২০১৯-১১-১২ ১৫:৪৫ বাংলাদেশ সময়
  • পরমাণু প্রযুক্তি: মার্কিন গুণ্ডামি ও ইরানি জবাব

ড. সোহেল আহম্মেদ: ইউরেনিয়াম হচ্ছে পরমাণু বোমার অপরিহার্য উপাদান। খনি থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের পর ইয়েলো কেকে পরিণত করে ধাপে ধাপে এই ধাতুকে সমৃদ্ধ করে এর মাত্রা ৯০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারলেই বানানো যায় পরমাণু বোমা।

তাই সবার মধ্যেই ইউরেনিয়াম নিয়ে একটা আতঙ্ক কাজ করে। তবে পরমাণু প্রযুক্তি বা ইউরেনিয়াম মানেই পরমাণু বোমা নয়। এই প্রযুক্তির রয়েছে নানা ধরণের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। পরমাণু প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা একটা বড় বিষয়।

এক.

এক সপ্তাহ হলো ইরান ৫ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করেছে। এই মাত্রায় সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরানের দু’টি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনার একটি হচ্ছে ‘ফোরদু’। এখানেই শুরু হয়েছে এই সমৃদ্ধকরণ। এর ফলে ‘ফোরদু’ আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তি সইয়ের পর এই কেন্দ্রটি অনেকটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। কারণ ইরান চুক্তি অনুযায়ী ‘ফোরদু’ স্থাপনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছিল। এর আগে সেখানে ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ হচ্ছিল।

‘ফোরদু’ কারো কারো কাছে ইংরেজি শব্দ মনে হতে পারে। কিন্তু এটি ইরানের কোম প্রদেশের একটি গ্রাম। নামটির উৎপত্তি হয়েছে ফেরদৌস শব্দ থেকে। সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রামটির প্রশান্তিময় পরিবেশের কারণে বেহেশতের নামের সঙ্গে মিল রেখেই এই নামকরণ। প্রথমে ছিল ফেরদৌস, পরে ফেরদো। এরপর আরেকটু পরিবর্তিত হয়ে ফোরদু-তে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে এই গ্রামেই শহীদ হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি মানুষ। ফোরদু স্থাপনা প্রতিষ্ঠার কথা ২০০৯ সালে সবাইকে জানায় ইরান।

ইরানের অপর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রটি ইস্ফাহান প্রদেশের নাতাঞ্জে অবস্থিত। পরমাণু চুক্তি অনুযায়ী সেখানে সীমিত পরিমাণে ৩ দশমিক ৬৭ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ চলছিল। এখনও চলছে। নাতাঞ্জ ও ফোরদু-দু’টি স্থাপনাই নির্মিত হয়েছে ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক গভীরে। শক্তিশালী বোমা মেরেও এ দু’টি স্থাপনা ধ্বংস করা কঠিন হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হুমকির কারণে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণেও ইরানকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ইরান ৬২ বছর ধরে পরমাণু তৎপরতা চালাচ্ছে। ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় পরমাণু প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করে তেহরান। এ পর্যন্ত ইরান এ খাতে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করেছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। আগামী আট বছরের মধ্যে ইরান পরমাণু প্রযুক্তির সাহায্যে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ইরানের আগ্রহের একটি কারণ হলো এই প্রযুক্তির বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি কম। প্রতি এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে গ্রিন হাউস গ্যাস নিগর্মন কম হয় ৭০ লাখ টন। এছাড়া ইরানের রয়েছে নিজস্ব ইউরেনিয়াম খনি। নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রিও করতে চায় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করছে।

নিজে সমৃদ্ধ করার আগে ইরানও চড়া দামে উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম কিনেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত পারমাণবিক গবেষণা চুল্লিতে কিছু সংস্কার এবং ২০ মাত্রার প্রায় ১১৬ কেজি ইউরেনিয়াম কিনতে ১৯৮৭ সালে ইরানের ব্যয় হয়েছিল ৫৫ লাখ ডলার। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই চুল্লিতে পারমাণবিক ওষুধ তৈরি করা হয় এবং এই চুল্লির জ্বালানি হচ্ছে ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর মার্কিন চাপের কারণে এই গবেষণা চুল্লির জন্য ইউরেনিয়াম পেতেও ইরানকে বেগ পেতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিজেই ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে ইরান।

ইসলামি বিপ্লবের আগে তেহরান রিঅ্যাক্টর বা পরমাণু চুল্লিটি বিপুল অর্থের বিনিময়ে নির্মাণ করে দিয়েছিল খোদ আমেরিকা। ১৯৬৭ সালে চুল্লি নির্মাণের পর ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হয় এবং আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। অসহযোগিতার জবাবে ইরান নিজেই পরমাণু সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জনে কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরান পরমাণু প্রযুক্তি সংক্রান্ত সার্বিক জ্ঞান আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়।

এখন ইরান বলছে ৬০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করাও তাদের কাছে কোনো বিষয়ই নয়। আর বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব দেশ ইউরেনিয়ামকে ২০ মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে পারে তাদের পক্ষে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তা ৯০ মাত্রায় উন্নীত করাও সম্ভব। ইরান ৬০ মাত্রার কথা কেন বলে? এর কারণ হলো, পারমাণবিক সাবমেরিন ও জাহাজ চালাতে ৬০ মাত্রার ইউরেনিয়াম লাগে। এটাও শান্তিপূর্ণ তৎপরতার মধ্যেই পড়ে এবং ইরান সে পর্যায়েও যেতে চায়।

ইরানের একটি পারমাণবিক চুল্লি পরিদর্শন করেন প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি

দুই.

