ডিসেম্বর ০৫, ২০২১ ১৯:২৭ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র সূরা মুহাম্মাদের ৮ম ও শেষ পর্ব নিয়ে আলোচনা। আজ আমরা এই সূরার ৩৬ থেকে ৩৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাফসির সম্পর্কে জানব। এই সূরার ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّمَا الْحَیَاةُ الدُّنْیَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا یُؤْتِکُمْ أُجُورَکُمْ وَلا یَسْأَلْکُمْ أَمْوَالَکُمْ ﴿٣٦﴾ إِنْ یَسْأَلْکُمُوهَا فَیُحْفِکُمْ تَبْخَلُوا وَیُخْرِجْ أَضْغَانَکُمْ ﴿٣٧﴾ 

“দুনিয়ার জীবন তো শুধু খেল-তামাশা মাত্র। আর যদি তোমরা ঈমান আন এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে আল্লাহ তোমাদেরকে পুরস্কার দেবেন এবং তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের ধন-সম্পদ চান না।”  (৪৭:৩৬)

“যদি আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে ধন-সম্পদ চান ও তার জন্য তোমাদের উপর চাপ প্রয়োগ করেন তাহলে তোমরা কার্পণ্য করবে এবং তখন [তিনি] তোমাদের বিদ্বেষভাব প্রকাশ করে দেবেন।”  (৪৭:৩৭)

পার্থিব জীবনের ব্যাপারে আমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি এই জগতের প্রতি আমাদের আকর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ। যে ব্যক্তি মনে করে তার সম্পদ ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী সে ব্যক্তি এসবের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এ ধরনের মানুষ আল্লাহর রাস্তায় তার সম্পদ খরচ করতে যেমন ইচ্ছুক নয় তেমনি আল্লাহর দ্বীনকে শক্তিশালী করার কাজে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করতেও তার প্রবল অনীহা।  কিন্তু একজন ঈমানদারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে- পার্থিব জীবনটা মরুভূমি ও সুন্দর বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া একটি মহাসড়ক ছাড়া আর কিছু নয়। বহু মানুষ তাদের গন্তব্যের কথা ভুলে গিয়ে মহাসড়কের পাশে থেমে যায় এবং নদীর তীরে বা গাছপালার মধ্যে আনন্দ-ফূর্তিতে মগ্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু ঈমানদার ব্যক্তিরা কখনও তাদের গন্তব্যের কথা ভুলে যায় না। তারা শুধুমাত্র প্রয়োজন অনুযায়ী কখনও কখনও সড়কের পাশে থেমে জরুরি প্রয়োজন সেরে নেয় এবং প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার সংগ্রহ করে।

তারা দীর্ঘ সময় ধরে একস্থানে বসে থাকে না বরং প্রয়োজন শেষে আবার দ্রুতগতিতে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। উপরন্তু ঈমানদার ব্যক্তিরা জীবনের মহাসড়কে চলতে গিয়ে তাকওয়া অবলম্বন করে যাতে পথিমধ্যে আল্লাহর কোনো আইন লঙ্ঘন না হয় এবং সুস্থ শরীরে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এই পথে চলতে গিয়ে সেই ব্যক্তি দ্রুত গতিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে যার সঙ্গে জিনিসপত্র কম থাকে। জিনিস কম থাকলে চলতে যেমন সুবিধা তেমনি মালপত্র দেখাশুনা করে রাখার দুশ্চিন্তা থেকেও মুক্ত থাকা যায়। এরকম মানুষ নিজের জন্য ততটুকু জিনিস সঙ্গে রাখে যতটুকু না হলেই নয়। বাকি জিনিস অন্যের জন্য রেখে দেয়। জীবন চলার মহাসড়কে যে বিষয়গুলো মানুষের গতি কমিয়ে দেয় তা হলো- লোভ ও কৃপণতা। লোভ মানুষকে হালকা ওজন নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধা দেয়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১- পার্থিব জীবনের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকা এবং আখেরাতকে ভুলে গিয়ে দুনিয়ার জীবনের প্রতি অতিরিক্ত মায়া-মমতায় জড়িয়ে পড়া ঈমানদারের কাজ নয়।

