নভেম্বর ২৯, ২০২১ ১৯:৪৯ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রবাদের গল্প। বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ অহরহ শোনা যায়। গল্প মানে প্রবাদটি আপনারাও শুনে থাকবেন হয়তো।

সেটি হলো: হাতী গর্তে পড়লে চামচিকাও লাথি মারতে আসে। প্রবাদ শুনলেই কাহিনীটা অনুমান করা যায় মোটামুটি। এরকমই একটি ফার্সি প্রবাদ হলো: উটের পায়ে নাল পরাতে দেখে ব্যাঙ তার ঠ্যাঙ বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের সমাজে লক্ষ্য করা যায় মানুষ সাধারণত শক্তিমানকে তোয়াজ করে চলে। ভাবখানা এমন যেন শক্তিমান লোকটি তোয়াজকারীর ভীষণ আপন। এমনকি ছলে-বলে-কৌশলে আত্মীয়তার একটা বন্ধনও তৈরি করার চেষ্টা করে তারা। যদিও তার সঙ্গে সম্পর্কের লেশমাত্রও নেই। সম্পর্কের গাঁটছড়া সমাজে প্রচার করে দুর্বলের কাছ থেকে অনেক সুবিধাও আদায় করে এ ধরনের লোকজন। আবার কখনও যদি দেখে শক্তিমান লোকটি কোনোরকম বিপদে পড়ে গেছে, তার শক্তি, ক্ষমতা কমে গেছে তখন তোয়াজকারী লোকটির চরিত্র পাল্টে যায়। এমনই পাল্টে যায় যে সে দুর্বল হয়ে পড়া শক্তিমান লোকটির ওপর নিজের শক্তি প্রয়োগ করার চেষ্টা চালায়। অনেকটা প্রতিশোধ বা সুযোগের সদ্ব্যবহার করার মতো। আবার কেউ কেউ কোনো একটি কাজের পরিণতি না জেনেই মূর্খের মতো সে কাজে স্বেচ্ছায় এগিয়ে যেতে চায়।

অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখনও মানুষের সমাবেশ হতো। মানুষজন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় মাঠে-ময়দানে সকাল-বিকেলে একত্রিত হতো। চা-পানি খেত, পরস্পরের খোজখবর নিতো ইত্যাদি। সামাজিক এই বন্ধন সুদূর প্রাচীনকালেও ছিল। এরকমই এক সুন্দর বিকেলে একটা পাবলিক প্লেইসে বেশ কিছু লোকজন একত্রিত হলো। মানুষের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা হলো কোথাও কোনো ব্যতিক্রমি কিছু দেখলেই কৌতূহলি হয়ে ওঠা। এই কৌতূহলবশতই ওই সমাবেশের পাশ দিয়ে যে-ই যাওয়া আসা করছিল সেই একটু থেমে উঁকিজুঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করলো-হচ্ছেটা কী এখানে। সুতরাং সমাবেশ অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহৎ থেকে বৃহত্তরো হয়ে উঠলো। সবারই জানার কৌতূহল: হচ্ছেটা কী এখানে।

কিছুই না আসলে। এক লোকের একটা উট ছিল। সে তার উটটির পায়ে নাল পরাতে চেয়েছিল যাতে উটের পায়ে অতিরিক্ত চলাচলের ফলে ঘা বা জখম না হয়। উটের চালক বলছিল: আমি এই উট দিয়ে মানুষের মাল-সামানা বহন করে আমার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করি। উট দিয়ে মালামাল টেনে যেটুকু টাকা-পয়সা পাই তাতেই আমার সংসার চলে। সুতরাং উটটি আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি আমার উটের পা'গুলো এতো বেশি চলাফেরার কারণে কোনোরকম ক্ষতির শিকার

