নভেম্বর ২২, ২০২১ ১৮:১২ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সম্মিলিতভাবে ইরাককে যেসব সমরাস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা ইরাকের প্রতি বৈদেশিক সাহায্যের বিপরীতে নিষেধাজ্ঞাসহ অন্যান্য কারণে ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশা সম্পর্কে আলোচনা করব।

ইরাকের বসরা নগরীর পূর্বদিকে শালামচে এলাকায় ইরান কারবালা-৫ অভিযান চালানোর পর আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে, এই যুদ্ধে সাদ্দামকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ইরাকের প্রতি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে দিতে হবে।  সাদ্দাম সরকারকে সামরিক সহযোগিতা দেয়ার জন্য মস্কো বাগদাদের সঙ্গে একটি বিমান রুট চালু করে। আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সাদ্দাম সরকারের সঙ্গে কয়েক হাজার কোটি ডলারের সামরিক চুক্তি সই করে। এসব সাহায্য গ্রহণ করার ফলে ইরানের হাতে ব্যাপক মার খাওয়ার পরও ইরাকের সামরিক শক্তি যুদ্ধ শুরুর তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

এদিকে কোনো ধরনের বিদেশি সহযোগিতা ছাড়াই ইরানি যোদ্ধারা বিভিন্ন ফ্রন্টে ইরাকি বাহিনীকে একের পর এক পরাজয়ের স্বাদ দিয়ে যাচ্ছিল। ইরান যে শুধু বিদেশি সাহায্য পায়নি তা-ই নয় বরং উল্টো ১৯৮৫ সাল থেকে তেহরানের ওপর পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রাখে। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরো বেশি পঙ্গু করে দেয়ার জন্য সাদ্দামের সহযোগী আরব দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব বিশ্ববাজারের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি তেল উৎপাদন করতে থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যায় এবং ইরান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একইসঙ্গে পারস্য উপসাগরে ইরানের তেল ট্যাংকার ও পণ্যবাহী জাহাজগুলোর ওপর ইরাকি বাহিনীর হামলার ফলে দেশের জনগণের নিত্যপণ্যের চাহিদা মেটানো ইরান সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এরকম কঠিন পরিস্থিতিতেও যুদ্ধের পেছনে ইরানকে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়। ১৯৮৬ সালে ইরানের মোট বার্ষিক বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ এবং ১৯৮৭ সালের মোট বাজেটের এক-চতুর্থাংশ যুদ্ধের জন্য বরাদ্দ করতে হয়। তেলখাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমে যাওয়ার কারণে ইরানকে উন্নয়ন কার্যক্রমের বাজেট কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুত ও জ্বালানী খাতে জনগণকে দেয়া ভর্তুকি বাতিল করতে হয়। সেইসঙ্গে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ইরান সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণ নিতে বাধ্য হয়।

এদিকে ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন কমে যাওয়ার পাশাপাশি সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ১৯৮৬ সালের তুলনায় ১৯৮৭ সালে আরো খারাপ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ইরানকে বাধ্য হয়ে এমন পরিকল্পনাও করতে হয় যে, যদি আমেরিকা সাদ্দামের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়ে তাহলে তেহরান কি কি ব্যবস্থা নেবে এবং যুদ্ধের অতিরিক্ত ব্যয় সংকুলান কীভাবে হবে? পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরান সরকার একটি আপদকালীন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়। এই পরিকল্পনায় বার্ষিক মোট বাজেটের কিছু অংশ জনগণের খাদ্যসহ অন্যান্য অতি জরুরি জিনিসের জন্য রেখে বেশিরভাগ অংশ যুদ্ধের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু ১৯৮৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এই তিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয় যে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় এই আপদকালীন পরিকল্পনা দিয়েও আর দেশ চালানো সম্ভব নয়। ইরানি কর্মকর্তারা এই সত্য উপলব্ধি করেন যে, দেশের সার্বিক আয় যেভাবে কমে গেছে তার ফলে আর যুদ্ধের ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে ইরানের আবাসিক এলাকা, অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং পারস্য উপসাগরের তেল ট্যাংকারগুলোতে ইরাকি বাহিনীর হামলা বেড়ে যায়। এ অবস্থায় ইরানকেও বাধ্য হয়ে তেল ট্যাংকার-যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। ওদিকে ইরাকি বাহিনী প্রথমবারে মতো সারদাশত ও হালাবচে শহরে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে। সাদ্দাম সরকার ইরাকের বেশিরভাগ সরকারি অবকাঠামোকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করতে থাকে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগই যুদ্ধের জন্য বরাদ্দ দেয়। ফলে ধীরে ধীরে সামরিক ভারসাম্য ইরাকের অনুকূলে চলে যেতে থাকে। এ অবস্থায় ইরান একটি বিশাল সামরিক অভিযান চালিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর পরিল্পনা করে।

এ লক্ষ্যে কারবালা-৫ অভিযানের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু ওই অভিযানে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি করা সত্ত্বেও তেহরানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এর আগে ইরান নিজের খোররামশাহর শহর পুনরুদ্ধার ও ইরাকের ফাও উপত্যকা দখল করার কারণে তেহরানে এই আশাবাদ সঞ্চার হয়েছিল যে, কারবালা-৪ ও কারবালা-৫ অভিযানেও একই রকম সাফল্য আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি এবং ওই দুই অভিযান চালিয়ে ইরাক সরকারকে যুদ্ধ সমাপ্তি লক্ষ্যে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হয়নি।  ইরান খোররামশাহর পুনরুদ্ধার করার পর দুই দেশই যুদ্ধ সমাপ্তি টানার জন্য আন্তরিক চেষ্টা শুরু করে। সাদ্দাম সরকার যুদ্ধকে নিজের অনুকূলে রেখে এর সমাপ্তি টানার পরিকল্পনা হাতে নেয় যাতে ১৯৭৫ সালে স্বাক্ষরিত আলজিয়ার্স চুক্তির পরিবর্তে দু’দেশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য আরেকটি নতুন চুক্তি সই করা যায়।

অন্যদিকে ইরান চেয়েছিল আলজিয়ার্স চুক্তির ভিত্তিতে এ যুদ্ধ শুরু করার জন্য ইরাককে দায়ী করে তার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা। কিন্তু ১৯৮৭ সালে ইরাকের সাদ্দাম বাহিনী নিজের সামরিক সক্ষমতাকে এতটা শক্তিশালী করে এবং আগের ইরানি অভিযানগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এতটা প্রস্তুত নেয় যে, ইরানের পক্ষে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে তাতে সাফল্য আদায় করা সম্ভব হয়নি। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