ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২০ ১৭:৪৭ Asia/Dhaka

আজ থেকে ৪১ বছর আগে এই দিনগুলোতে স্বৈরশাসক শাহের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শাহপুর বাখতিয়ার স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়ে ইরানের বিপ্লবী জনগণকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিল।

আয়াতুল্লাহ খোমেনির ঘোষিত অস্থায়ী সরকার গঠন করতে দেয়া হবে না বলে বাখতিয়ার হুমকি দেয়। ১৯৭৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি অস্থায়ী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ইমাম খোমেনি (র)।  বাখতিয়ারের ওই কথাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি ইরানি জনগণ। কারণ তখন ইরানের অবিসম্বাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন ইমাম খোমেনি। দেশজুড়ে ব্যাপক গণ-বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের ফলে অচল হয়ে পড়েছিল শাহের সরকার এবং সেনাবাহিনীতে দেখা দেয় ভাঙ্গন। সেনানিবাসগুলো থেকে নানা সেনা-ইউনিট দলে দলে বিপ্লবীদের কাতারে যোগ দিচ্ছিল এবং পদত্যাগ করছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতসহ জনকল্যাণ ও উন্নয়নের সব খাতগুলোকে যথাসম্ভব উন্নত করা এবং জনগণের জীবনমানের উন্নয়নসহ সার্বিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অনেকাংশেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী ইরান। আজ আমরা নানা ক্ষেত্রে শাহের শাসনামল ও বিপ্লব পরবর্তী ইরানের অগ্রগতির তুলনামূলক কিছু চিত্র বা পরিসংখ্যান তুলে ধরব ।

শিল্প খাতে  বর্তমানে বিশ্বে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান বিশ্বে ১৯তম। শাহের স্বৈরশাসনের যুগে এক্ষেত্রে  ইরানের অবস্থান ছিল ৬৪তম। সামরিক শক্তির দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বে ইরান ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। শাহের আমলে ইরান ছিল এক্ষেত্রে অনেক নিম্ন পর্যায়ে এবং সে যুগে ইরানের সামরিক শক্তি ছিল পুরোপুরি মার্কিন সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

চিকিৎসা খাতে বর্তমানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান ১০। অন্যদিকে শাহের আমলে এক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ছিল ৪৩তম। কৃষি খাতে বর্তমান ইরানের অবস্থান বিশ্বে দশম এবং এক্ষেত্রে শাহী যুগের ইরানের অবস্থান ছিল ৩০তম।  ক্রীড়া ক্ষেত্রে  বিশ্বে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান ১৩তম এবং শাহী আমলে এক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ছিল ৭০তম। এরোস্পেস বা সামরিক-বেসামরিক বিমান শিল্প, কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে বর্তমানে  ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম এবং এ ক্ষেত্রে শাহান শাহী ইরানের অবস্থান ছিল শূন্য।

বর্তমান ইরানে শিক্ষিতের হার ৯৭ শতাংশ। বিপ্লবের আগে তা ছিল ৭০ শতাংশেরও কম।

ন্যানো  প্রযুক্তি খাতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয় এবং শাহী ইরানের অবস্থান ছিল এক্ষেত্রে ০ ( শূন্য )। সাবমেরিন বা ডুবো জাহাজ শিল্পে বর্তমানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠ এবং এক্ষেত্রে শাহী ইরানের কোনো অবস্থানই ছিল না বরং সে সময় এ খাতে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল ছিল।

আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান দ্বিতীয় এবং শাহী ইরানের অবস্থান ছিল ৯৫তম স্থানে।

জ্ঞান উৎপাদন খাতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ এবং  এক্ষেত্রে শাহী ইরানের কোনো উল্লেখযোগ্য অবস্থানই ছিল না।

আট কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বর্তমান ইরানের ৭৪ শতাংশ মানুষ শহরে এবং ২৬ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। বর্তমানে শহরের মতো গ্রামের মানুষও সকল মৌলিক নাগরিক সুবিধাদি ভোগ করছে। স্বল্প আয়ের জনগণ কম খরচে ও ঋণসুবিধা পেয়ে বাড়ির মালিক হচ্ছে। বিপ্লবের পর পরই প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানি, স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল-ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করে তাৎক্ষণিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এখন ইরানের গ্রামের মানুষও স্বাস্থ্য বিমার অধিকারী।

৫ বছর আগে অর্থাৎ ফার্সি ১৩৯৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৫ হাজার, বিপ্লবের আগে ছিল ২২ হাজার ২৪৬টি। গত চার দশকে ডে-নাইট স্কুল ৯টি থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৮৭টি। শাহ সরকারের আমলে গ্রামে খেলার মাঠ ছিল মাত্র ১২টি, বর্তমানে ২ হাজার ১৮২টি। ইসলামী বিপ্লবের আগে গ্রামে পাকা রাস্তা ছিল মাত্র ২০০ কিলোমিটার, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার কিলোমিটার। আধাপাকা রাস্তা ছিল ৮ হাজার ২০০ কিলোমিটার আর এখন ১ লাখ ২৯ হাজার কিলোমিটার।

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের গ্রামাঞ্চলের জন্য কোনো ফায়ার সার্ভিস কেন্দ্র ছিল না, বর্তমানে ৩৮০টি গ্রামে ফায়ার সার্ভিস সেবা চালু আছে। সেসময় ইরানের ৩১২টি গ্রামে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে ইরানের ৫ হাজার ৩১২টি গ্রামের মানুষ টেলিফোন ব্যবহার করে। দেশটিতে গত ৪০ বছরে ৩৩ হাজার ৫০০ পল্লী উন্নয়ন পরিষদ গড়ে তোলা হয়েছে। রেজা শাহ’র আমলে ইরানের পল্লী অঞ্চলের জন্য চিকিৎসক ছিলেন ১ হাজার ৩৮২ জন, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৩৫৩ জন। এভাবে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ইরানের গ্রামীণ জীবনে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে।  

ইরানের নারী সমাজও ইসলামী বিপ্লবের পর অনেক অগ্রসর ও উন্নত অবস্থায় পৌঁছেছে। ইরানের নারী সমাজে এখন উচ্চ শিক্ষিতের সংখ্যা ব্যাপক এবং তাদের কেউ কেউ ভাইস প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রদূত ও মন্ত্রী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ইরানের নারীরা এখন সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং ইরানের নারী পাইলটও রয়েছে একাধিক।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/০৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য