অক্টোবর ১৬, ২০২২ ১৮:০৮ Asia/Dhaka
  • 'সর্বোত্তম আদর্শ বিশ্বনবী (সা) ও  তাঁরই নূরের এক অনন্য নক্ষত্রের জন্ম-বার্ষিকী'

ত্রিভুবনের জ্ঞানের আলো, দরিদ্র, বঞ্চিত ও অসহায়দের সহায়, পাপী উম্মতের শাফায়াতকারী, সাধকদের সূর্য, সব নবীদের সর্দার, সাম্য আর ন্যায়বিচারের প্রধান দূত, ব্যথিত মানবের ধ্যানের ছবি ও বিশ্ব-জগতের জন্য মহান আল্লাহর রহমত এবং সর্বশেষ রাসুল বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা)'র অজস্র যোগ্যতা, গুণ, অবদান আর মহত্ত্বের যথাযোগ্য বর্ণনা করার সাধ্য নেই বিশ্বের কোনো মানুষের।

একমাত্র মহান আল্লাহই তাঁর প্রিয়তম হাবিব ও শ্রেষ্ঠতম নুরের যথাযথ পরিচিতি তুলে ধরতে সক্ষম। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে সৃষ্টি না করলে বিশ্ব-জগতের সৃষ্টি হত অর্থহীন।

বিজ্ঞ আলেম সমাজ ও ঐতিহাসিকদের অনেকেই বিশেষ করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী মুসলিম চিন্তাবিদদের বেশিরভাগই মনে করেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) জন্ম নিয়েছিলেন রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে এবং তাঁর ওফাত বা মৃত্যু-দিবসও একই দিনে।

অন্যদিকে মহানবীর আহলে বাইতের অনুরাগী শিয়া মুসলিম সমাজের বেশিরভাগই মনে করেন বিশ্বনবী (সা) জন্ম নিয়েছিলেন ১৭ রবিউল আউয়াল এবং তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন সফর মাসের ২৮ তারিখে। মুসলমানদের এই দুই ধারার মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনি ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়ালকে ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে ঘোষণা করেন।

বিশ্বনবী (সা.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। তাঁর শুভ জন্মদিন তাই মানব জাতির জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন এবং এই দিন মুসলমানদের মিলন ও ঐক্যের সবচেয়ে বড় শুভ-লগ্ন। এই মহাখুশির দিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি অশেষ মুবারকবাদ, মহান আল্লাহর প্রতি জানাচ্ছি অশেষ শুকরিয়া এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম। আজ  তথা ১৭ রবিউল আউয়াল বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.)'রও শুভ জন্মদিন। তাই এ উপলক্ষেও সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ এবং এই মহান ইমামের উদ্দেশে পেশ করছি অসংখ্য দরুদ ও সালাম। 

শত শতাব্দী যুগযুগান্ত বহিয়া যায়

ফিরে নাহি-আসা স্রোতের প্রায়

চলে গেল ‘হাওয়া’, ‘আদম’, ‘শিশ্’ ও ‘নূহ’ নবি –

জ্বলিয়া নিভিল কত রবি!

চলে গেল ‘ইশা’, ‘মুসা’ ও ‘দাউদ’, ইব্রাহিম’

ফিরদৌসের দূর সাকিম।

গেল ‘সুলেমান’, গেল ‘ইউনুস’, গেল ‘ইউসুফ’ রূপকুমার

হাসিয়া জীবন-নদীর পার।

গেল ‘ইসাহাক’, ‘ইয়াকুব’, গেল ‘জবীহুল্লাহ্‌ ইসমাইল’

খোদার আদেশ করি হাসিল।

এসেছিল যারা খোদার বাণীর দধিয়াল তুতী পাপিয়া পিক

বুলবুল শ্যামা ; ভরিয়া দিক

যাদের কন্ঠে উঠিয়াছিল গো মহান বিভুর মহিমা গান

উড়ে গেল তারা দূর বিমান!