২- ঈমানহীন ব্যক্তির জীবন ছোট শিশুদের মতো যারা সারাক্ষণ তাদের খেলনা নিয়ে পড়ে থাকে এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত খেলনা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। 

৩- জীবন চলার জন্য ধন-সম্পদের প্রয়োজন। এর পরিমাণ হতে হবে ততটুকু যতটুকু না থাকলে অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। কিন্তু টাকা-পয়সা ও ধন-সম্পদ অর্জন ও এগুলোর পাহাড় জমানোকে জীবনের লক্ষ্য বানানো যাবে না।

সূরা মুহাম্মাদের ৩৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

هَا أَنْتُمْ هَؤُلاءِ تُدْعَوْنَ لِتُنْفِقُوا فِی سَبِیلِ اللَّهِ فَمِنْکُمْ مَنْ یَبْخَلُ وَمَنْ یَبْخَلْ فَإِنَّمَا یَبْخَلُ عَنْ نَفْسِهِ وَاللَّهُ الْغَنِیُّ وَأَنْتُمُ الْفُقَرَاءُ وَإِنْ تَتَوَلَّوْا یَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَیْرَکُمْ ثُمَّ لا یَکُونُوا أَمْثَالَکُمْ ﴿٣٨

“[হে লোকসকল] জেনে রেখো! তোমরাই তো তারা যাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করতে বলা হচ্ছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করছে; আর যারা কার্পণ্য করে, তারা তো কার্পণ্য করে নিজেদের প্রতি।  আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তোমরাই অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তাহলে তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন; অতঃপর তারা তোমাদের মত হবে না।”(৪৭:৩৮)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে পার্থিব সম্পদের প্রতি মুমিন ব্যক্তিদের একাংশের মোহ এবং তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর রাস্তায় দান না করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলছেন: শুধুমাত্র নামাজ ও রোজার মাধ্যমে ঈমানদারির পরিচয় দেয়া যাবে না বরং তোমাদের সম্পদের যাকাত দিতে হবে এবং দ্বীনকে শক্তিশালী করার জন্য জিহাদও করতে হবে। তবে যদি কেউ কৃপণতা করে যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে সে যেন না ভাবে আল্লাহ তার সম্পদের মুখাপেক্ষী। বরং মানুষই আল্লাহর মুখপেক্ষী। সে যত বেশি কৃপণতা করবে ততবেশি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর রহমত ও পুরস্কার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।

আয়াতের শেষাংশে সতর্ক করে দিয়ে বলা হচ্ছে: তোমরা একথা ভেবো না যে, তোমাদের ঈমান আছে বলে চিরকাল আল্লাহর দয়ার সাগরে ভাসতে থাকবে। তোমরা যদি আল্লাহর রাস্তায় দান করতে, ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে এবং তাঁর বিধিবিধান পালন করতে অস্বীকৃতি জানাও তাহলে তোমাদের শক্তি ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন এমন একদলকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করা হবে যারা তাঁর দ্বীন রক্ষার জন্য প্রচেষ্টা চালায় এবং তাদের সম্পদের একাংশ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে কার্পণ্য করে না।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- দান করায় কার্পণ্যের সঙ্গে ঈমানের আদায়-কাচকলায় সম্পর্ক। মুমিন ব্যক্তি কৃপণ হতে পারে না।

২- মানুষকে তার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে হবে। তাকে মনে রাখতে হবে আল্লাহ তায়ালা চূড়ান্ত অমুখাপেক্ষী। মানুষ যত ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলুক না কেন সে কখনো আল্লাহর প্রতি অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না।

৩- ঈমানদার ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য ও রহমত লাভ করবে যতক্ষণ সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও দ্বীনি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করবে। তা না হলে ঈমান কোনো পৈত্রিক সম্পত্তি নয় যে একবার অর্জন করলে আর চলে যাবে না।

৪- আল্লাহর রাস্তায় দান একটি সমাজের টিকে থাকার পূর্বশর্ত। পার্থিব জীবনের প্রতি মোহের কারণে দান করা থেকে বিরত থাকলে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং অন্য কেউ এই সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করবে। #

পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/ ০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