এপ্রিল ২৩, ২০২১ ১৩:১৮ Asia/Dhaka
  • আমাকে খাদিজার চেয়ে কোনো উত্তম স্ত্রী দান করেননি আল্লাহ: বিশ্বনবী (সা.)

আজ হতে ১৪৪৫ বছর আগে এই দিনে (১০ই রমজান, হিজরতের তিন বছর আগে) ইন্তিকাল করেছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র প্রথম স্ত্রী উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজা (সালামুল্লাহি আলাইহা)। মানবজাতির মধ্যে চার শ্রেষ্ঠ নারীর মধ্যে অন্যতম হলেন এই মহীয়সী নারী।

অন্য তিনজন হলেন নিজ কন্যা হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.) যিনি সব যুগের নারী জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ, হযরত মরিয়ম (সা.), ফেরাউনের স্ত্রী তথা মুসা (আ.)'র মাতৃতুল্য লালনকারী হযরত আসিয়া (সা.)।

“ ...নর নহে,নারী ইসলাম 'পরে প্রথম আনে ঈমান. আম্মা খাদিজা জগতে সর্ব প্রথম মুসলমান। পুরুষের সব গৌরব ম্লান এক এই মহিমায়।” (নজরুল)

উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজা (সা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলমান। (যদিও পুরুষদের মধ্যে প্রায় একই সময়ে আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী-আ. ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন বলে তাঁকেও প্রথম মুসলমান ধরা হয়।) বিশ্বনবী (সা.)'র  পেছনে সর্বপ্রথম যে দুই জন জামায়াতে নামাজ আদায় করেছেন তারা হলেন উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজা (সা.)ও বালক আলী(আ.)। খাদিজা (সা.) মহান আল্লাহর এতটা নৈকট্য লাভ করেছিলেন যে যখন হযরত জিবরাইল (আ.) ওহী নিয়ে বিশ্বনবী (সা.)'র কাছে নাজেল হতেন তখন তিনি প্রথমে মহান আল্লাহর সালাম পৌঁছে দিতেন এই মহীয়সী নারীর কাছে।   

মহানবী (সা.)'র সঙ্গে বিবাহিত জীবনের ২৫ বছর কাটিয়েছেন মহীয়সী নারী হযরত খাদিজা(সা.)। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন বিশ্বনবী (সা.) অন্য কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি।

রাসূল (সা.)-কে বিয়ের আগেও হযরত খাদিজা(সা.) ছিলেন একত্ববাদী ও হযরত ইব্রাহিম (আ.)'র ধর্মের অনুসারী এবং আরব জাতির মধ্যে সবচেয়ে ধনী মহিলা। হাজার হাজার উট তাঁর মালিকানাধীন বাণিজ্য-সম্ভার দেশ থেকে দেশে বহন করত বলে ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.)'র সঙ্গে বিয়ের সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর (এ সময় তাঁর বয়স আরো কম ছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন)। বিশ্বনবী (সা.)'র সঙ্গে বিয়ের ১৫ বছর পর যখন মহান আল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর স্বামীকে নবুওত দান করেন তখন থেকেই উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজা (সা.) নিজের সব সম্পদ বিশ্বজনীন ধর্ম ইসলামের প্রচার-প্রসার ও নও-মুসলিমদের ভরণ-পোষণের কাজে ব্যয় করতে থাকেন এবং ইসলামের পেছনেই ব্যয় হয়ে যায় তাঁর সমস্ত সম্পদ। ফলে তাঁর ইন্তিকালের পর ইয়াতিম কন্যা ফাতিমা (সা.) একটি মুদ্রা পরিমাণ সম্পদও উত্তরাধিকারসূত্রে (মায়ের কাছ থেকে) লাভ করেননি।

ইসলামের শৈশবে এর শত্রু কাফির-মুশরিকরা যখন মুসলমানদের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ করে তখন শো'বে আবু তালিব উপত্যকায় দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে হয়েছিল উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজা (সা.)-কে। 

ইসলাম প্রচারের প্রথম দিনগুলোতে যখন রাসূল (সা.)-কে নানাভাবে অপমান ও ঠাট্টা-বিদ্রূপের শিকার হতে হত এবং  তাঁর মাথায় ছাই বা পশুর নাড়ীভুঁড়ি চাপানো থেকে শুরু করে দাঁত-মুবারক পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলেছিল শত্রুরা তখন সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী হিসেবে পাশে ছিলেন জীবন-সঙ্গী উম্মুল মু'মিনিন হযরত খাদিজা (সা.)।

