ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯ ২১:১৭ Asia/Dhaka
  • বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা টার্গেট কেন, উৎস কোথায়?

ড. সোহেল আহম্মেদ: বিশ্বের প্রায় সব অমুসলিম দেশেই মুসলমানেরা নানা ভাবে চাপের মুখে। কোথাও কোথাও সরাসরি হত্যা-নির্যাতনের শিকার। মুসলমানেরা এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কয়েক বছর আগেও যেসব ভারতীয় মুসলিম সাংবাদিক বন্ধু সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশের নাগরিক হতে পেরে গর্ববোধ করতেন এখন তারাও বলছেন ‘খুব চাপ অনুভব করছি’।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেদেশে মুসলমানদের ওপর চাপ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বুঝিয়ে দেন মুসলমানরাই তার প্রধান টার্গেট। গণতন্ত্রে গণশাস্তি দেওয়ার কোনো বিধান নেই। কিন্তু সাত মুসলিম দেশের সব নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন শাস্তিরই আদেশ দেন ট্রাম্প।

ভারত সরকার সারা দেশে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি করার ঘোষণা দেওয়ার পর অনেক মুসলিম নাগরিক হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন। যদিও ভারত সরকার বলছে, এ ধরণের কোনো আশঙ্কা নেই। অনেক মুসলমানই এখন ভয় পাচ্ছেন তারা জাতীয় পরিচয়হীন হয়ে পড়তে পারেন, কারণ তাদেরকে বিশদভাবে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের অধিবাসী ছিলেন। আসামের উদাহরণ টেনে তারা বলছেন, আসাম রাজ্যের ১৯ লাখের বেশি মানুষের নাম জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি-তে স্থান পায় নি। এর মধ্যে রয়েছে হিন্দুসহ ১২ লাখ অমুসলিম এবং ছয় লাখের বেশি মুসলমান। নতুন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অনুযায়ী অমুসলিমরা হয়তো সহজেই তাদের নাগরিকত্ব ফিরে পাবেন। কিন্তু চূড়ান্ত ভাবে বাদ পড়া মুসলমানদের কী হবে?

আসামের এনআরসি থেকে বাদ পড়া অনেকের দাবি, তারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের অনেক আগে থেকেই আসামের বাসিন্দা, কিন্তু এই বাস্তবতা প্রমাণের মতো বিশদ দলিল-প্রমাণ তাদের কাছে নেই। অনেকেই বংশ পরম্পরায় ভূমিহীন, দিনমজুর, ভাসমান ও ভবঘুরে। এনআরসিতে স্থান করে নেয়ার মতো কোনো দলিল-প্রমাণই তাদের হাতে নেই। শুধু তাই নয়, আসাম তথা গোটা ভারতের ইতিহাসই যাদের নাগরিকত্বের বড় সনদ তাদেরও অনেকেই নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। এদের মধ্যে ভারতের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দিন আলি আহমেদের পরিবার অন্যতম। ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভারতের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাবা কর্নেল জালনুর আলি আহমেদ ছিলেন আসামের আদিবাসী পরিবারের প্রথম কোনো সন্তান যিনি চিকিৎসা বিদ্যায় ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রী অর্জন করতে সক্ষম হন। ভারতের লিখিত ও অলিখিত ইতিহাস এই পরিবারের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এই পরিবারের কয়েক জনের নাম এনআরসি-তে স্থান পায় নি। আর এ ধরণের পরিস্থিতিই ভারতে মুসলমানদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি করেছে।

ইউরোপেও মুসলমানদের চাপে রাখতে সরকারি-বেসরকারি নানা পদক্ষেপ লক্ষণীয়। মুসলিম নারীদের জন্য ফরজ বিধান হিজাবকে আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার প্রবণতা শুরু হয়েছে ইউরোপের দেশগুলোতে। খুব সম্প্রতিও নরওয়েতে মুসলমানদের পবিত্রতম গ্রন্থ কুরআনের অবমাননা করা হয়েছে প্রকাশ্যে। গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিম হওয়ার কারণে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেটে প্রকাশ্যে লাথি মারার ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে মিয়ানমার, চীন ও শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের যেসব অমুসলিম দেশে মুসলমানের সংখ্যা কিছুটা চোখে পড়ার মতো, সেসব দেশ থেকেও প্রতিনিয়ত খারাপ খবর আসছে।

