নভেম্বর ১৮, ২০২১ ২১:৪১ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো এক চালাক দর্জির গল্প।

কীভাবে সে তার কাছে জামা সেলাই করতে আসা লোকজনকে তাদের সামনেই বোকা বানায় সেরকম একটি গল্প। মজার ব্যাপার হলো প্রাচীনকালের ওই দর্জি মানুষের দেওয়া জামা সেলাইয়ের কাপড় থেকে যে-কোনোভাবেই হোক না কেন, খানিকটা কাপড় বাঁচিয়ে নিজে রেখে দিতো। সবাই কিন্তু এ কথা জানতো অথচ কারও পক্ষেই তার কাপড় বাঁচিয়ে রেখে দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করা সহজ ছিল না, কেই পারতো না প্রমাণ করতে।

দর্জি কিন্তু ক্রেতার সামনেই কাপড় মাপতো এবং কাপড় কাটাছেঁড়া করতো, তবু কেউ বুঝতেই পারতো না যে সে কাপড় বাঁচিয়ে রেখে দিয়েছে। এতোটাই দক্ষ ছিল সেই দর্জি। যে-ই এই দর্জির কাছে কাপড় নিয়ে যেত সে-ই তার সঙ্গী-সাথীদের বলতো: আমি কিছুতেই দর্জিকে আমার চোখ ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ দেব না। তারপরও সবাই মোটামুটি বোকা বনে যেত। দর্জি তার এই কাজটাকে একটা চতুর শিল্প হিসেবে নিয়েছিল। সে কারণে বাঁচানো কাপড় সে জামা সেলাই করার পর কাস্টমারকে দেখিয়ে গর্ব বোধ করতো: কী নৈপুণ্য ও শিল্পশৈলীতে প্রাজ্ঞ সে।

দর্জি তার এই শৈল্পিক চাতুর্যের জন্য বহু রকমের কৌশল অবলম্বন করতো। প্রত্যেক ক্রেতার সঙ্গেই সে এমনভাবে কথাবার্তা বলতো যে তাদের মনোযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ফেলতো। এই ফাঁকে দর্জি তার কাজ সেরে নিতো। একদিন এক ধনী তুর্কি যুবক তার বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ দিলো যে, সে দর্জিকে কাপড় দেবে কিন্তু কোনোভাবেই কাপড় চুরির সুযোগ দেবে না। কফিখানায় একদিন এ নিয়ে তাদের মাঝে আলাপ হচ্ছিলো। এক বন্ধু বললো: বাজি হয়ে যাক তাহলে। তুর্কি যুবকের একটি আরবি ঘোড়া ছিল বেশ তরতাজা এবং তাগড়া। সে ওই ঘোড়াটি বাজি ধরলো। দর্জি যদি আমার কাপড় চুরি করতে পারে তাহলে যে বাজি ধরবে তাকে এই ঘোড়া আমি দিয়ে দেবো। আর যদি না পারে তাহলে ঠিক এরকম একটি ঘোড়া আমাকে দিতে হবে।

অর্থবিত্তহীন এক যুবক বলে উঠলো: আমি বাজি ধরতে রাজি। তবে আমার কাছে টাকাও নেই ঘোড়াও নেই। তুমি যদি বিজয়ী হও তাহলে আমি তোমার গোলাম হিসেবে যতদিন চাত কাজ করবো। তুর্কি যুবক মেনে নিলো। পরদিন সকালবেলা তুর্কি যুবক তার জামা সেলাইয়ের জন্য কাপড় নিয়ে গেল সেই দর্জির কাছে। দর্জি ওই বাজির কথা জানতো। তাই তাকে দেখে মনে মনে বললো: হে সহজ সরল মনের যুবক! তুমি যে ঘোড়া হারিয়েছো সেটা নিশ্চিত থাকতে পারো। এমন বিভ্রম সৃষ্টি করবো যে নিজেও টের পাবে না কোত্থেকে কী হয়ে গেল। দর্জি চমৎকারভাবে যুবককে স্বাগত জানালো। যুবকের পুরো মনোযোগ ছিল দর্জির ওপর। তার সাটিনের কাপড়টি দর্জিকে দিয়ে বললো: দর্জি সাহেব! এই কাপড় দিয়ে আমার জন্য একটি কোবা বানিয়ে দাও! কোবা হলো যুদ্ধের সময় উপযোগী বুক খোলা এক ধরনের লম্বা পোশাক।

