জানুয়ারি ২৯, ২০২০ ২১:২৫ Asia/Dhaka
  • জেনারেল সোলাইমানি (বামে) ও ইউসুফ এলাহি (ডানে)
    জেনারেল সোলাইমানি (বামে) ও ইউসুফ এলাহি (ডানে)

ড. সোহেল আহম্মেদ: ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি’র কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী মোহাম্মাদ হোসেন ইউসুফ এলাহি নামের এক শহীদের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। সোলাইমানি শহীদ হওয়ার পরপরই খবর আসে, নিজের জন্মশহর কেরমানে এক শহীদের কবরের পাশে দাফন করতে বলে গেছেন তিনি।

তখন থেকেই আমার কৌতূহল, কে সেই ব্যক্তি যার পাশে সমাহিত হতে ওসিয়ত (ইচ্ছা প্রকাশ) করে গেছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। মোহাম্মাদ হোসেন ইউসুফ এলাহি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এমন কিছু তথ্য পেলাম যা বর্তমান সমাজের অনেকের কাছেই পুরোপুরি অবিশ্বাস্য। এসব তথ্য একেবারেই আধ্যাত্মিক।

ইরানের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা সাধারণত পবিত্র মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.) ও কোমে হজরত মাসুমা (সা.আ.)’র মাজার প্রাঙ্গণে নিজেকে দাফন করতে ওসিয়ত করে যান। এছাড়া অনেকেই রাজধানী তেহরানে ইমাম খোমেনি (রহ.)’র মাজারের অদূরে বিখ্যাত বেহেশতে জাহরা কবরস্থান অথবা নিজের প্রিয়তম ব্যক্তিদের কবরের পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এদিক থেকে কাসেম সোলাইমানি’র ওসিয়ত অনেকটাই ব্যতিক্রমী।

ওসিয়ত অনুযায়ী জেনারেল সোলাইমানিকে যেখানে কবর দেওয়া হয়েছে সেই এলাকাটি রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় আটশ’ কিলোমিটার দূরে। শহরের নাম কেরমান। এটি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বের প্রদেশ কেরমানের কেন্দ্রীয় শহর। শহরের অদূরে শহীদদের জন্য গড়ে ওঠা ওই কবরস্থানের সদস্য সংখ্যা কিছু দিন আগেও ছিল এক হাজার ১১ জন। কাসেম সোলাইমানি যুক্ত হওয়ায় এ সংখ্যা এক হাজার ১২ জনে উন্নীত হয়েছে। এদেরই একজন হলেন জেনারেল সোলাইমানির প্রিয় পাত্র মোহাম্মাদ হোসেন ইউসুফ এলাহি। তিনি জাতীয়ভাবে খুব বেশি পরিচিত নন। তবে তার সম্পর্কে বই ও নিবন্ধ রয়েছে। মেহদি ফারাহানির লেখা ‘নাখলে সুখতে’ বইয়ে শহীদ ইউসুফ এলাহি সম্পর্কে কয়েকজনের স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে যা আমাকে আবেগ-আপ্লুত করেছে। ফার্সি নাম 'নাখলে সুখতে' অর্থ হচ্ছে পুড়ে যাওয়া খেজুর গাছ। লেখক সম্ভবত রূপক অর্থে এই নাম ব্যবহার করেছেন।

১৯৮৬ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ২৫ বছর বয়সে ইউসুফ এলাহি রাসায়নিক হামলায় আহত হয়ে তেহরানের একটি হাসপাতালে মারা যান। ইরাক সীমান্তে কাসেম সোলাইমানির নেতৃত্বে দীর্ঘ দিন যুদ্ধ করেছেন তিনি। একদিন তাদের ঘাঁটিতেই রাসায়নিক হামলা করে বসে ইরাকি বাহিনী। নিষিদ্ধ রাসায়নিক গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে তারা বাঙ্কার থেকে বের হতে বাধ্য হন। ইউসুফ এলাহি সবাইকে বাঙ্কার থেকে বাইরে পাঠিয়ে নিজে সবার শেষে বের হন। এরপর ইউসুফ এলাহিকে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় তেহরানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

