মার্চ ২২, ২০২০ ০৫:২০ Asia/Dhaka

২৭ রজব মুসলমানদের জন্যে অত্যন্ত আনন্দঘন, বরকতময় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যসমৃদ্ধ দিবস। মুসলমানদের একাংশের মতে ২৭ রজব তারিখে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) উর্ধ্বলোকে আধ্যাত্মিক সফর বা মে’রাজে গমন করেছিলেন। রাতের বেলায় এই সফর সম্পন্ন হয়েছিল বলে তা শাবে মে’রাজ বা লাইলাতুল মেরাজ হিসেবে খ্যাত। এ ছাড়াও শিয়া মুসলিম সমাজের আলেমরা মনে করেন ২৭ রজব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র নবুওত প্রাপ্তি দিবস।

তাঁদের মতে এই দিনেই পবিত্র কোরআন সামগ্রীকভাবে রাসূলে পাক (সাঃ)’র কাছে নাজেল হয়েছিল। আর ধাপে ধাপে পবিত্র কোরআনের বাণী প্রথম নাজেল হয়েছিল রমজান মাসের ক্বদরের রাতে। তারা আরও মনে করেন বিভিন্ন সময়ে মহানবীর (সা) বেশ কয়েকবার মে'রাজ হয়েছিল। উর্দ্ধলোকে তাঁর এসব আধ্যাত্মিক সফরের সময় তিনি মহান আল্লাহর বিশেষ আধ্যাত্মিক-সাক্ষাত পেয়েছিলেন এবং বেহেশত ও দোযখসহ অদৃশ্য জগতের নানা বিষয় দেখেছিলেন। যা-ই হোক পবিত্র ২৭ রজবের এই দিনে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও তার পবিত্র বংশধরদের শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম।

তোমারে না সৃজিলে প্রভু জগত সৃজিত না কভু

সৃষ্টির মূলে যে তুমি একথা বলেছেন বিভু ...

যতদিন এ দুনিয়া রবে চাঁদ-সুরুয আকাশে হবে

তোমারি নামের বাঁশি বাজিতে রহিবে ভবে

পৃথিবী যখন অজ্ঞতা, নৈরাজ্য, হানাহানি, কুসংস্কার ও মানবতাহীনতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল তখন মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.) কে মানবজাতির সর্বশেষ রাসূল ও নবী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল মানব জাতিকে মুক্তির আলোকিত পথে এনে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষকে পূর্ণতা দান করা। সূরা আলে ইমরানের ১৬৪ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে-

'নিঃসন্দেহে আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল হিসেবে মনোনীত করেন যিনি তাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশাবলী পাঠ করেন,তাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করেন সব ধরনের অজ্ঞতা ও বর্বরতার কলুষতা থেকে,তাদেরকে ধর্মের বিধান ও  হিকমাত তথা প্রজ্ঞা আর জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দেন,যদিও এর আগে তারা ছিল অজ্ঞানতা ও বিপথগামীতার অন্ধকারে নিমজ্জিত।'

পবিত্র কুরআনে সুরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বা মহাকরুণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও সুরা আহজাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,"আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া কর এবং তাঁর প্রতি সালাম পাঠাও।"

এ থেকে বোঝা যায় মহানবী (সা.) মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে অভ্যস্ত কোনো অমুসলিম পণ্ডিতও কখনও বিশ্বনবী (সা.)'র অতুলব্যক্তিত্বের অনন্য প্রভাব,মহত্তম মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠ গুণগুলোর কথা অস্বীকার করতে সক্ষম নন। কারণ, মানব সভ্যতার সবচেয়ে সমৃদ্ধ পর্যায়গুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সা.)'র অতুলনীয় মহত্ত্ব ও গুণের ছাপস্পষ্ট।

সুরা আহজাবের ৪৫ ও ৪৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, "হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছিএবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়ক ও উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।"

বিশ্বের জাতিগুলো যখন নানা ধরনের মনগড়া খোদা বা মূর্তির পূজা করছিল এবং অজ্ঞতা,উদাসীনতা ও কুসংস্কার সর্বত্র জেঁকে বসে তখন মক্কা শহরে ইসলামের চির-উজ্জ্বল মশাল নিয়ে আবির্ভূত হন বিশ্বনবী (সা.)। তিনি মানবীয় মর্যাদা, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়ে উপহার দেন সবচেয়ে সুন্দর এবং সর্বোত্তম বক্তব্য। এভাবে তিনি মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষকের অক্ষয় আসনে সমাসীন হন।