উম্মুল মু'মিনিন খাদিজা (সা.)'র পবিত্র স্মৃতি স্মরণে আসলে প্রায়ই বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র দু চোখ বেয়ে ঝরে পড়ত অশ্রুধারা। অন্য কোনো স্ত্রীই হযরত খাদিজা (সা.)'র সমকক্ষ নন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। বিশ্বনবী (সা.) খাদিজা (সা.) বান্ধবীদেরকেও শ্রদ্ধা করতেন।  মক্কায় ফিরে আসার সুযোগ লাভের পর মহানবী (সা) সর্বপ্রথম হযরত খাদিজার পবিত্র কবর জিয়ারত করেন ও সেখানে তাঁবু খাটিয়ে থাকেন।  

একবার বিশ্বনবী (সা.)’র কোনো এক স্ত্রী নিজেকে হযরত খাদিজা (সা.)’র চেয়ে উত্তম বলে দাবি করলে আল্লাহর রাসূল তাকে তিরস্কার করে বলেন: ‘আল্লাহর কসম, মহান আল্লাহ আমাকে তাঁর চেয়ে কোনো উত্তম স্ত্রী দান করেননি। তিনি আমার প্রতি তখনই ঈমান এনেছিলেন যখন অন্যরা আমাকে বিদ্রূপ করত, তিনি আমাকে তখনই  স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যখন অন্যরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি তার সম্পদ ব্যয় করেছেন আমার জন্য এবং তাঁর মাধ্যমেই আমি সেইসব সন্তানের অধিকারী হয়েছি যা অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে আমার জন্য নির্ধারিত হয়নি। (বুখারি শরিফ)  

বলা হয়ে থাকে বিশ্বনবী (সা.)'র চারিত্রিক সুষমা ও মহানুভবতা, আলী (আ.)'র তরবারি এবং খাদিজা (সা.)'র অঢেল সম্পদ ছাড়া ইসলাম কখনও এতটা বিকশিত হতে পারত না।

যে বছর হযরত খাদিজা (সা.) ইন্তিকাল করেন সেই বছর ইন্তিকাল করেন রাসূল (সা.)'র প্রিয় চাচা ও অভিভাবক হযরত আবু তালিব(রা.)। তাই এ বছরটিকে ইসলামের ইতিহাসে 'আমুল হোজন' বা দুঃখের বছর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

মহানবী (সা) ইয়াতিম অবস্থায় দুনিয়ায় এসেছিলেন। প্রায় ৫ বছর বয়সে মাকেও হারান। ফলে তাঁকে লালন-পালনে আরও বেশি মনোযোগী হন হযরত ইব্রাহিমের একত্ববাদী ধর্মে বিশ্বাসী  দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু দাদাও বিদায় নেন কিছুকাল পর। বিদায়ের আগে প্রিয় নাতীর জন্য নিজেই সন্তানদের মধ্য হতে ঠিক করেন নতুন অভিভাবক আবু তালিবকে। তিনিও ছিলেন ইব্রাহিমের একত্ববাদী ধর্মে বিশ্বাসী এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। চাচা আবুতালিব মহানবীর সুরক্ষায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কার কুরাইশ বংশে ও বিশেষ করে হাশিমি গোত্রের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ইব্রাহিমের একত্ববাদী ধর্মে বিশ্বাসী। এদেরকে বলা হত হানিফ।

এমনই এক হানিফ পরিবারের সতী-সাধ্বী খোদাভীরু মেয়ে ছিলেন হযরত খাদিজা। হযরত খাদিজা ব্যবসা-সূত্রে প্রবাদতুল্য বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। তাঁকে বলা হত আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী নারী। খাদিজার বাণিজ্য-কাফেলার ম্যানেজার বা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হয়েছিলেন মহানবী (সা) নবুওত লাভের আগে। এ সময়ে তার অনন্য সততা, আমানতদারী ও ব্যবসায়িক দক্ষতা আর সাফল্য দেখে মুগ্ধ হন বিবি খাদিজা। ফলে দাসীর মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান যুবক মুহাম্মদের কাছে। এমন এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব পাবেন দরিদ্র ও ইয়াতিম যুবক মুহাম্মাদ! হয়ত ভাবতেও পারেননি তাঁর অভিভাবক আবুতালিব!

