ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ ২১:২৭ Asia/Dhaka
  • মহাফাঁদে মুসলিম বিশ্ব: নিভে গেছে ৩ কোটি প্রাণ, সমাধান কোন পথে?

ড. সোহেল আহম্মেদ: এড়ানোযোগ্য মৃত্যু নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত অধ্যাপক গিডেয়ন পোলিয়া। তিনি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন, ৯/১১-পরবর্তী বিভিন্ন যুদ্ধে তিন কোটি ২০ লাখ মুসলমানের প্রাণ নিভে গেছে।

তিনি দেখিয়েছেন, সরাসরি যুদ্ধ ও এর প্রভাবে দুই কোটি ৭০ লাখ মুসলমান প্রাণ হারিয়েছেন। এর সঙ্গে তিনি আরও ৫০ লাখ মুসলমানকে যোগ করেছেন। কারণ তাঁর গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধে যেসব মুসলমান প্রাণ হারিয়েছেন তারা বেঁচে থাকলে তাদের ঔরসে জন্ম নিতো এই ৫০ লাখ মুসলমান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইয়েমেনে কেবল সরাসরি যুদ্ধে যারা নিহত হচ্ছেন তাদের একটা পরিসংখ্যান নিয়মিত তুলে ধরছে। গত মাসে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৯/১১-এর পর ওই পাঁচ মুসলিম দেশে সরাসরি যুদ্ধে মারা গেছেন আট লাখের বেশি মানুষ। এছাড়া সর্বস্ব হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন আরও ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির পরিসংখ্যানে যুদ্ধের প্রভাবে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা তুলে ধরা হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরাসরি যুদ্ধে যে সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায় যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও মহামারিসহ নানা জটিলতায়।

দু’টি পরিসংখ্যানেই এটা স্পষ্ট, গত দুই দশকের যুদ্ধ ও এর প্রভাবে বিশাল সংখ্যক মুসলমান প্রাণ হারিয়েছেন এবং একই কারণে এখনও প্রতি মুহূর্তেই অকালে বহু মুসলমানের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যদি বিভিন্ন দেশে জঙ্গি হামলায় নিহত মুসলমানদের যোগ করা হয় তাহলে সংখ্যাটা আরও অনেক বড় হবে। অনেকের ধারণা জঙ্গি হামলার মূল টার্গেট অমুসলিমরা। কিন্তু বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত দুই দশকের জঙ্গি হামলায় হতাহতদের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই মুসলমান এবং মুসলিম অধ্যুষিত দেশেই বেশির ভাগ হামলা হচ্ছে।

মুসলমানদের এই প্রাণহানি একটা পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞেরই অংশ। বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী শক্তি সুচারুভাবে মুসলিম নিধনের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে একটি অঘোষিত সমঝোতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে কয়েকটি ধাপে এ নিধনযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। প্রথমে সরাসরি সামরিক হামলা চালানো হচ্ছে, এরপর ইসলামের নাম দিয়ে জঙ্গি গোষ্ঠী তৈরি করে তাদেরকে দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে এবং পরবর্তীতে এই জঙ্গিদেরও ধ্বংস করা হচ্ছে আইন ও বিচারের আওতায় এনে অথবা ভিন্ন মতের জঙ্গিদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিয়ে। কারণ তারাও মুসলমান। এখানে মুসলমান নিধনই বড় কথা। ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের গত কয়েক বছরের ঘটনাবলীই এর প্রমাণ। 

মুসলিম বিশ্ব এখন এক জটিল ফাঁদের শিকার। মুসলমানদেরকে দিয়েই মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। এ যেন ঘুঘুর ফাঁদ। ঘুঘুকে দিয়ে ফাঁদ বানিয়ে অন্য ঘুঘুকে খাঁচায় বন্দী করা পাখি শিকারিদের একটা পুরোনো কৌশল। একটা হৃষ্টপুষ্ট ঘুঘুকে আদর-যত্ম করে খাঁচায় রেখে দেয় শিকারি। এ ধরণের ঘুঘু তার শিকারি মালিকের শিসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যেখানে ঘুঘুর আনাগোনা বেশি সেখানে খাঁচাটি রেখে দেওয়া হয়। এরপর আশেপাশে ঘুঘুর উপস্থিতি টের পেয়ে মালিক শিস বাজায় এবং শিস বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে পোষা ঘুঘু খাঁচায় বসে বিশেষ শব্দে ডাকতে শুরু করে। স্বজাতির ডাকে সাড়া দিয়ে নির্ভয়ে ও নির্দ্বিধায় খাঁচায় ঢুকে বন্দী হয়ে পড়ে সাধারণ ঘুঘুরা। পোষা ঘুঘু নিজেও বুঝতে পারে না সে তার স্বজাতির কত বড় ক্ষতি করছে। বর্তমানে জেনে-বুঝে অথবা অজান্তে স্বজাতির সদস্যদের বিভ্রান্ত করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া ঘুঘুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন অনেক মুসলমান। তারা মুসলিম নিধনযজ্ঞের সহায়কে পরিণত হয়েছেন।  

ইসরাইল যে ফিলিস্তিনিদের ভিটেবাড়ি দখল করে এখন তাদের ওপরই জুলুম-নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তা বিশ্বের প্রায় সব মহলেই স্বীকৃত। কিন্তু ইসলামের নামে যেসব জঙ্গি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে তারা এ বিষয়ে সব সময় নিশ্চুপ। দখলদার ইসরাইলের প্রতিবেশী দেশ সিরিয়ার বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছিল এসব গোষ্ঠী। কিন্তু কখনোই তারা ফিলিস্তিনি হত্যার প্রতিবাদে ইসরাইলে হামলাতো দূরের কথা কোনো ধরণের উচ্চবাচ্যও করেনি। যদিও সিরিয়ায় নির্বিচারে মুসলিম হত্যা ঠিকই চলেছে। এসব জঙ্গি গোষ্ঠীর অনেক সদস্য ইসরাইলি বাহিনীর কাছ থেকে চিকিৎসাসহ নানা ধরণের সহযোগিতা নিয়েছে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এবং কোনো কোনো জঙ্গি নেতা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন।