ইরাক সীমান্তে ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে সহযোদ্ধাদের সবাই এই তরুণকে আরেফ ও পরহেজগার হিসেবে চিনতেন। সহযোদ্ধাদের বর্ণনা থেকে তার কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা জানা যায়। এছাড়া জেনারেল সোলাইমানি নিজে ইউসুফ এলাহি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, 'তখন যুদ্ধ চলছিল। এলাহিকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে বললাম গত কয়েকটি অভিযানের একটিতেও সন্তোষজনক সাফল্য পাই  নি আমরা, সামনে যে অভিযান এটাতো আরও কঠিন ও জটিল অভিযান। এটাতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এলাহি এ কথা শোনে বলল, ঘটনাক্রমে এই অভিযানেই আমরা সফল হব। কোথা থেকে সে এত নিশ্চিত সে কথা জানতে চাইলে ইতস্তত করে বলল, আমি নিশ্চিত হতে পেরেছি। আমি খবর পেয়েছি।' আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে আগামবার্তা এর আগেও এলাহি অনেক সহযোদ্ধাকে দিয়েছেন। এ কারণে তার কথায় বিশ্বাস করেন সোলাইমানি এবং শেষ পর্যন্ত সেই অভিযানে তারা সফল হন।

'নাখলে সুখতে' বইয়ে ইউসুফ এলাহির সহযোদ্ধারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনের অন্যান্য নামাজের পাশাপাশি নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজে মগ্ন হতেন ইউসুফ এলাহি।  এই শহীদ সম্পর্কে তার এক ভাই বলেছেন, 'তেহরানের লাব্বাফি নেজাদ হাসপাতালে তখন ইউসুফ এলাহি চিকিৎসাধীন। কেরমান থেকে রওনা হয়ে তেহরানে পৌঁছেছি। হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেই এক  যুবক এগিয়ে এসে বলল আপনি কি ইউসুফ এলাহির ভাই। বললাম-জ্বি। বললো আমার সঙ্গে আসুন। ইউসুফ এলাহি আপনাকে নিতে আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি ও আমার আরেক ভাই অবাক হয়ে তার সঙ্গে গেলাম। রুমে ঢুকে ইউসুফ এলাহিকে জিজ্ঞেস করলাম-তুমি কিভাবে জানলে আমরা আসছি। সে জবাবে বলল- আপনারা যখন কেরমান থেকে গাড়িতে উঠেছেন তখন থেকেই আমি আপনাদেরকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমরা ঠিক কয়টায় রওনা হয়েছি, কোন রঙের গাড়ি দিয়ে এসেছি তার সবই বলে দিতে পারল ইউসুফ এলাহি।'

ইউসুফ এলাহির এক সহযোদ্ধা জানিয়েছেন, 'একবার তাদের ব্রিগেডের দুই সেনা সীমান্তবর্তী নদীতে শত্রুর ওপর নজর রাখতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজাখুঁজির পরও তাদের পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা এই খবর ইউসুফ এলাহিকে জানাই। এলাহি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে অবহিত করে। কমান্ডার সোলাইমানি দ্রুত খবরটি ঘাঁটির সবাইকে জানাতে বলেন। সোলাইমানি বলেছিলেন, হয়তো ইরাকি সেনারা তাদের দুই জনকে আটক করেছে। এর ফলে আমাদের পরবর্তী অভিযানের খবর তারা জেনে যাবে। সবাইকে বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। ইউসুফ এলাহি কমান্ডারের অনুমতি চেয়ে বলল, আজ রাতটা যাক। আমি সকালেই জানাতে পারব ওদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। কমান্ডার অনুমতি দিলেন। সকালে ইউসুফ এলাহি জানাল-ওরা বন্দী হয়নি, ওরা দু’জনই শহীদ হয়ে গেছে। ওদের দু’জনের একজনের নাম ছিল আকবার মুসায়িপুর, অপর জনের নাম হোসেন সাদেকি। বলল-আমি ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা ধরা পড়ে নি, শহীদ হয়ে গেছে। এরপর জানাল নদীর তীরে ওদের মরদেহ পাওয়া যাবে। আমরা নদীর ধারে অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রথমে আকবার মুসায়িপুর ও পরে হোসেন সাদেকির মরদেহ আমরা খোঁজে পাই এবং নিয়ে আসি।'