হযরত আবু তালিব (রা) তাঁর প্রিয় ভাতিজার বিয়ের সময় বলেছিলেন: “সব প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে করেছেন ইব্রাহিমের বংশধর, ইসমাইলের বংশ হিসেবে, মা’দের বংশধর ও মুদারের সত্তা বা বংশ হিসেবে, যিনি (আল্লাহ) আমাদের করেছেন তার ঘরের (কাবা শরিফ) মুতাওয়াল্লি বা দেখাশোনাকারী অভিভাবক এবং পবিত্র চত্বর বা আঙ্গিনাগুলোর খাদেম, যিনি আমাদের জন্য তৈরি করেছেন একটি ঘর যা চাওয়া হয় হজের জন্য ও তা হল নিরাপত্তার এক পবিত্র ঘর এবং তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন জনগণের ওপর কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব। আমার এই ভাতিজা মুহাম্মাদ একজন অতুলনীয় ব্যক্তি!: আপনারা যদি অন্যদের সম্পদের সঙ্গে তাঁর সম্পদের তুলনা করেন তাহলে তাঁকে সম্পদের অধিকারী হিসেবে পাবেন না, কারণ সম্পদ হচ্ছে ধ্বংসশীল ছায়া ও তুচ্ছ বস্তু মাত্র ....  সে খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজার পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছে।” (সূত্র: ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের লেখা বই আসসিরাত আন নাবাবিয়া)

লক্ষ্য করুন! আবু তালিব বিশ্ব জগতের স্রস্টা এক আল্লাহর প্রশংসা করলেন ভাতিজা তথা আল্লাহর শেষ নবীর বিয়ের অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করার ভাষণে! হযরত ইব্রাহিমের বংশধর হিসেবে তিনি গৌরব অনুভব করলেন! ইব্রাহিমের পুত্র ইসমাইলের বংশধর হিসেবে ও সেই সূত্রে কাবা ঘরের অভিভাবক হিসেবে তিনি ও তার গোত্র যে আরবের অন্য গোত্রগুলোর ওপর কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বের অধিকারী সেটাও উল্লেখ করলেন।  মহানবীর বয়স তখনও ২৫ বছর মাত্র এবং তিনি তখনও ইসলাম প্রচারের ঘোষণা দেননি। আবু তালিব যে মূর্তিপূজারীদের বিপরীতে ইব্রাহিমের ধর্মে বিশ্বাসী একত্ববাদী হানিফ বা আদি-মুসলিম ছিলেন তা এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আবু তালিব তো লাত, মানাত, হোবল এবং ওজ্জার মত পৌত্তলিক ও মুশরিকদের দেবতাগুলোর নামও উচ্চারণ করতে পারতেন!

হযরত খাদিজার মাতা মহানবীর জন্মের ৫ বছর পর মারা যান বলে উল্লেখ করা হয়। আরো দশ বছর পর মারা যান তাঁর বাবা। বাবার মৃত্যুর পর খাদিজা (সা) তাঁর পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী হন ও বাবার ব্যবসা অব্যাহত রাখার দায়িত্ব পালন করেন এবং তা আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হন।  মহানবীর সঙ্গে বিয়ের আগেও খাদিযা তাঁর সম্পদ ইয়াতিম, অক্ষম, দুর্বল ও দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করতেন। দরিদ্র ও নিঃস্বদের বিয়ের অর্থের যোগান দিতেন তিনি। দরিদ্র মেয়েদের বিয়ের খরচও তিনি দিতেন। 

যাই হোক হযরত খাদিজার অর্থে প্রতিপালিত হত মক্কার ইয়াতিম ও দরিদ্ররা। জাহিলি যুগে আরবরা যখন নারীকে সম্মান দিত না। স্ত্রীর প্রতি আচরণ যখন ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপমানজনক এবং আরবদের অনেকেই যখন কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত নারীর প্রতি সেই অসম্মানের যুগেও আরবরা হযরত খাদিজাকে দেখতো সম্মানের দৃষ্টিতে। তারা তাঁকে বলতো তাহেরা তথা পবিত্র। দানশীলতা ও  মানুষের সঙ্গে সদাচারণের কারণে জনগণ তাকে বলত কুরাইশ রাজকন্যা!