দর্জিকে জামা কেমন হবে বুঝিয়ে দিলো যুবক। দর্জি জানতো এই যুবক হাসির গল্প পছন্দ করে। তাই কাপড় এপিঠ-ওপিঠ করতে করতে এবং মেপে মেপে কাঁচি দিয়ে কাটতে কাটতে হাসির একটি গল্প বলতে শুরু করে দিলো। গল্প বলার আগে দর্জি যুবককে বললো: আমার আগের কাস্টমারদের কিছু গল্প তোমাকে বলি শোনো! তোমার নিশ্চিয়ই খুব ভালো লাগবে। দর্জি ইনিয়ে বিনিয়ে রস লাগিয়ে মিষ্টি স্বরে প্রথম গল্পটি শুরু করলো। দর্জির গল্প শুনে ধনী যুবক গল্পের ভুবনে হারিয়ে গেল এবং হাসতে শুরু করলো। যুবকের চোখগুলো ছিল ছোটো। হাসলে আরও ছোটো হয়ে যেত। এতোই হাাসহাসি করলো সে যে তার চোখ দুটো একেবারে বন্ধই হয়ে গেল। দর্জি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলো এবং এক টুকরো কাপড় কেটে লুকিয়ে ফেললো।

যুবক দর্জির গল্প শুনে এমন মজাই পেলো যে সে আরও গল্প বলার অনুরোধ করলো। দর্জি একটুখানি 'না না, আজ আর না' করলো বটে তবে একটুপর শুরু করলো দ্বিতীয় গল্প। যুবক এতোই হাসলো যে হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি দিলো। তার খবরই ছিল না যে দর্জি এই ফাঁকে টুকরো টুকরো কাপড় লুকানোর সুযোগ কাজে লাগালো। মাত্র দুটি গল্প শুনিয়েই দর্জি যুবকের দামি কাপড়ের কিছু অংশ লুকাতে সক্ষম হয়ে গেল। যুবক এবার তৃতীয় গল্প শোনাতে বললো দর্জিকে। সে তো বুঝতেই পারছিল না একেকটি গল্পে তার কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে। দর্জি বাকি কপড় এবং যুবকের দিকে তাকালো এবং মনে মনে বললো: এই যুবক বেচারা যদিও বুঝতে পারছে না আমি কী পরিমাণ কাপড় লুকিয়েছি, কিন্তু আল্লাহ নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হবেন এরচেয়ে বেশি গল্প শোনালে।

যুবক আবারও পীড়াপিড়ী করতে লাগলো দর্জিকে গল্প শোনাবার জন্য। কিন্তু দর্জি কিছুতেই রাজি হলো না। সে যুবককেও বোঝাতে পারলো না যে এই গল্প বলা থেকে সে কী পরিমাণ সুবিধা লুটেছে।  দর্জি এবার যুবকের দিকে তাকিয়ে বললো: হে যুবক! আমি আর গল্প বলবো না। আমি খুবই ক্লান্ত। তাছাড়া বলার মতো গল্পও আর আমার জানা নেই। যুবক নাছোড়বান্দা। সে তবুও গল্প শুনতে চাইলো। দর্জি এতো অনুনয় বিনয় দেখে এবার বাধ্য হলো স্পষ্ট ভাষায় কথা বলে তাকে সচেতন করে তুলতে। যুবকের দিকে তাকিয়ে বললো: হে বোকা যুবক! এবার থামো! তোমাকে যদি আরও হাসির গল্প শোনাই তাহলে তোমার কোবা অনেক ছোটো হয়ে যাবে, বুঝতে পেরেছো?।

যুবক এবার যেন গভীর স্বপ্নিল নিদ্রা থেকে জেগে উঠলো। শান্ত হলো এবং কয়েক মিনিট পর হো হো করে হেসে উঠলো। দর্জি জানতে চাইলো: হাসছো কেন? যুবক বললো: এবার কিন্তু গল্পের জন্য হাসছি না। হাসছি এজন্য যে আমি তো প্রথম গল্পেই বাজিতে হেরে আমার ঘোড়া হারিয়েছি, অথচ আমার কোনো খবরই নেই।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