এমন আরও অনেক ঘটনাই তার সহযোদ্ধারা বর্ণনা করেছেন যা থেকে এটা স্পষ্ট, ইউসুফ এলাহি ছিলেন একজন বড় মাপের আরেফ। ইউসুফ এলাহি এবাদত-বন্দেগি ও সৎকর্মের মাধ্যমে এতো উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছিলেন যে, স্বপ্নে আগাম বার্তা পেয়ে যেতেন। ইউসুফ এলাহির সরাসরি কমান্ডার হিসেবে এসব তথ্য সবার চেয়ে বেশি জানতেন কাসেম সোলাইমানি। এমন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিকে স্বচক্ষে দেখাও অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। এ কারণেই হয়তো এমন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের চিরদিনের প্রতিবেশী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি সোলাইমানি। তিনি স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বলে যান, তাঁর (ইউসুফ এলাহি) পাশে কবর পাওয়ার ইচ্ছা আমার।'

প্রায় ১১ মাস আগেও ওই কবরস্থানে গিয়েছিলেন সোলাইমানি। সে সময় জেনারেল সোলাইমানির সঙ্গে কেরমান প্রদেশের শহীদ ফাউন্ডেশনের সাবেক প্রধান মোহাম্মাদ রেজা হাসানি সাদি’র দেখা হয়। ওই কবরস্থানে দাঁড়িয়ে তিনি সোলাইমানির কাছে জানতে চান, শুনেছি আপনি ইউসুফ এলাহির পাশে যাতে সমাহিত হওয়ার সুযোগ পান সেজন্য আবেদন করেছেন, তাই না? জবাবে জেনারেল বলেছিলেন, হ্যাঁ। তবে ওর একেবারে পাশের জায়গাটা খালি না থাকলে ওর কবরের আশেপাশে হলেও চলবে।

তবে  ইউসুফ এলাহির একেবারে পাশে কবর পাওয়ার ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে কাসেম সোলাইমানির। তারা পাশাপাশিই শুয়ে আছেন সেখানে। কাসেম সোলাইমানির আরও একটি ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে সেখানে। তিনি স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, তার কবরের ওপর যেন কোনো পদবী বা খেতাব লেখা না হয়, কবর যেন হয় একেবারেই সাদাসিধা। বিপ্লব-উত্তর ইরানে সর্বোচ্চ পদক 'জুলফিকার' অর্জনকারী একমাত্র জেনারেলের কবরের ওপর স্থাপিত পাথরটি তাই এখনও একেবারেই খালি, সেখানে কিছুই লেখা হয়নি। যারা জিয়ারতে যাচ্ছেন তারা প্রথমে চলে যাচ্ছেন ইউসুফ এলাহির কবরে। কারণ সবাই জানে ইউসুফ এলাহি’র কবরে গেলেই পাওয়া যাবে কাসেম সোলাইমানির সন্ধান। আজীবন প্রচার-বিমুখ সোলাইমানি মৃত্যুর পরও যেন নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন। এক সময়ের অধীনস্থ যোদ্ধা শহীদ ইউসুফ এলাহি’র পরিচয়েই যেন পরিচিত হতে চাইলেন।  #

লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।

[email protected]

ট্যাগ

মন্তব্য