কিন্তু গোটা বিশ্বেই মুসলমানদের টার্গেট করা হচ্ছে কেন? এর একটি বড় কারণ হলো ইসলামফোবিয়া বা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ভীতি ও আতঙ্ক। মুসলমান মানেই সহিংস-এমন ভ্রান্ত ধারণা সব অমুসলিমের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে বহু বছর ধরেই তৎপরতা চলছে। বিশেষকরে ফিলিস্তিনিদের ভিটেবাড়ি দখল করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই তৎপরতা বেড়েছে। এই অপকর্মকে ঢাকতে মুসলমানদের ভাবমর্যাদা ধ্বংস করে তাদের কোণঠাসা করা ছাড়া ভিন্ন কোন পথ দেখছে না পাশ্চাত্যের আধিপত্যকামী শক্তি। এ কারণে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমও ইসলামফোবিয়া বা ইসলামভীতি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রায় গোটা বিশ্ব বিশেষকরে পাচ্যের দেশগুলোর ওপর পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রভাবের কারণে এই ভীতি এখন সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে।

ইসলাম সম্পর্কে আতঙ্ক তৈরির পেছনে ইসলাম বিরোধী শক্তির পাশাপাশি খোদ মুসলমানদের একটা অংশও দায়ী। কিছু মুসলমান জেনে-বুঝে অথবা নিজেদের অজান্তে এই প্রচারণায় সহযোগিতা করছে। আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ায় তালেবান, আল-কায়েদা ও আইএস’র কিছু নির্মম হত্যাকাণ্ড ইসলামফোবিয়া তৈরির কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। সিরিয়া ও ইরাকে দায়েশ বা আইএস কিছু মানুষকে পুড়িয়ে, পানিতে চুবিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে সেগুলোর ভিডিও নিজেরাই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাও ধ্বংস করেছে। এসব নির্মমতা ও ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও এখনও ইন্টারনেটে রয়েছে এবং প্রতি মুহূর্তে অগণিত মানুষ তা দেখছে। মুসলমানদের সহিংস প্রমাণ করতে এসব ছবি ও ভিডিও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসলাম ধর্মের শত্রুরা এসব নৃশংসতার সঙ্গে মানব জাতির আদর্শ হজরত মোহাম্মাদ (স.) ও পবিত্র কুরআনকে জড়িয়ে দিচ্ছে এবং পবিত্রতম এই মানব ও ঐশী গ্রন্থ কুরআনের অবমাননা করছে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে হজরত মুহাম্মদ (স.) নিজে কখনোই এ ধরণের নৃশংসতা চালাননি এবং অন্যকেও এ ধরণের নৃশংসতার অনুমতি দেননি। কিন্তু আধিপত্যকামী শক্তি ইতিহাসের পরোয়া করে না, তারা মিথ্যাচারের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, হজরত মুহাম্মদ (স.) কখনোই কারো ওপর নির্যাতন করেন নি এবং অন্যায় ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেন নি বরং প্রথম থেকে তিনিই ছিলেন নির্যাতিত। তিনি নিজ মাতৃভূমি মক্কাতে নানা অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে মদিনায় চলে যান। মক্কার প্রভাবশালীরা মদিনাতেও মহানবীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালায়। এ কারণে মদিনায় আসার দ্বিতীয় বছরেই হজরত মুহাম্মদ (স.) ও তার অনুসারীদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ হচ্ছে বদরের যুদ্ধ। মক্কার ইসলাম বিরোধীরা এক হাজারের বেশি সেনা নিয়ে যুদ্ধ করতে এসে ৩১৩ জন মুসলমানের কাছে হেরে যায়। কিন্তু মহানবী (স.) সহজ শর্তে যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেন। তবু ষড়যন্ত্রকারীদের উসকানি থেমে থাকেনি। এরপর উহুদের ও খন্দকের যুদ্ধও মোকাবেলা করেন মুসলমানেরা। খন্দকের যুদ্ধে ১০ হাজার সেনা নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে তিন হাজার মুসলমানের কাছে পরাজিত হয় আগ্রাসী বাহিনী। এই আগ্রাসনে ইহুদিরাও অংশ নিয়েছিল। মহানবী (স.) তাদের ক্ষমা করে দেন, তাদের বাড়ি ও জমি-জমাও ফেরত দেন। তিনি কাউকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেন নি।