ইরান পরমাণু প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পর এখন আমেরিকা, ইসরাইল ও ইউরোপের উদ্বেগের সীমা নেই। তারা বলছে, ইরান পরমাণু বোমা বানিয়ে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। যদিও ইরান বারবারই বলছে তারা পরমাণু বোমা বানাবে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীও পরমাণু বোমা তৈরি, সংরক্ষণ ও ব্যবহারকে হারাম ঘোষণা করেছেন। ইরান শুধু পরমাণু বোমা নয়, সব ধরণের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিরোধী। গণবিধ্বংসী অস্ত্র ইসলাম ধর্ম অনুমোদন করে না। কারণ এর ধ্বংস ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, তা নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষকেও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আর ইসলাম ধর্ম একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যাকেও গোটা মানব জাতিকে হত্যার সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছে। জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু বোমা মারার কারণে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখনও সেই তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব রয়ে গেছে।

বার বার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও চাপ ও উদ্বেগ অব্যাহত থাকায় ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তি সই করে ইরান। এই চুক্তিতে ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ মাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় তেহরান। কিন্তু ২০১৮ সালে অন্যায়ভাবে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় আমেরিকা। এখন ইউরোপও সে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে। ইরান এখন এই চুক্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ধাপে ধাপে সরে আসছে। কারণ তেহরান প্রতিশ্রুতি মেনে নিজের বিপুল বাজেটের কর্মসূচির একটা অংশ স্থগিত রাখলেও তাতে কোনো লাভ হয় নি। মার্কিন গুণ্ডামি থেমে থাকেনি। ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সময়ই ইরানের ওপর আগের নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনর্বহালের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ২০১৫ সালে চুক্তি সইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও কার্যত সেগুলো অব্যাহতই ছিল। ব্যাংকিং খাতে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পরও পরোক্ষভাবে বিশ্বের প্রধান ব্যাংকগুলোকে চাপের মধ্যে রেখেছিল যাতে ইরানি আর্থিক লেনদেন স্বাভাবিক না হয়। ট্রাম্প এখন বলছে, ইরানকে তার পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। সীমিত পর্যায়েও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না।

ইরান এখন পর্যন্ত আইএইএ’র কোনো নীতিমালা লঙ্ঘন করেনি। তাহলে দেশটিকে কেন শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত করা হবে?  বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এই প্রযুক্তির সাহায্যে। প্রযুক্তিতো কারো একক সম্পত্তি নয়। কিন্তু আমেরিকা বলছে, ইরানের ওপর আস্থা রাখা যায় না, ইরানকে শান্তিপূর্ণ কাজেও পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। এটা আমেরিকার প্রকাশ্য গুণ্ডামি।

ইরান এনপিটিতে সই করেছে এবং তাদের সব পারমাণবিক কার্যক্রম আইএইএ’র পুরোপুরি পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এছাড়া বর্তমান ইরান কখনোই আগ্রাসী তৎপরতা চালায়নি। দখলদারিরও কোনো ইতিহাস নেই। অন্যদিকে ইসরাইল অন্যের জমি দখল করে অবৈধভাবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এনপিটিতে সই করেনি। এরিমধ্যে পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে দুইশ’র বেশি। কোনো পর্যবেক্ষককে এখন পর্যন্ত পরমাণু স্থাপনায় ঢুকতে দেয়নি তারা। এ অবস্থায় ইসরাইলের ওপর আস্থা রাখতে আমেরিকার সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে ইরানের শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমেও তাদের আস্থা নেই। এটা আস্থার সংকট নয়, প্রকাশ্য গুণ্ডামি; গায়ের জোরে ন্যায্য অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করা।

দুঃখজনকভাবে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও গোটা বিশ্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই গুণ্ডামি নীরবে দেখছে, কোনো কোনো রাষ্ট্র এতে উৎসাহ যোগাচ্ছে। আমেরিকা নিজেকে গোটা বিশ্বের একক নিয়ন্ত্রক ভাবছে দীর্ঘ বহু বছর ধরে। তবে ইরান আমেরিকার অহংবোধে মাঝে মাঝেই কালি লেপে দিচ্ছে যা সত্যিই প্রশংসনীয়। গত জুনে ইরানের আকাশে গুণ্ডামি করতে এসে এক হাজার একশ' কোটি ডলার মুল্যের অত্যাধুনিক ড্রোন 'গ্লোবাল হক' হারিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

সম্প্রতি ফোরদু স্থাপনায় আবারও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী দেশগুলোকে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ৫ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে, পরমাণু তৎপরতা সীমিত রাখলেও পরমাণু জ্ঞান মোটেও হ্রাস পায় নি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়ানো কেবল সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার পরও ইরান পরমাণু কর্মসূচিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সাহস দেখাবে তা ট্রাম্পের মতো দাম্ভিক ব্যক্তির জন্য সত্যিই অবিশ্বাস্য।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইরান যে সাহস ও শক্তি দেখাচ্ছে তাতে দেশটির প্রতি বিশ্বের ন্যায়কামী মানুষের সমর্থন ও আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। ইরানের এই শক্তি ও সাহস ক্রমেই অন্যদের মধ্যেও সঞ্চালিত হচ্ছে। ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের চলমান প্রতিরোধই এর প্রমাণ।#

লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।

[email protected]

ট্যাগ

মন্তব্য