বিশ্বনবীর(সা.) মধ্যে সব নবী-রাসূল ও আওলিয়ার গুণের সমাবেশ ঘটেছে, তিনি  উচ্চতর সেইসব গুণাবলীর পরিপূর্ণ ও পরিপক্ক সংস্করণ-যেসব গুণ যুগে যুগে নবী-রাসূল ও আওলিয়ার মধ্যে দেখা গেছে।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র নবুওত প্রাপ্তি সম্পর্কে খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা জাহরা (সাঃ) বলেছেন, মহান প্রতিপালক মুহাম্মাদ (সাঃ)কে মনোনীত করেছিলেন বা দাঁড় করিয়েছিলেন যাতে আল্লাহর নিজের কর্তব্য পরিপূর্ণ হয় এবং তিনি মানবজাতির জন্যে যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তা যেন সম্পন্ন হয়। মহান আল্লাহ মানুষের মধ্যে বিরাজমান অজ্ঞতা ও কু-প্রথার মহাআঁধার মুহাম্মাদের আলোর মাধ্যমে দূর করেন।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র আবির্ভাব গোটা মানব জাতির জন্যে আল্লাহর নিজস্ব রহমত বা  বিশেষ অনুগ্রহ। বিশ্বনবী (সা.) আবির্ভূত হয়েছিলেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে। তিনি মানুষকে শেখালেন প্রকৃত সাম্য,ন্যায়বিচার,ভ্রাতৃত্ব এবং  প্রকৃত স্রষ্টার ইবাদত। তাঁর প্রচারিত ধর্মের শিক্ষা বিশ্ব সভ্যতাকে এতো বেশী সমৃদ্ধ করেছে যে এর আগে সভ্যতা কখনও এতো সমৃদ্ধ ও উন্নত হয় নি। তাই অনেক অমুসলিম চিন্তাবিদ ও মনীষীও রাসূলে পাক (সা.)কে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রখ্যাত ভারতীয় লেখিকা সরোজিনী নাইডু  বিশ্বনবী (সা.)’র আদর্শ তথা ইসলাম সম্পর্কে দ্যা আইডিয়ালস অব ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন, 'ন্যায়বিচারবোধ ইসলামের এক অনুপম আদর্শ। যখনই আমি কোরআন অধ্যয়ন করেছি তখন প্রত্যক্ষ করেছি জীবন সম্পর্কিত সমস্ত গতিশীল নীতিকথা যা ভাববাদী অর্থে নয় বরং বাস্তব অর্থেই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার পথনির্দেশনা। '

বিশ্বনবী (সা.) মানুষের কাছে যে ধর্ম প্রচার করেছেন সে সম্পর্কে এ. জে. টয়েনবি লিখেছেন 'মুসলমানদের মধ্যে সংকীর্ণ জাতি বা গোত্রীয় চেতনার পরিপূর্ণ বিলোপ সাধন ইসলামের এক অবিসম্বাদী সাফল্য। বর্তমান বিশ্বকে গোষ্ঠী-প্রীতির অভিশাপ থেকে বাঁচানোর জন্যে ইসলামের প্রচার অত্যন্ত জরুরী। '

জর্জ বার্ণার্ড শ বিশ্বনবী (সা.’র অবদান ও আদর্শ সম্পর্কে 'দ্যা জেনুয়িন ইসলাম' গ্রন্থে লিখেছেন, 'মুহাম্মাদ (সা.)কে যতটুকু আমি জেনেছি তাতে অকুন্ঠচিত্তে বলতে পারি,তিনি সমগ্র মানবজাতির ত্রাণকর্তা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি,বর্তমান সময়ে যদি তাঁর মতো মহান ব্যক্তি পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন তবে তিনি মানব জাতির সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারতেন, আজকের দিনে যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী।'

পবিত্র কুরআনের ভাষায় জীবনে চলার পথ, মত ও স্বভাব বা আচরণের দিক থেকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ছিলেন শ্রেষ্ঠ আদর্শ বা উসওয়াতুন হাসানাহ। জীবনের সব ক্ষেত্রে এবং কখন কোথায় কী করতে হবে তা জানার শ্রেষ্ঠ উৎস হলেন মহানবী (সা)। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আইনি ও রাষ্ট্রীয় জীবনসহ জীবনের সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। কথায় ও কাজে সবক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সা)-কে অনুসরণ করাই হবে একজন প্রকৃত মুসলমানের জন্য ঈমানের দাবি। তা না হলে আল্লাহর সর্বশেষ রাসুলের রেসালতের প্রতি বিশ্বাস রাখার দাবি করাটা হবে প্রতারণা মাত্র।

কেউ যদি মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হতে চান তাহলে তাঁর জন্য পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত মহান আল্লাহর যে পরামর্শটি হৃদয়ে গেঁথে নেয়া উচিত তা হল: ‘হে রাসুল! আপনি তাদের বলুন, যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার তথা আল্লাহর শেষ রাসুলের অনুসরণ কর যাতে আল্লাহও তোমাদের ভালবাসেন।’