খন্দকের যুদ্ধে বিজয়ের প্রায় এক বছর পর তিনি প্রায় দেড় হাজার মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে ওমরা করতে মক্কার দিকে রওনা হন। ইসলাম-বিরোধীরা খবর পেয়ে তাঁদের পথ আটকে দেয়। কিন্তু মানবতার আদর্শ হজরত মুহাম্মদ (স.) সংঘর্ষে না জড়িয়ে একটি চুক্তি সই করে মদিনায় ফিরে আসেন। ওই চুক্তির নাম হুদাইবিয়ার সন্ধি। এই সন্ধির প্রায় দুই বছরের মধ্যে গোটা মক্কা জয় করেন মহানবী। মক্কার ইসলাম বিদ্বেষীরা ভেবেছিল এবার হয়তো চরম প্রতিশোধ নেবেন মুহাম্মদ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী সেখানে কোনো রক্তপাত ঘটায়নি মুসলিম বাহিনী। মহানবী (স.) সবাইকে ক্ষমা করে দেন। ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। তিনি সেদিন কাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন? এরা তারাই যারা মহানবীকে মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য করেছিল এবং ইসলামকে ধ্বংসের জন্য সব পন্থা অবলম্বন করেছিল। মক্কা বিজয় পরবর্তী ঘটনা থেকেও এটা স্পষ্ট ইসলামের নবীর অস্তিত্বজুড়েই ছিল শান্তিকামিতা। কিন্তু আজ এই শান্তির দূতকে নিয়েই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

যারা হজরত মুহাম্মাদ (স.) ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য মুসলমানদেরকে বর্বর ও সন্ত্রাসী হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করা। এর মাধ্যমে পাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যকামী শক্তি এবং পুঁজিপতিরা তাদের অতীত ঘৃণ্য ইতিহাসকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে চায়। মুসলমানদেরকে সবচেয়ে বর্বর ও সহিংস হিসেবে তুলে ধরে তারা যেসব ইতিহাস আড়াল করতে চায় সেগুলোর কয়েকটি হচ্ছে- ফিলিস্তিনিদের ভিটেবাড়ি দখল করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মমতা ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির ইতিহাস, আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদেরকে হত্যার ইতিহাস, আফ্রিকা থেকে মুসলমানসহ নানা ধর্ম-মতের মানুষকে ধরে এনে দাস বানানোর ইতিহাস, জাপানে পরমাণু বোমা মেরে লাখ লাখ মানুষ হত্যার ইতিহাস এবং দুই মহাযুদ্ধ বাধানোর ক্ষেত্রে তাদের সম্পৃক্ততার ঘৃণ্য ইতিহাস।

মুসলমানেরা সব সময় মহানবী(স.)’র পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করেছে তা বলা যাবে না। মুসলমানেরাও ইতিহাসে অনেক ভুল-ভ্রান্তি করেছে, এখনও করছে। কিন্তু তা এমন পর্যায়ে যায় নি যে, মুসলমানদেরকে ইতিহাসের বর্বর জাতি হিসেবে প্রমাণ করা যাবে। বর্তমান অবস্থায় অপপ্রচারের প্রভাব ঠেকাতে মুসলমানদের উচিৎ নিজেদেরকে আরও শান্তিকামী হিসেবে প্রমাণ করা এবং অশান্তির মূল হোতাদের চেহারা  যুক্তি-প্রমাণসহ তুলে ধরা। এর পাশাপাশি নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি চিহ্নিত করে  আত্মসংশোধন জোরদার করতে হবে, যারা জেনে-বুঝে অথবা অজান্তে সহিংসতার পথে গিয়ে ইসলামের অপূরণীয় ক্ষতি করছে তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা জোরদার করতে হবে। সহিংসতার পথ যে ইসলাম ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি করছে তা তাদের বুঝাতে হবে। মুসলমানদের সতর্ক থাকতে হবে তারা নিজেরাই যেন নিজেদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ক্ষেত্র প্রস্তুত না করেন।#

লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।

[email protected]

ট্যাগ

মন্তব্য