জুন ২২, ২০২১ ১৬:০৭ Asia/Dhaka

১৪৮ হিজরির ১১ ই জিলকাদ মদিনায় ইমাম মুসা ইবনে জাফর সাদিক (আ.)'র ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন মহানবীর পবিত্র আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আ)। ইমাম রেজা (আ)'র পবিত্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি অশেষ মুবারকবাদ। তাঁর মায়ের নাম ছিল উম্মুল বানিন নাজমা।

১৮৩ হিজরিতে আব্বাসীয় বাদশাহ হারুনের নির্দেশে তারই এক কারাগারে ইমাম কাজিম (আ.)'র শাহাদতের পর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মুসলিম উম্মাহর ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ওই মহান ইমামের পুত্র ইমাম রেজা (আ.)। এই মহান ইমামের জন্মদিনে সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ এবং মহানবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে অশেষ দরুদ ও সালাম।

মহানবীর পবিত্র আহলে বাইত তথা মাসুম বংশধররা ছিলেন খোদায়ী নানা গুণ ও সৌন্দর্যের প্রকাশ এবং মানব জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। শেখ সাদুক ইমাম রেজা (আ.) সম্পর্কে  লিখেছেন,  অসাধারণ নানা গুণ ও যোগ্যতার জন্য আলী ইবনে মুসা রেজা (আ.) রেজা বা সন্তুষ্ট, সাদিক বা সত্যবাদী, ফাজেল বা গুণধর, মু'মিনদের চোখের প্রশান্তি ও অবিশ্বাসীদের ক্ষোভের উৎস প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তবে আলী ইবনে মুসা রেজা (আ.)'র একটি বড় উপাধি হল 'আলেমে আ'লে মুহাম্মাদ' বা মুহাম্মাদ (সা.)'র আহলে বাইতের আলেম।

ইমাম রেজা (আ.)'র পিতা ইমাম মুসা কাজিম (আ.) বলেছেন, আমার বাবা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আমাকে বার বার বলতেন যে, আলে মুহাম্মাদের আলেম বা জ্ঞানী হবে তোমার বংশধর। আহা! আমি যদি তাঁকে দেখতে পেতাম! তাঁর নামও হবে আমিরুল মু'মিনিন (আ.)'র নাম তথা আলী। প্রায় হাজার বছর আগে লিখিত 'শাওয়াহেদুন্নবুওয়াত' নামক বইয়ে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, যারা ইমাম রেজা (আ.)'র মাজার জিয়ারত করবে তারা বেহেশতবাসী হবে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ইরানের খোরাসানে তাঁর শরীরের একটি অংশকে তথা তাঁর পবিত্র বংশধারার একজন সদস্যকে দাফন করা হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। একই বইয়ে ইরানের কোম শহরে হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)’র পবিত্র মাজার জিয়ারতকারীও বেহেশতবাসী হবেন বলে হাদিস রয়েছে। এই ফাতিমা মাসুমা ছিলেন ইমাম রেজা-আ.’র ছোট বোন। মাসুমা বা নিষ্পাপ ছিল তাঁর উপাধি।-

ইমাম রেজা (আ.)'র ইমামতির সময়কাল ছিল বিশ বছর। এই বিশ বছর ছিল আব্বাসীয় তিনজন শাসক যথাক্রমে বাদশাহ হারুন এবং তার দুই পুত্র আমিন ও মামুনের শাসনামল। ইমাম রেজা (আ.) তাঁর পিতা ইমাম মূসা কাজিম ( আ. )’র নীতি-আদর্শকে অব্যাহত গতি দান করেন। ফলে শহীদ ইমাম মূসা কাজিম (আ.)’র মত ইমাম রেজাও রাজরোষের শিকার হন। আব্বাসীয় রাজবংশে বাদশাহ হারূন এবং মামুনই ছিল সবচে পরাক্রমশালী। তারা প্রকাশ্যে ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলে বেড়ালেও অন্তরে ইমামদের রক্তের তৃষ্ণায় তৃষিত ছিল।

আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ইসলামী খেলাফতের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবলমাত্র নবী পরিবারের নিষ্পাপ বা পবিত্র ইমামগণের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং তাঁরা ছাড়া কেউ ঐ পদের যোগ্য নয়- জনগণের মাঝে এই সত্য প্রচারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বাদশা’র বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠবে-এই আশঙ্কায় ধূর্ত মামুন ইমাম রেজাকে (আ) সবসময়ই জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। অন্য ইমামদেরকেও গণ-বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করেছিল তাগুতি শাসকরা। কিন্তু তারপরও নিষ্পাপ ইমামদের সুকৌশলের কারণে তাঁদের বার্তা জনগণের কাছে ঠিকই পৌঁছে যেত।

জনগণের কাছে মহান ইমামগণের বার্তা পৌঁছে যাবার ফলে জনগণ প্রকৃত সত্য বুঝতে পারে, এবং নবীবংশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে থাকে। হযরত আলী(আ.)’র পবিত্র খান্দানের কেউ বাদশাহর বিরুদ্ধে গেলে বাদশাহি হারাতে হবে-এই আশঙ্কা মামুনের ছিল। ফলে মামুন ভক্তি দেখানোর ভান করে ইমামকে খোরাসানে আসার আমন্ত্রণ জানায়। ইমাম প্রথমত রাজি হন নি, কিন্তু তাঁকে আমন্ত্রণ গ্রহণে বাধ্য করা হয়। নবীবংশের মধ্যে ইমাম রেজা (আ.)ই প্রথম ইরান সফর করেন। যাত্রাপথে তিনি যেখানেই গেছেন জনগণ তাঁকে সাদরে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে। ইমামও নবী করিম (সা.), তাঁর আহলে বাইত ও নিষ্পাপ ইমামদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামের সঠিক বিধি-বিধান সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন। সেইসাথে বাদশাহর আমন্ত্রণের কথাও তাদেরকে জানান। -ধূর্ত মামুন ইমামের আগমনে তার সকল সভাসদ ও অন্যান্য লোকজনকে সমবেত করে ইমাম রেজাকে খলিফা হওয়ার প্রস্তাব দেন।  ইমাম, মামুনের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি সম্পর্কে জানতেন। তাই তিনি জবাবে বললেন, মহান আল্লাহ যদি খিলাফত তোমার জন্যে নির্ধারিত করে থাকেন, তাহলে তা অন্যকে দান করা উচিত হবে না। আর যদি তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে খেলাফতের অধিকারী না হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর খেলাফতের দায়িত্ব কারো উপর ন্যস্ত করার কোনো অধিকার তোমার নেই।

ইমাম শেষ পর্যন্ত খেলাফতের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় মামুন ইমামকে তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হতে বাধ্য করে। ইমাম রেজা (আ.) শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে কিছু শর্তসাপেক্ষে তা গ্রহণ করেন। যেমন, তিনি প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না ও দূরে থেকে তিনি খেলাফতের সম্পর্ক রক্ষা করবেন- এসব ছিল অন্যতম শর্ত।

ইমাম রেজা র এই দায়িত্ব গ্রহণের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে আব্বাসীয়রা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। আসলে মামুনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, শিয়াদের বৈপ্লবিক সংগ্রামকে স্তিমিত ও ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা ও আব্বাসীয় খেলাফতকে বৈধ বলে প্রমাণ করা। ইমামকে উত্তরাধিকারী বানানোর মাধ্যমে মামুন নিজেকে একজন আধ্যাত্মিক ও মহান উদার ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তুলে ধরতে চেয়েছে।