মহানবী (সা) চেয়েছিলেন তাঁর আশপাশের সব মানুষকে তাঁরই আদর্শের ধারায় শ্রেষ্ঠ বা পূর্ণাঙ্গ মহামানব হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু সবাই তাঁর দাওয়াতকে গ্রহণ করেনি। অনেকেই মুশরিক ও কাফিরই থেকে গেছেন। কেউ কেউ নামে মুসলমান হলেও বাস্তবে  ছিলেন মুনাফিক। কিন্তু বিশ্বনবীর আহলে বাইতের সদস্যরা ছিলেন তাঁরই কাছাকাছি পর্যায়ের আদর্শ মহামানব যাঁদের নিষ্পাপ হওয়ার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে পবিত্র কুরআনেই।

তাই মহানবীর (সা) আদর্শ ও পবিত্র কুরআনকে ভালোভাবে বুঝতে হলে জানতে হবে পবিত্র আহলে বাইতের জীবন-ধারাকে। জানতে হবে কিভাবে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করেছিল নানা বিচ্যুতি, অনাচার, জুলুম ও ইয়াজিদি স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র প্রভৃতি। বিশ্বনবীর আহলে বাইতের আদর্শকে ছেড়ে দেয়ার কারণেই যে মুসলমানদের মধ্যে নানা বিভক্তি এবং অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছিল তাও বোঝা সম্ভব হবে ইসলামের ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

আজ মুখে মুখে ইসলামের বড় বড় বুলি আওড়ানো সত্ত্বেও সস্তা জনপ্রিয়তার অধিকারী অনেক কথিত ইসলামপন্থী নেতা সহযোগী হয়েছেন ইহুদিবাদী ইসরাইলের এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নানা নোংরা খেলা বা ষড়যন্ত্রের চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। মুসলমানদের এক বিশাল অংশ খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলাম থেকে দূরে থাকার কারণেই এসব সম্ভব হচ্ছে। মুসলমানদেরকে এটা বুঝতে হবে যে কারা তাদের প্রকৃত ও বড় শত্রু।

বিশ্বনবী (সা)’র রেসালাত মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। সেই মহান বিপ্লবের ধারাবাহিকতা ও সাফল্য ধরে রাখাটা ছিল মুসলমানদের দায়িত্ব। ইসলাম এ জন্যই প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জনকে ফরজ বলে ঘোষণা করেছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র) বলেছেন, ‘রাসুলে খোদার রিসালাতের বার্ষিকীর চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর কোনও দিবস নেই। কারণ,এর চেয়ে বড় কোনও ঘটনা আর ঘটেনি। অন্যান্য নবী-রাসুলের নিযুক্তির চেয়েও এ ঘটনা অনেক বেশি বড়। এর চেয়ে বড় কোনও ঘটনা থাকার বিষয় কল্পনাও করা যায় না। এমন দিনে জনগণকে জুলুম থেকে মুক্তির উপায় বোঝাতে হবে জোরালোভাবে যাতে তারা বড় বড় জালিম শক্তিগুলোকে মোকাবেলা করতে পারে। জনগণ যে এটা করতে পারবে তা তাদেরকে বোঝাতে হবে। '

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বিশ্বনবী (সা)’র রিসালাত লাভ প্রসঙ্গে বলেছেন, মানবজাতির ইতিহাসের এই মহান মিশনের লক্ষ্য হল মানুষকে মুক্তি দেয়া এবং তাদের আত্মা ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ, মার্জিত ও অলঙ্কৃত করার পাশাপাশি সব যুগের মানুষকে সব সংকট আর সমস্যা থেকে মুক্ত করা-যেসব সমস্যা ও সংকটের বেড়াজালে আজও ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষ। তিনি আরও বলেছেন,

‘মহানবীর রিসালাতের লক্ষ্য ছিল মানুষের মুক্তি সাধন। ইসলাম ও মহানবীর (সা) পক্ষ থেকে মানুষের জন্য রোগমুক্তির যে প্রেসক্রিপশন রয়ে গেছে তা সব যুগে মানুষকে মুক্ত করে অজ্ঞতা থেকে। এই নির্দেশিকা দিয়ে মোকাবেলা করা যায় জুলুম, বৈষম্য, দুর্বলের ওপর সবলের শোষণ এবং অন্য সব যন্ত্রণা যার শিকার মানবজাতি সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত হয়েছে ও হচ্ছে। এই নির্দেশিকা যদি বাস্তবে মেনে চলা হয় তাহলেই সুফল আসবে।'#

পার্সটুডে/মু আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২২

ট্যাগ

মন্তব্য