ঊর্ধ্বে জাগিয়া রহিলেন ‘ইশা’ অমর, মর্ত্যে ‘খাজাখিজির’

- দুই ধ্রুবতারা দুই সে তীর -

ঘোষিতে যেন গো এপারে-ওপারে তাহারই আসার খোশখবর-

যাহার আশায় এ-চরাচর

আছে তপস্যারত চিরদিন; ঘুরিছে পৃথিবী যার আশে

সৌরলোকের চারিপাশে।

আদিম-ললাটে ভাতিল যে আলো উষায় পুরব-গগন-প্রায়

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

আলোক, আঁধার, জীবন, মৃত্যু, গ্রহ, তারা তারে খুঁজিছে হায়

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

খুঁজিছে দৈত্য, দানব, দেবতা, ‘জিন’ পরি, হুর পাগলপ্রায়

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

খোঁজে অপ্সর, কিন্নর, খোঁজে গন্ধর্ব ও ফেরেশতায়

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

খুঁজিছে রক্ষ যক্ষ পাতালে, খোঁজে মুনি ঋষি ধেয়ানে তায়

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

আপনার মাঝে খোঁজে ধরা তারে সাগরে, কাননে মরু-সীমায়,

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

খুঁজিছে তাহারে সুখে, আনন্দে, নব সৃষ্টির ঘন ব্যথায়,

কোথায় ওগো সে আলো কোথায়!

উৎপীড়িতেরা নয়নের জলে নয়ন-কমল ভাসায়ে চায়,

কোথায় মুক্তি-দাতা কোথায়!

শৃঙ্খলিত ও চির-দাস খোঁজে বন্ধ অন্ধকার কারায়

বন্ধ-ছেদন নবি কোথায়!

নিপীড়িত মূক নিখিল খুঁজিছে তাহার অসীম স্তব্ধতায়,

বজ্র-ঘোষ বাণী কোথায়!

শাস্ত্র-আচার-জগদল-শিলা বক্ষে নিশাস রুদ্ধপ্রায়

খোঁজে প্রাণ, বিদ্রোহী কোথায়!

খুঁজিছে দুখের মৃণালে রক্ত-শতদল শত ক্ষত ব্যথায়,

কমল-বিহারী তুমি কোথায়!

আদি ও অন্ত যুগযুগান্ত দাঁড়ায়ে তোমার প্রতীক্ষায়,

চিরসুন্দর, তুমি কোথায়!

বিশ্ব-প্রণব-ওংকার-ধ্বনি অবিশ্রান্ত গাহিয়া যায় –

তুমি কোথায়, তুমি কোথায়!

জাহেলিয়াতের কালো মেঘ সারা বিশ্বের ওপর যখন ছায়া মেলে রেখেছিল এবং অসৎ ও ঘৃণ্য কার্যকলাপ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিগ্রহ, লুটতরাজ ও সন্তান হত্যাসহ সব ধরনের নৈতিক গুণ যখন বিলুপ্ত হচ্ছিল তখনই মানব জাতির শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য-রবির উদয় হয়।

মহানবীর জন্মগ্রহণের মুহূর্তে সম্রাট খসরুর প্রাসাদের দ্বার-মণ্ডপ ফেটে গিয়েছিল এবং এর কয়েকটি স্তম্ভ ধসে পড়েছিল। ফার্স প্রদেশের অগ্নি উপাসনালয়ের প্রজ্বলিত আগুন নিভে গিয়েছিল। ইরানের সাভেহ্ হ্রদ শুকিয়ে গিয়েছিল। পবিত্র মক্কার প্রতিমালয়গুলোতে রক্ষিত মূর্তি ও প্রতিমাগুলো মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। তাঁর দেহ থেকে নূর বের হয়ে তা আকাশের দিকে উত্থিত হয়েছিল যার রশ্মি মাইলের পর মাইল পথ আলোকিত করেছিল। সম্রাট আনুশিরওয়ান ও পুরোহিতরা অতি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ সব ঘটনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল ঐ সব মানুষের অন্তরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়া ও মনোযোগ সৃষ্টি করা যারা মূর্তিপূজা, অন্যায় ও জুলুমের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল।-