মহানবী যখন খাদিযাকে বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদিযার বয়স ৪০ বা মতান্তরে ২৮ ছিল। 

বিশ্বনবী (সা)-কে বিয়ে করার কারণে মক্কার কাফির সম্প্রদায়ের মহিলারা বিবি খাদিজাকে বয়কট করেছিল। ফাতিমা (সা)'র জন্মের প্রাক্কালে কাফির সম্প্রদায়ের অভিজাত মহিলারা তাঁর সেবার জন্য কোনো নারীকে পাঠায়নি। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও কুদরতের ছায়ায় তিনি ফাতিমা (সা.)-কে প্রসবের সময় দেখতে পান যে তাঁর সেবা করার জন্য বেহেশত থেকে এসেছেন ইসহাকের (আ) মা বিবি সারা, ঈসার (আ) মা বিবি মারইয়াম, ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া এবং হযরত মূসার বোন উম্মে কুলসুম। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (সা. আ) বলেছেন, ‘ফাতিমার জন্মগ্রহণের সময় সাহায্য করার জন্য আমি কুরাইশ নারীদের ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তারা এ বলে প্রত্যাখ্যান করল যে, আমি মুহাম্মাদকে বিয়ে করেছি। আমি কিছুক্ষণের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম চারজন উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় দীর্ঘকায়া বিশিষ্ট নারী আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমাকে আতংকিত দেখে তাঁরা বললেন : হে খাদীজা! ভয় পাবেন না। আমি হলাম ইসহাকের মা সারা (হযরত ইব্রাহিম আ.'র স্ত্রী), আর অপর তিনজন হলেন ঈসার মা মারইয়াম, ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া এবং মূসার বোন উম্মে কুলসুম। আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন আপনাকে সাহায্য করতে। এ বলে সেই জ্যোতির্ময় নারীরা আমার চারপাশ ঘিরে বসলেন। আমার মেয়ে ফাতিমা জন্মগ্রহণ করা পর্যন্ত তাঁরা আমার সেবা করলেন।’ কন্যা ফাতিমা (সা. আ.) যখন হযরত খাদিজা (সা. আ)’র গর্ভে ছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে মা খাদিজা কথা বলেছেন বলে বর্ণনা রয়েছে

 ইসলাম প্রচারের কাজে ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে কঠোর-নিষেধাজ্ঞা কবলিত মুসলমানদের সেবায় সমস্ত সম্পদ ব্যয় করেন হযরত খাদিজা (সা)। ফলে নিজ কন্যা ফাতিমার জন্য তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদই রেখে যেতে পারেননি। শেবে আবু তালিবে অবরুদ্ধ মুসলমানদের সঙ্গে তখন কথা বলা, লেনদেন করা এবং এমনকি পানি ও খাদ্য সরবরাহ করাও নিষিদ্ধ করেছিল কাফের কুরাইশ নেতৃবৃন্দ। এ সময় পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণের গৌরবের অধিকারী হযরত আলী (আ) গোপনে ঝুঁকি নিয়ে মক্কায় যেতেন এবং এক মোষক পানি নিয়ে আসতেন। আর সেই পানির জন্য হযরত খাদিজার সম্পদ থেকে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করা হত। খাবারও আনা হত হযরত খাদিজার অর্থ দিয়ে। বলা হয় হযরত আলীর তরবারি বা বীরত্ব ও হযরত খাদিযার এতসব ত্যাগ না থাকলে ইসলামের অস্তিত্বই থাকতো না। তাই খাদিজা সা. আ. ছিলেন সত্যিকার অর্থেই উম্মতের মাতা বা উম্মুল মু'মিনিন। 

যখন কয়েক বছর পর শেবে আবু তালিবের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয় তখন হযরত খাদিজা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েন শারীরিকভাবে। বলা হয় তার কাছে আর কোনো অর্থ-কড়িই ছিল না। এমনকি কাফন দেয়ার কাপড় কেনার সামর্থও ছিল না। তাই তিনি ওসিয়ত করেছিলেন যেন মহানবীর জামাকে তার কাফন করা হয়। বলা হয় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জিব্রাইল ফেরেশতা হযরত খাদিজার জন্য একটি বেহেশতি কাফন নিয়ে এসে তা মহানবীর জামার (কাফনের) ওপর পেঁচিয়ে দেন। 