অমনি একজন উঠে বললো: আরে! উট কি ঘোড়া নাকি গাধা! উটের পায়ে নাল পরাতে তো কেউ কোনোদিন দেখে নি। আরেকজন বললো: হ, ঠিকই বলেছেন! আমরাও কোনোদিন উটের পায়ে নাল পরাতে দেখি নি। তবে অপর একজন বলে উঠলো: উটের ক্ষুর কিন্তু ঘোড়া এবং গাধার ক্ষুরের মতোই। সুতরাং ক্ষুরে নাল মানে লোহার কভার না দিলে তো উটের পা আহত হতে পারে। এর জবাবে আবার একজন বলে উঠলো: উটের ক্ষুর নরম। গাধা কিংবা ঘোড়ার ক্ষুরের মতো শক্ত নয়। কারও যদি মাথা ব্যথা না করে তাহলে সে মাথায় পট্টি বা রুমাল বাঁধতে যাবে কোন দুঃখে! যে উট নাল ছাড়াই বোঝা টানতে পারে তার পায়ে নাল পরানোর তো দরকার নেই। তার মানে উপস্থিত সবাই নিজেদের মতো করে একেকটা মতামত দিতে শুরু করে দিলো।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি লক্ষ্য করার মতো ছিল তাহলো উট কিন্তু তার চার পায়ে সেই লোহার ক্ষুর কভার পরতে চাচ্ছিলো না। কেননা লোহার ওই নাল পেরেক দিয়ে পায়ে লাগাতে হতো। এ কারণে উট তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তার দেহের সকল ভার চার পায়ের ওপর স্থাপন করলো যাতে কেউ তার পাগুলোকে মাটি থেকে আলাদা করে শূন্য করতে না পারে এবং নাল পরাতে না পারে। এভাবে উটটিকে ঘিরে সমবেত লোকজন একেকজন একেক রকমের কথা বলতে লাগলো। উটটিকে যেখানে রাখা হয়েছিল তার পাশেই একটা ব্যাঙ বসবাস করতো। সে উটকে ঘিরে থাকা লোকজনের কথাবার্তা শুনছিল। এবার নিজের বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো এবং মানুষের পায়ের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে আস্তে আস্তে উটের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলো।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো এবং এর কথা ওর কথায় কান দিলো। সে বুঝতে চেষ্টা করলো লোকজন কী নিয়ে কথা বলছে। এরপর হঠাৎ করে ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে উটের পিঠের কুঁজের একেবারে চূড়ায় গিয়ে উঠে বসে। উপস্থিত সকলেই ব্যাঙের হাবভাব দেখে হাসলো এবং অবাকও হলো। একটু পর ব্যাঙ বললো: এই উট বেচারা মনে করছে নাল পরতে ব্যথা লাগে। সে কারণে মাটি থেকে তার পাগুলোকে উপরে উঠাচ্ছে না। অতএব আমি আমার পাগুলোকে এগিয়ে দিচ্ছি, তোমরা আমার পায়ে নাল পরাও যাতে উট বুঝতে পারে নাল পরতে কোনো কষ্ট নেই। ব্যাঙের মূর্খতা দেখে সবাই হো হো করে হেসে দিলো। উটও যখন দেখলো ব্যাঙ তো ভালোই খেলায় নেমেছে, আস্তে করে চূড়টাকে ঝাঁকুনি নিয়ে ব্যাঙকে মাটিতে ফেলে দিলো। ব্যাঙ তাড়াতাড়ি মানুষের পায়ের নীচে পিষ্ট হবার ভয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে গেল।

এই ঘটনার পর থেকেই যখন কোনো অভিজ্ঞ লোক কোনো কাজ করতে ইতস্তত করতো এবং কোনো মূর্খ লোক যে কিনা ওই কাজের ভালো-মন্দ সম্পর্কে না জেনেই সেই কাজটি করার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতো তখনই বলা হতো: উটকে নাল পরাতে চাইলে ব্যাঙ তার পা বাড়িয়ে দেয়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