মামুনের সমর্থক আব্বাসীয়রা ইমামকে বিভিন্নভাবে হেয় ও মর্যাদাহীন করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। যেমন, বিভিন্ন ধর্মের জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের মাধ্যমে জটিল প্রশ্ন করে ইমাম রেজা (আ.)-কে জব্দ করার চেষ্টা এবং ক্ষরা-পীড়িত অঞ্চলে বৃষ্টি বর্ষণের জন্য ইমামকে দিয়ে এই আশায় দোয়া করানো যে দোয়া কবুল না হলে ইমামের মর্যাদা ধূলিসাৎ হবে। কিন্তু ইমাম প্রতিটি জ্ঞানগত বিতর্কে বিজয়ী হতেন এবং বৃষ্টির জন্য করা তাঁর দোয়াও সফল হয়েছিল। ফলে ইমাম রেজার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ও ইমামের বিরুদ্ধে মামুনের ক্রোধ আর হিংসাও বাড়তেই থাকে।

আর ইমামও মামুনের বিরুদ্ধে অকপট সত্য বলার ক্ষেত্রে নির্ভীক ছিলেন। কোনোভাবেই যখন ইমামকে পরাস্ত করা গেল না, তখন মার্ভ থেকে বাগদাদে ফেরার পথে ইরানের বর্তমান মাশহাদ প্রদেশের তূস নামক অঞ্চলে মামুন ৫৫ বছর বয়স্ক ইমাম রেজাকে বিষ-মাখানো ডালিমের রস বা আঙ্গুরের রস খাইয়ে শহীদ করে।  ২০৩ হিজরির ১৭ই সফরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। কিন্তু আসল মৃত্যু ঘটেছিল মামুনেরই। পক্ষান্তরে ইমাম শাহাদাতের পেয়ালা পান করে মানুষের হৃদয়ে অমর হলেন। ইমাম রেজা (আ) ছিলেন ধৈর্যের পরীক্ষা ও ত্যাগের পরাকাষ্টায় উন্নীত পুরুষ। আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ইমানের কারণে তিনি কাউকে ভয় পেতেন না। ইসলামী ইরানের শীর্ষ নেতারাও একই ধারার অনুসারী বলেই খোদাদ্রোহী পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে  সংগ্রামে নির্ভীক।

ইমাম রেজা (আ) তাঁর অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে সবার জন্য সর্বোত্তম ও বোধগম্যভাবে ইসলামের বিশ্বাসগুলো তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছেন, "জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে এমন এক গচ্ছিত সম্পদের মত যার চাবি হল, প্রশ্ন। আল্লাহর রহমত তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক, কারণ প্রশ্নের মাধ্যমে চার গ্রুপ তথা প্রশ্নকারী, শিক্ষার্থী, শ্রবণকারী ও প্রশ্নের উত্তর-দাতা সবাই-ই সাওয়াব লাভ করেন।"

ইমাম রেজা (আ) ইরানের নিশাপুরে এক হাদিসে বলেছেন, মহানবী (সা) বলেছিলেন,  মহান ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) গৌরবময় মহান আল্লাহকে বলতে শুনেছেন যে তিনি বলেছেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা'বুদ বা উপাস্য নেই- এই বাক্যটি হচ্ছে আমার দুর্গ, তাই যে তাতে প্রবেশ করবে সে আমার শাস্তি থেকে নিরাপদ থাকবে। -এতটুকু বলার পর ইমামের কাফেলার যানবাহন নিশাপুর থেকে বাদশাহ মামুনের প্রাসাদ অভিমুখে চলা শুরু করলে তিনি আরও বলেন, অবশ্য এর তথা মহান আল্লাহর ওই ঘোষণার শর্তাবলী রয়েছে এবং আমি হচ্ছি এর অন্যতম শর্ত! অর্থাৎ তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে তাঁর ইমামত আল্লাহর পক্ষ থেকেই মনোনীত। আর তাই তাঁর আনুগত্য করা ফরজ।

ইমাম রেজা (আ)'র পবিত্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে আবারও জানাচ্ছি অশেষ মুবারকবাদ। #

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