হযরত খাদিজা (সা.আ) তাঁর সব সম্পদ ইসলামের সেবায় দান করে দিয়েছিলেন বলে তিনি পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। মৃত্যুর প্রাক্কালে তাঁর আশপাশের অনেকেই তাঁকে কাঁদতে দেখেন। এ সময় তাঁর পাঁচ বছরের কন্যা হযরত ফাতিমা (সা.আ) কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন: তোমার বাবার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে, কিন্তু রাসুলে খোদার (সা) কাছে তা চাইতে আমার লজ্জা হচ্ছে। আর এই অনুরোধটা হল, আমি এমন অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছি যে আমার কোনো কাফনের কাপড়ও নেই। প্রিয় ফাতিমা! তুমি তোমার বাবাজানকে বল, যদি সম্ভব হয় তাহলে তিনি যেন তাঁর জামার ওপরের ঢিলেঢালা আলখাল্লা তথা আবাটি আমাকে দান করেন যা তিনি নামাজের সময় ব্যবহার করেন। (অন্য বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত খাদিজা বলেন, রাসুলে খোদা সেই আবাটি আমাকে যেন কাফন হিসেবে দান করেন যা পরে তিনি হেরা গুহায় যেতেন এবং ওই আবা পরা অবস্থায় তাঁর ওপর ওহি নাজেল হয়েছিল।) ( সম্ভবত সেই একই আবা পরেই মহানবী-সা. নামাজ পড়তেন) মহানবীর (সা) কাছে যখন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর এই আর্জি পৌঁছল, তখন তাঁর চোখ বেয়ে ঝরে পড়ল অশ্রু। তিনি বললেন: আমাদের ওপর খাদিজার হক এর চেয়েও বেশি। এরপর তিনি নিজের আবাকে খাদিজা (সা.আ)’র কাফন হিসেবে ব্যবহার করতে দিলেন। আর এমন সময় জিবরাইল (আ) নাজিল হন। তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! মহান আল্লাহ আপনার কাছে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন যে, যেহেতু খাদিজা তার সব সম্পদ আমার রাস্তায় ব্যয় করেছে তাই আমি নিজেই তার কাফনের ব্যবস্থা করার জন্য বেশি উপযুক্ত। ফলে তাঁর জন্যই পাঠানো হয় প্রথম আসমানি কাফন যা আর কারো জন্য এর আগে করা হয়নি। মহানবীও (সা) প্রথমে নিজের আবা দিয়ে ও পরে তার ওপরেই মহান আল্লাহর পাঠানো উপহারের কাপড় তথা বেহেশতি কাপড় দিয়ে হযরত খাদিজাকে কাফন দেন। মহানবী (সা) নিজেই খাদিজার (সা.আ) লাশকে গোসল করিয়েছিলেন। (শাজারে তুবা, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২)

খাদিজাকে দাফন করার পর শিশু কন্যা ফাতিমাকে (বড় জোর সাত বছর বয়স) সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েন মহানবী (সা) যখন ফাতিমা প্রশ্ন করেন: বাবা! আমার মা কোথায় গেছেন? এ সময় ওহির ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) নেমে এসে মহানবীকে বলেন,  আপনার প্রভু আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন ফাতিমাকে এটা বলতে যে তিনি (মহান আল্লাহ) ফাতিমার কাছে সালাম বা দরুদ পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন, তোমার মা রয়েছেন  (খাদিজা) রয়েছে কিংখাব বা বুটিদার রেশমি কাপড়ের এমন একটি ঘরে যার প্রান্ত বা দেয়ালগুলো সোনার নির্মিত ও খুঁটিগুলো চুনি বা রুবি পাথরের তৈরি। ঘরটি রয়েছে আসিয়া বিনতে মুজাহিম (জালিম ফেরাউনের মুমিন স্ত্রী) এবং মারিয়াম বিনতে ইমরানের তথা হযরত ঈসার মায়ের ঘরের মাঝখানে।

ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি হযরত ফাতিমা মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ সালাম তথা অনন্ত শান্তি এবং শান্তি তাঁর থেকে ও তাঁর প্রতি। ফাতিমা পরবর্তীকালে বাবার অনন্য সেবা যত্নের জন্য উপাধি পান উম্মে আবিহা বা বাবার মাতা! কিন্তু প্রায় ১২ বছর পর একদল প্রভাবশালী মুসলমান ফাতিমা ও আবু তালিবের পুত্র আলীকেও তাদের অধিকার লঙ্ঘন করে ব্যাপক কষ্ট দিয়েছিল বলে ইতিহাসের কোনো কোনো অংশে বর্ণনা রয়েছে। #   

পার্সটুডে/মু.আ. হুসাইন/১০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।   

ট্যাগ