সেপ্টেম্বর ২২, ২০২২ ১৮:৩৯ Asia/Dhaka
  •  মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে জাতিসংঘে বাইডেনের বক্তব্য এবং প্রকৃত বাস্তবতা

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জাতিসংঘের ৭৭তম সাধারণ অধিবেশনে দেয়া বক্তৃতায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এবং এসব বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেন।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যেসব  আলোচনা করেছেন তার মধ্যে ইরান, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের পরিস্থিতি অন্যতম। বাইডেন দাবি করেছেন যে তার দেশ আমেরিকার অভ্যন্তরে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানবাধিকার রক্ষা করবে। তিনি তার বক্তৃতায় জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের যেকোনো স্থানে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মানুষের  প্রতিবাদ প্রকাশের অধিকারও রক্ষা করে।

মার্কিন সরকার নিজেদেরকে মানবাধিকার এবং ব্যক্তি, সামাজিক ও নাগরিক অধিকারের রক্ষক দাবি করলেও তাদের কর্মকাণ্ড ও আচরণে ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ, স্থানীয় আদিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ, সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের  সঙ্গে সরকারের  রূঢ়, অমানবিক ও বৈষম্যমূলক আচরণের কথা উল্লেখ করা যায়। অভিবাসী সন্তানদেরকে তাদের পিতামাতা থেকে আলাদা করা, অশেতাঙ্গদের ওপর পুলিশি নির্যাতন, কারাবন্দিদের অধিকার হরণ, ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ প্রভৃতি অপরাধযজ্ঞের সঙ্গে মার্কিন সরকার জড়িত থাকলেও তারা  নিজেদেরকে মানবাধিকারের রক্ষক বলে প্রচার চালাচ্ছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারিকালে দেখা গেছে বৈষম্যের কারণে আমেরিকাতে জাতিগত সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ থেকে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, চাকরি প্রভৃতি থেকে বৈষম্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের দেশগুলো মানবাধিকারের কথা বললেও প্রতি বছর বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায় পাশ্চাত্যে বিশেষ করে আমেরিকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য নজির রয়েছে এবং মানবাধিকারকে তারা রাজনৈতিক ও প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। 

ইরানি সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের প্রধান ওয়াহিদ জালালজাদেহ আমেরিকার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন, আমেরিকার জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার পাচ শতাংশ কিন্তু বিশ্বের প্রায় ২৫ ভাগ বন্দী এই দেশের কারাগারে আটক রয়েছেন। মার্কিন সরকার প্রতিদিন লাতিন নারী এবং কৃষ্ণাঙ্গসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়ন চালিয়ে আসছে  কিন্তু ওয়াশিংটন অত্যন্ত গর্বিতভাবে নিজেকে মানবাধিকারের রক্ষক এবং প্রধান আইনজীবি হিসেবে নিজেকে হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার বক্তৃতায় আরেকটি যে বিষয় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপান করেছেন তাহলো ইউক্রেন প্রসঙ্গ।  ইউক্রেনে হামলার জন্য তিনি রাশিয়ার কড়া সমালোচনা করেছেন। তার বক্তৃতার একটি অংশে দাবি করেন যে মস্কো ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে "নির্লজ্জভাবে" জাতিসংঘের সনদ লঙ্ঘন করেছে এবং জাতিসংঘের অস্তিত্বকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এছাড়া ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে সেখানে মস্কোর গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তেরও কড়া সমালোচনা করেন তিনি। বাইডেন তার ভাষণে আরো বলেন, ক্রেমলিন একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে ইউক্রেনের অস্তিত্বের অধিকারকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে এবং বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরোধকে দৃঢ়তার সাথে রক্ষা করতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। ইউক্রেনে যেকোনো যুদ্ধাপরাধের জন্য রাশিয়াকে জবাবদিহি করার ওপরও জোর দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। 

একদিকে বাইডেন ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের সমালোচনা করেছেন কিন্তু গত আশি বছরে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আমেরিকার বিপর্যয়কর হস্তক্ষেপের রেকর্ডের প্রতি কোনো দৃষ্টিপাত করেন নি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ের অজুহাতে আফগানিস্তানে এবং ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অজুহাতে আক্রমণ করে এবং সেখানে হাজার হাজার  নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করে। এর পরে ২০১১ সাল থেকে ওবামা প্রশাসন সিরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে কেবল সমর্থনই করে নি এসব গোষ্ঠীকে ব্যাপক আর্থিক, লজিস্টিক এবং অস্ত্র সহায়তা প্রদান করেছিল যার ফলে এই দেশে গৃহযুদ্ধের সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া, জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রেসিডেন্ট থাকার পর থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে ওয়াশিংটন ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনীয়দের অধিকার রক্ষার দাবি করছেন এবং রাশিয়ার সমালোচনা করছেন। যদিও আমেরিকা এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা এবং অস্ত্র সরবরাহ করে ইউক্রেনে যুদ্ধের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে।! #

পার্সটুডে/ বাবুল আখতার /২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