ঐশী ধর্মের সর্বশেষ ভার্সন ইসলামের শত্রুর অন্ত নেই। বিশ্বাসগত ও আদর্শিক শত্রুই বেশি। প্রথম স্তরের শত্রু হচ্ছে নাস্তিকরা। এরপর রয়েছে অন্য সব ধর্মের বিভ্রান্ত অনুসারীরা। পরবর্তী স্তরে রয়েছে মুসলমানদের অন্তর্বিবাদ। নানা কারণে এই অন্তর্বিবাদ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মাজহাবগত দ্বন্দ্বকে সবচেয়ে বেশি উসকে দেওয়া হচ্ছে। মুসলিম নিধনে মাজহাবগত দ্বন্দ্ব ব্যবহৃত হচ্ছে সবচেয়ে নৃশংস পন্থায়। কারণ মাজহাবগত মতপার্থক্য উসকে দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বড় ধরণের বিভক্তি ও সংঘাত সৃষ্টি করা যাচ্ছে খুব সহজেই। শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান মতভেদকে বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে। মুসলমানদেরই কেউ কেউ আবার তা নিয়ে নিজে যেমন ব্যস্ত ও ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়ছেন তেমনি অন্যকেও ব্যস্ত করে তুলছেন। মুসলমানদেরকে ‌এসব কাজে ব্যস্ত রেখে আল্লাহতে বিশ্বাসী সমাজকেই যে ধ্বংস করে ফেলার চক্রান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে তা অনেকেই বুঝতে চান না।

যারা ভাবেন শক্তির জোরে অন্য মাজহাবকে অস্তিত্বহীন করে ফেলবেন তারা ভুল করছেন। মহানবী (স.)-এর ওফাতের পর গত প্রায় ১৪শ' বছর ধরে মাজহাবগত মতবিরোধ চলে এসেছে, ভবিষ্যতেও তা থাকবে। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ির অর্থ হলো নিজের পায়ে নিজের কুড়াল দিয়ে আঘাত করা। এমন অনেক ব্যক্তিকেই মাজহাব নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দেখা যায় যারা এ সংক্রান্ত যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না, মাজহাবগুলোর উৎপত্তি, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখাপড়া করার আগ্রহও তাদের নেই। অন্যের কাছে শুনে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে কেবল বিদ্বেষ বাড়ানোই তাদের কাজ।   

ইসলামে নানা সময় নানা ধরণের বিভক্তি ঘটেছে। ইসলাম ধর্মে এত বেশি মাজহাব বা শাখা রয়েছে যেগুলোর কোনো কোনোটির নামও আমরা জানি না। আমরা ক'জন জানি আরব দেশ ওমানের রাষ্ট্রীয় মাজহাব হচ্ছে ইবাদি? এটি শিয়া বা সুন্নি মাজহাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। মাজহাবগত দ্বন্দ্ব নিয়ে বসে থাকলে মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি ক্রমেই আরও বাড়বে। সব মাজহাবের মুসলমানই আল্লাহ, রসূল ও কুরআনে বিশ্বাসী। এটাই হতে পারে ঐক্যের মূল ভিত্তি। তবে মাজহাব নিয়ে আলোচনা কি বন্ধ হয়ে যাবে? না, বন্ধ হবে না। মাজহাব নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা চালাতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে হবে। যে যার মাজহাব সম্পর্কে তথ্য ও যুক্তি অন্যের সামনে তুলে ধরতে পারে। এরপর পড়াশোনা ও বিবেকের মাধ্যমে কেউ চাইলে নিজেকে শুদ্ধতর মাজহাবের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। মুসলমানরা যখন অস্তিত্ব সংকটে সে মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিবাদ বাড়িয়ে তুললে তা আল্লাহর কাছে অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে।

মুসলমানদেরকে এখন ঐক্যবদ্ধভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে হবে। ইসলামবিরোধী শক্তি মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির জন্য বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করছে এবং মুসলমানদের পশ্চাৎপদ করে রাখতে সবাই ঐক্যবদ্ধ। একইসঙ্গে তারা পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-কে ভ্রান্ত প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখে ইসলাম ধর্মকে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে সবার সামনে তুলে ধরার চেয়ে বড় দায়িত্ব আর কী হতে পারে? যারা জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত তাদের কারণে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হচ্ছে তাহলো শান্তির ধর্ম ইসলাম গোটা বিশ্বে হিংস্র ধর্ম হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। ইসলাম বিরোধী শক্তি সব সময় এটাই চাইছে।

ইসলাম ধর্ম এসেছে বিশ্বে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য। ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক দর্শন ও কাঠামো রয়েছে। কোনো তৎপরতার চূড়ান্ত পরিণতি যদি অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা হয় তাহলে ইসলাম ধর্ম তা সমর্থন করে না। এ অবস্থায় শত্রুদের ফাঁদ থেকে বাঁচতে বিশ্বের মুসলমানদেরকে এখন ইসলাম ধর্মকে সঠিকভাবে উপস্থাপনের কাজে সময় দিতে হবে। ইসলামবিরোধী আস্তিক ও নাস্তিক মানুষগুলোর সামনে ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে।

লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।

[email protected]

ট্যাগ

মন্তব্য