শ্রোতাবন্ধুরা! ক্যান্সারে কিংবা দূরারোগ্যব্যাধিতে প্যালিয়েটিভ কেয়ার  চিকিৎসা নিয়ে এ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোবাশশার হাসান মাসুমের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুনছেন। ফিরছি শিগগিরিই আমাদের সাথেই থাকুন।

ক্যান্সারে তীব্র ব্যথা

রেডিও তেহরান: মিউজিক বিরতির পর আবারও ফিরে এলাম আলোচনায়। ডা. মাসুম, ক্যান্সার মানে ভয়াবহ একটি রোগ-রোগীর জন্য যেমন তাঁর পরিবারের ওপরও মারাত্মক দুশ্চিন্তার জায়গা। তো রোগীকে কি চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে কেন দেয়া হচ্ছে-সাধারণত রোগীকে কিংবা তার পরিবারকে এসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা হয় না এবং যেকথা আপনি বলছিলেন তাঁরা একরকম অন্ধকারে থাকেন। দিশেহারা বোধ করেন। এ অবস্থায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার কি ধরণের ভূমিকা রাখে?

ডা. মোবাশশার হাসান মাসুম:  দেখুন, যখন রোগী এবং তার পরিবার জানছে না কি চিকিৎসা দেয়া হবে তখন তারা তো অন্ধকারে থাকবে আর এই অন্ধকারে থেকে চিকিৎসায় গেলে যেসব উপসর্গ থাকে তা মারাত্মক আকর ধারণ করে। ক্যান্সারের বিশেষ করে ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি সাধারণত দেয়া হয় শিরায়। আর যখন শিরায় ওষুধ দেয়া হয় তখন নানা রকমের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এসব পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো অনেকটা কমন। যেমন রোগীর বমির ভাব হতে পারে, চুল পড়ে যেতে পারে, রোগী ঘুমাতে পারে না। কারণ তার মনের মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করে। রোগী ভাবতে থাকে-তার যে ক্যান্সার হয়েছে এবং সে যে কেমোথেরাপি নিচ্ছে এতে কি তার রোগের উপশম হবে? এরবাইরে সামাজিক কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন- কারো ক্যান্সার হয়েছে শুনলে অনেকে রোগীর কাছাকাছি আসতে চায় না তার প্রতিবেশী, বন্ধু এমনকি আত্মীয়-স্বজনরাও। এমনও দেখা গেছে স্বামীর ক্যান্সার হয়েছে এ খবরটি জানার পর স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে গেছে। অথবা ভিন্নটাও মর্মান্তিভাবে বলতে হয় স্ত্রীর ক্যান্সার হয়েছে স্বামী তাঁকে না জানিয়ে ছেড়ে চলে গেছেন। এই যে বিপর্যয় ঘটে এতে রোগীর মন  আরও ভেঙে যায়। একদিকে যেমন শরীরের কষ্ট পাশাপাশি তীব্র মনের কষ্ট। এই দুই কষ্ট একসাথে নিয়ে রোগীর জীবনযাত্রা একেবারে  নিম্নমুখী হতে থাকে।

রেডিও তেহরান: জ্বি ডা. হাসান আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী এবং রোগীর আত্মীয়স্বজনের জীবনের সকরুণ বাস্তবতা তুলে ধরলেন। ক্যান্সারের কারণে এবং অর্থনৈতিক সংকটে কিংবা না বোঝার কারণে সংসার ভাঙছে, রোগী একা হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্যালিয়েটিভ কেয়ার কি করতে পারে?

ডা. মোবাশশার হাসান মাসুম: দেখুন, প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো-রোগী যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন তখন রোগীর মন-দৈহিক অবস্থার যে বিপর্যয় তা থেকে রোগীকে উত্তরণ ঘটিয়ে রোগীকে একটা ভালো মানের জীবনযাত্রার মধ্যে নিয়ে আসা।

জনাব, উপস্থাপক আপনার মাধ্যমে আমি শ্রোতাদের একটি বিষয় পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিতে চাই- কারও ক্যান্সার হয়েছে অর্থাৎ রোগ নির্ণয় হওয়ার সাথে সাথে সরাসরি কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন এবং সার্জারিতে গেলে যে ফলাফলটি পাওয়া যায় তার থেকে বেশি ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে যদি রোগী প্যালিয়েটিভ কেয়ারের যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা আছে তার মধ্য দিয়ে ওগুলোতে যান। এবারে কি আমি একটু ব্যথার বিষয়ে কথা বলতে পারি?

ডা. মাসুম স্বাস্থ্যকথার আসরের জন্য আমাদের আজকের নির্ধারিত সময় শেষ। নিশ্চয়ই আমরা অন্য পর্বে ব্যথার উপশমে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ভূমিকা নিয়ে কথা বলব। তো আজও আমাদেরকে কষ্ট করে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

শ্রোতা/পাঠকবন্ধুরা! এতক্ষণ প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে তৃতীয় পর্বের আলোচনা শুনছিলেন। আগামী আসরেও এ বিষয় নিয়ে কথা হবে। সে আসরেও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না। সবাই ভালো, সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন।#

অনুষ্ঠানটির সাক্ষাৎকার গ্রহণ, উপস্থাপনা, প্রযোজনা ও গ্রন্থনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/

ট্যাগ