মহানবী (সা.) খতনাকৃত ও নাভি-কর্তিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহ্ মহান, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।” মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন: “হে আরব জাতি! ইসলাম ধর্মে তোমাদের দীক্ষিত ও বিশ্বাস স্থাপনের পূর্বে তোমরা জাহান্নামের আগুনের কাছে ছিলে। এরপর মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১০৩) 

ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের আগে আরব জাতির অবস্থা  প্রসঙ্গে হযরত আলী (আ) একটি ভাষণে বলেছেন :  “মহান আল্লাহ্ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিশ্বাসীদের ভয় প্রদর্শনকারী ঐশী প্রত্যাদেশ ও গ্রন্থের (আল কোরআন) বিশ্বস্ত আমানতদার হিসাবে প্রেরণ করেছেন। হে আরবরা! তখন তোমরা নিকৃষ্ট ধর্ম পালন ও নিকৃষ্টতম স্থানগুলোয় বসবাস করতে। তোমরা প্রস্তরময় স্থান এবং বধির তথা মারাত্মক বিষধরসর্পকুলের মাঝে জীবনযাপন করতে (সেগুলো এমন বিষধর সাপ ছিল যা যে কোন প্রকার শব্দে পালিয়ে যেত না), তোমরা নোংরা লবণাক্ত-কর্দমাক্ত পানি পান করতে, কঠিন খাদ্য (খেজুর বীজের আটা এবং গুঁইসাপ) খেতে, একে অপরের রক্ত ঝরাতে এবং নিজ আত্মীয়-স্বজনদের থেকে দূরে থাকতে। তোমাদের মধ্যে মূর্তি ও প্রতিমাপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। তোমরা কুকর্ম ও পাপ থেকে বিরত থাকতে না।”-হযরত আলী (আ.) আরব জাতি ও গোত্রসমূহের ধর্মীয় অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে আরও বলেছেন :

 “তখন (অন্ধকার যুগে) আরব জাতি নানা ধর্মের অনুসারী ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিদআত তথা ধর্ম বহির্ভূত প্রথা প্রচলিত ছিল এবং তারা অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। একদল লোক মহান আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করত । আবার কোনো কোনো ব্যক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সত্তার দিকে ইশারা-ইঙ্গিত করত; অতঃপর এদের সবাইকে আল্লাহ্ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সৎ পথের সন্ধান দিলেন,সৎ পথে পরিচালনা করলেন এবং তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দিলেন।”

আরবের চিন্তাশীল শ্রেণীও গ্রহ আর চাঁদের উপাসনা করত। কিন্তু নিম্নশ্রেণীর লোক যারা আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল তারা তাদের গোত্রীয় ও পারিবারিক প্রতিমা ছাড়াও বছরের দিবসগুলোর সংখ্যা অনুসারে ৩৬০টি মূর্তির পূজা করত এবং প্রতিদিনের ঘটনাগুলোকে ঐ ৩৬০টি মূর্তির যে কোন একটির সাথে জড়িত বলে বিশ্বাস করত।-

আরব সমাজে নারীদেরকে পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো। তারা সব ধরনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার, এমনকি উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। প্রধানত দুর্ভিক্ষের ভয়ে এবং কখনো কখনো কলুষতা ও অশুচিতার ভয়ে আরবরা মেয়েদেরকে জন্মগ্রহণের পর পরই হত্যা করত।   পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : যখন তাদের কোন এক ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণের সুসংবাদ দেয়া হতো তখন তার বর্ণ কালো হয়ে যেত এবং বাহ্যত সে যেন তার ক্রোধকে চাপা দিত। আর এই জঘন্য সংবাদ শোনার কারণে সে লজ্জায় তার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াত। আর সে জানত না যে, সে কি অপমান ও লাঞ্ছনা সহকারে তার এ নবজাতক কন্যাসন্তান প্রতিপালন করবে, নাকি তাকে মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে ফেলবে? সত্যিই তাদের ফয়সালা কতই না জঘন্য!”

