জানুয়ারি ১১, ২০২২ ২০:১০ Asia/Dhaka
  • ইসরাইল ও আমেরিকার ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন শহীদ সোলাইমানি

আমেরিকা ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারিতে বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে সন্ত্রাসী মার্কিন সেনাদের ড্রোন হামলায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি'র কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানি শহীদ হন।

এ ছাড়া, বর্বরোচিত ওই হামলায় বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে আসা ইরাকের জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হাশদ আশ শাবির সেকেন্ড ইন কমান্ড আবু মাহদি আল মুহানদিসসহ আরো আট ব্যক্তি নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ইরাক সরকারের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সেদেশ সফরে গিয়েছিলেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগন তখন জানিয়েছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। অথচ জেনারেল সোলাইমানি পশ্চিম এশিয়ায় উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ বা আইএস জঙ্গিদের মোকাবেলায় অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।

ইরানের শত্রুরা এটা দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিজেদের অশুভ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা যে কোনো অপরাধ করতে প্রস্তুত রয়েছে। এমনকি আমেরিকা, ইসরাইল ও সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট সন্ত্রাসীদের দমনে যিনি অনেক বড় অবদান রেখেছেন অর্থাৎ জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করতেও তারা দ্বিধা করেনি। ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি এবং বলদর্পী শক্তির মোকাবেলায় ইরানের প্রতিরোধ শক্তিকে দুর্বল করার মার্কিন চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের নিরাপত্তাকে টার্গেট করেছে আমেরিকা।

ইরানের শহীদ সোলাইমানি ও ইরাকের শহীদ আবু আল মুহান্দেস পশ্চিম এশিয়া জুড়ে দায়েশ বা আইএস জঙ্গিদের দমনে যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এমনকি এ অঞ্চলের দেশগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার জন্য ইসরাইল-মার্কিন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতেও তারা সক্ষম হন। আমেরিকার প্রধান উদ্দেশ্য এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোকে দুর্বল করা, প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করা এবং অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক আল-বানা পত্রিকার সম্পাদক নাসের কান্দিল জেনারেল সোলাইমানির অসামান্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, আমরা যখন লেবানন, ফিলিস্তিন, সিরিয়াসহ অন্যান্য এলাকায় আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ সোলাইমানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলি তখন আমরা এক কথা স্বীকার করতে বাধ্য যে তিনি আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিরাট বিজয় লাভ করেছিলেন। আমেরিকান গ্রুপ অব দ্যা ইউনাইটেড ন্যাশনাল এন্টি ওয়ার কোয়ালিশনের সদস্য জুলু মোবারদো এ ব্যাপারে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দায়েশ বা আইএস জঙ্গিদের পতনের ফলে সমগ্র এ অঞ্চলে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে যা কিনা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য বিরাট ব্যর্থতা ও চপেটাঘাত। 

শহীদ সোলাইমানির এ আত্মত্যাগকে কয়েকটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়। আমেরিকা, ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং এ অঞ্চলে তাদের আরব মিত্ররা তাদের অশুভ লক্ষ্য অর্জনের জন্য জেনারেল সোলাইমানিকে সবচেয়ে বড় বাধা ও বিপদজনক বলে মনে করতো। আমেরিকা ভেবেছিল সোলাইমানিকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে তাদের সামনের বড় একটা বাধা দূর হবে। কিন্তু তাদের সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেননা সোলাইমানি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দখলদার ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছিলেন এবং এই প্রতিরোধ শক্তি আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হওয়ায় ইসরাইল ও তার মিত্রদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

শহীদ সোলাইমানি মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে নিরাপত্তা, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে বিভিন্ন ফ্রন্টে আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখায় প্রতিরোধ শক্তিগুলোর প্রেরণায় পরিণত হয়েছিলেন।

মার্কিন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্টিফেন ল্যান্ডম্যান জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার মার্কিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, 'আমেরিকা, ইসরাইল ও ন্যাটো জোট সমর্থিত উগ্র জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নির্মূলে ভূমিকা রাখার কারণেই সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কখনোই পরিবর্তন আসবে না। কেননা তাদের প্রধান উদ্দেশ্য এ অঞ্চলের দেশগুলোকে দুর্বল করা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে তা বন্টন করা'।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক স্টিফেন ল্যান্ডম্যান মানবাধিকার লঙ্ঘনে মার্কিন ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আরো বলেছেন, 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ দীর্ঘ সময়ে মার্কিন সরকার বহু সফল ও ব্যর্থ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। যারাই আমেরিকার আধিপত্যবাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে তাদেরকেই হত্যা করা হয়'। তিনি বলেন, জেনারেল সোলাইমানি মার্কিন সমর্থিত আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়। অথচ তিনি মার্কিন নিরাপত্তার জন্য কখনো হুমকি ছিলেন না।

নিঃসন্দেহে বলা যায়, জেনারেল সোলাইমানির অসামান্য সামরিক কৌশল, তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টি ও সাহসিকতার কারণেই ইরাক, সিরিয়াসহ সমগ্র এ অঞ্চলে যুদ্ধের ময়দানে দায়েশ বা আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তিনি বিজয়ী হতে পেরেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড ইয়াকুবিয়ান বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করছে সেদেশের নব্য রক্ষণশীলরা এবং ইহুদিবাদীরা আর এরাই ছিল সোলাইমানিকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী'।

ইরাকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিজয়ে হাশদ আশ শাবির উপপ্রধান শহীদ আবু মাহদি আল মোহান্দেসও জেনারেল সোলাইমানিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে গেছেন। তাই আবু মাহদির ওপরও আমেরিকার ক্ষোভ ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকেও শহীদ করা হয়। দায়েশ বা আইএস জঙ্গি গোষ্ঠী তৈরিতে আমেরিকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের সব মুসলিম দেশগুলোতে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাতে এ অঞ্চলে ইসরাইল ও আমেরিকার আধিপত্য আরো পাকাপোক্ত করা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদেরকে লেলিয়ে দেয়ার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ সংগঠনগুলোকে দুর্বল করা।  

গাজায় ৩৩ দিনের যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিজয় এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের হিজবুল্লাহর বিজেয়র পর আমেরিকা ও ইসরাইল খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। এরপর থেকে তারা ইরানের নেতৃত্বে প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় এবং এরই অংশ হিসেবে আইএস জঙ্গিদেরকে তারা মাঠে নামায়। কিন্তু জেনারেল সোলাইমানির কারণে তাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কেননা সোলাইমানি এ অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তিগুলোর হাতকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখেন।

আমেরিকা ও ইসরাইল ভেবেছিল সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে এ অঞ্চলের ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে দুর্বল করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কেননা শহীদ সোলাইমানির রক্তের ওপর দাঁড়িয়েছে প্রতিরোধ শক্তিগুলোর আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে।#

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/১১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

 

ট্যাগ