বিশ্বনবী (সা) তাঁর শ্রেষ্ঠ চরিত্র ও রিসালাতের আহ্বানের মাধ্যমে বর্বর আরব জাতির মধ্যে আনেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যে আরবরা কথায় কথায় সামান্য মতপার্থক্য নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত সেই আরবরাই মুসলমান হওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে জখম হয়ে চরম পিপাসায় যখন মৃত্যুর সম্মুখীন হত তখন কেউ তাদের পানি দিতে চাইলে সে বলত: আমার অমুক আহত ভাই সম্ভবত আরো বেশি তৃষ্ণার্ত, তাকে আগে দিন! অন্য আহত আরব মুসলমানও বলতেন একই কথা! মহানবীর (সা) নেতৃত্বে ইসলাম নারী জাতিকে দিয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ হিসেবে নারী ও পুরুষের মর্যাদা সমান। মহানবী-সা. বলেছেন, মায়ের পায়ের নীচে রয়েছে সন্তানের বেহেশত। এ ছাড়াও তিনি সন্তানের ওপর পিতার অধিকারের চেয়ে মায়ের অধিকার যে অনেক গুণ বেশি তাও উল্লেখ করেছেন। 

-বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ধর্মান্ধতা, শোষণ, বঞ্চনা, কুসংস্কার, যৌন জীবনে নৈতিক অবক্ষয়, নীতিহীন রাজনীতি ও সব ধরনের অন্যায় দূর করতে হলে পশ্চিমা আদর্শের পরিবর্তে মানব-জাতিকে আশ্রয় নিতে হবে নবী-মুহাম্মাদের আদর্শের ছায়াতলে। প্রকৃত সাম্য,  গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, নৈতিকতা, মানবাধিকার, পরমত-সহিষ্ণুতা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিসহ আধ্যাত্মিক উন্নতি ও সংযম –এ সবই অর্জন করা সম্ভব মহানবীর জীবনাদর্শের অনুসরণে। মহানবীর ধর্ম ইসলাম জীবনের সবক্ষেত্রে- ইহকাল ও পরকালে মুক্তির গ্যারান্টি। -

আল্লাহ কে যে পাইতে চায় হযরত কে ভালবেসে–
আরশ কুর্সী লওহ কালাম না চাইতেই পেয়েছে সে।।
রসুল নামের রশি ধ’রে
যেতে হবে খোদার ঘরে,
নদী-তরঙ্গে যে পড়েছে, ভাই
দরিয়াতে সে আপনি মেশে।।
তর্ক করে দুঃখ ছাড়া কী পেয়েছিস অবিশ্বাসী,
কী পাওয়া যায় দেখনা বারেক হযরতে মোর ভালবাসি?
এই দুনিয়ায় দিবা- রাতি
ঈদ হবে তোর নিত্য সাথী;
তুই যা চাস তাই পাবি হেথায়,
আহমদ চান যদি হেসে।।

Image Caption

 

এবার আমরা কথা বলব বিশ্বনবী (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আ) সম্পর্কে। ইমাম জাফর আস সাদিক ৮৩ হিজরির ১৭ ই রবিউল আউয়াল মদীনায় ভূমিষ্ঠ হন। ৩৪ বছর ধরে মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব দেয়ার পর ১৪৭ হিজরির ২৫ শে শাওয়াল শাহাদত বরণ করেন। আব্বাসিয় শাসক মনসুর দাওয়ানিকি বিষ প্রয়োগ করে এই মহান ইমামকে শহীদ করে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) যে অভাবনীয় ও অতুল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তা ছিল নবুওতী জ্ঞানেরই উত্তরাধিকার। তিনি বলতেন, আমার বক্তব্য আমার পিতা তথা ইমাম বাকের (আঃ)'র বক্তব্য, আমার পিতার বক্তব্য আমার দাদা তথা ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ)'র বক্তব্য, আমার দাদার বক্তব্য হচ্ছে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)'র বক্তব্য এবং তাঁর বক্তব্য হচ্ছে রাসূল (সাঃ)'রই বক্তব্য, আর রাসূলে খোদা (সাঃ)'র বক্তব্য হচ্ছে মহান আল্লাহরই বক্তব্য।

 ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেছিলেন, আমাদের তথা রাসূল (সাঃ)'র আহলে বাইতের কাছে রয়েছে ভবিষ্যতের জ্ঞান, অতীতের জ্ঞান, অন্তরে অনুপ্রাণিত বা সঞ্চারিত জ্ঞান, ফেরেশতাদের বাণী যা আমরা শুনতে পাই, আমাদের কাছে রয়েছে রাসূল (সাঃ)'র অস্ত্রসমূহ এবং আহলে বাইতের সদস্য ইমাম মাহদী (আঃ)'র কাছে না পৌঁছা পর্যন্ত সেগুলো আমাদের হাতছাড়া হবে না। আমাদের কাছে রয়েছে হযরত মূসা (আঃ)'র তৌরাত, হযরত ঈসা (আঃ)'র ইঞ্জিল, হযরত দাউদ (আঃ)'র যাবুর এবং মহান আল্লাহর পাঠানো অন্যান্য আসমানি কেতাব।

এ ছাড়াও আমাদের কাছে রয়েছে হযরত ফাতেমা (সঃ)'র সহিফা যাতে রয়েছে সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনার বিবরণ এবং পৃথিবীর শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত সমস্ত শাসকের নাম তাতে লেখা আছে। আমাদের কাছে রয়েছে আল জামী নামের দলীল, সত্তুর গজ দীর্ঘ ঐ দলীলে লেখা রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)'র নিজ মুখের উচ্চারিত ও নির্দেশিত বাণী এবং ঐসব বাণী আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) নিজ হাতে লিখেছিলেন। আল্লাহর শপথ! এতে রয়েছে মানুষের জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সবকিছু।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যরা সব সময়ই অন্য যে কোনো ব্যক্তিত্ব বা শাসকদের চেয়ে মানুষের বেশী শ্রদ্ধা ও গভীর ভালবাসার পাত্র ছিলেন। আর এ জন্যে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীন শাসকরা এই মহাপুরুষগণকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন এবং ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। আব্বাসীয় খলিফা আল মানসুর ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) 'র ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও প্রভাব প্রতিপত্তি দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারই নির্দেশে ১৪৮ হিজরির ২৫ শে শাওয়াল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে শহীদ করা হয় নবী বংশ তথা আহলে বাইতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম জাফর সাদেক (আঃ)কে। কিন্তু বস্তুবাদী শাসক-চক্রের অন্ধ স্বার্থপরতার সীমানা পেরিয়ে অন্য অনেক মহান ইমামের মতোই ধার্মিক মানুষের অন্তরের রাজ্যে আজো ক্ষমতাসীন হয়ে আছেন হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)।

ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)মুসলমানদের সব মাজহাবের কাছেই বরেণ্য ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তাঁর আদর্শ হতে পারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সূত্র। চারজন সুন্নি ইমামের মধ্যে একজন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র এবং আরো দুই জন সুন্নি ইমাম তাঁর পরোক্ষ ছাত্র ছিলেন।

মালিকি মাজহাবের ইমাম মালিক বিন আনাস ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! মানুষের কোনো চোখ সংযম সাধনা, জ্ঞান, ফজিলত ও ইবাদতের ক্ষেত্রে জা’ফর ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে বড় কাউকে দেখেনি, কোনো কান এসব ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বড় কারো কথা শুনেনি এবং কোনো হৃদয়ও তা কল্পনা করেনি।

আহলে সুন্নাতের হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা বলেছেন, "আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ থেকে বড় কোন জ্ঞানী বা ফকিহকে দেখিনি। সবচেয়ে জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়গুলো সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন। আর জাফর ইবনে মুহাম্মাদ হলেন সেই জ্ঞানের অধিকারী। অতীত যুগে আরবি ভাষায় ফিক্‌হ বা ফিকাহ বলতে সব ধরনের জ্ঞানকে বোঝানো হত।

ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র একটি অমূল্য বাণী শুনিয়ে শেষ করব আজকের আলোচনা। তিনি বলেছেন,

যারা নামাজকে গুরুত্বহীন মনে করবে আমাদের তথা বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের শাফায়াত তাদের ভাগ্যে জুটবে না।

আজকের এই মহাখুশির দিন উপলক্ষে আবারও সবাইকে জানাচ্ছি অশেষ মুবারকবাদ, এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/

 

 

ট্যাগ