ডিসেম্বর ২৫, ২০২১ ১৮:৩০ Asia/Dhaka

আশা করছি আপনারা প্রত্যেকে ভালো আছেন। গত আসরে আমরা পারস্য উপসাগরে ‘তেল ট্যাংকার যুদ্ধ’ এবং এই যুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি অংশগ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করেছি।

আজ আমরা নিরাপত্তা পরিষদের ৫৯৮ নম্বর প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য ইরানের উপর চতুর্মুখী চাপ প্রয়োগ সম্পর্কে কথা বলব। 

আমেরিকা কুয়েতের তেল ট্যাংকারগুলোতে নিজের পতাকা লাগিয়ে এগুলোকে স্কর্ট করতে শুরু করার আগ পর্যন্ত পারস্য উপসাগরে মোট ১১৭টি টেল ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়। এরমধ্যে ইরাক হামলা চালায় ৬৩টিতে এবং ইরান চালায় ৫৪টিতে।  তবে আমেরিকা জাহাজ স্কর্ট করতে শুরু করার পর এক বছরে হামলার শিকার জাহাজের সংখ্যা ১৮২টিতে উন্নীত হয়। এরমধ্যে ইরাকিরা হামলা চালায় ৮২টিতে আর ইরান পাল্টা হামলা চালায় ১০৫টি জাহাজের উপর।  অর্থাৎ কুয়েতি জাহাজগুলোতে মার্কিন পতাকা সংযোজনের পর ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায় এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা আরো বেশি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

কুয়েতি জাহাজে মার্কিন পতাকা উড়ানো যদিও সর্বোৎকৃষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল না কিন্তু আমেরিকার দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি যা নেয়া হয়েছিল সাদ্দামকে ইরানের হাতে পরাজিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। এ কাজে আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদের ৫৯৮ নম্বর প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করা। তেল ট্যাংকারগুলো স্কর্ট করার মাধ্যমে পারস্য উপসাগরে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে আমেরিকা ১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে শুরু করে।  সেটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় পর্যায়। আমেরিকা এ সময় ইরানি যেকোনো পণ্যের আমদানির পাশাপাশি দেশটিতে বহু পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করে।

১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত আমেরিকা ছিল ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। সে সময় ইরানের কাছ থেকে প্রতিদিন ছয় লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করত আমেরিকা। একইসময়ে মার্কিন সরকার ইরানের কাছে খুচরা যন্ত্রাংশ, যোগাযোগ সামগ্রী, ট্রাক্টর ও বিমানের কিছু কিছু যন্ত্রাংশ রপ্তানি করত। কিন্তু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান ১৯৮৭ সালের ১ নভেম্বর ইরানের কাছ থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। একইসঙ্গে তিনি ইরানের কাছে মার্কিন পণ্য রপ্তানির প্রক্রিয়াও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন।  ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা যাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশও মেনে চলে সে লক্ষ্যেও চেষ্টা চালাতে শুরু করে ওয়াশিংটন।

প্রথম পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এবারের নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হয়ে ইরানের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই চতুর্মুখী পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল তেহরানকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করা। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও ইরান যুদ্ধের ময়দানে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী মনে করছিল এবং ধরে নিয়েছিল, আর দু’একটা বড় ধরনের সফল অভিযান চালাতে পারলে এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী যথারীতি ইরাকের শাসনক্ষমতা থেকে সাদ্দামের অপসারণ এবং তার দেশে আগ্রাসন পরিচালনাকারী প্রতিটি শক্তিকে উচিত শিক্ষা দেয়ার সংকল্পে অটল থাকেন।

ওদিকে আমেরিকা যেমন পারস্য উপসাগরের ‘তেল ট্যাংকার যুদ্ধে’ অংশগ্রহণ করে নিজেকে সরাসরি ইরাক-ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে তেমনি শেখ শাসিত আরব দেশগুলিও এ যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান আরো স্পষ্ট করে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর ইরানি হাজিরা ৬ জিলহজ্জ্ব মক্কার বিভিন্ন স্কয়ারে ‘মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন’ করার অনুষ্ঠান পালন করতেন। কিন্তু ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে মক্কা নগরীর মুয়াবিদা স্কয়ারে ওই অনুষ্ঠান পালন করার সময় সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী চারদিক থেকে রাস্তা বন্ধ করে ইরানি হাজিদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। কাবা ও হারাম শরিফের সম্মান ও পবিত্রতা লঙ্ঘন করে চালানো ওই পৈশাচিক হামলায় প্রায় ৪০০ ইরানি হাজি শহীদ ও অপর প্রায় এক হাজার ইরানি হাজি আহত হন। হতাহতদের মধ্যে শত শত নারী হাজি ছিলেন।  সৌদি সরকার আমেরিকা ও সাদ্দাম সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইরানের উপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ওই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালায়।

আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত নিরাপদ শহর মক্কায় ইরানি হাজিদের উপর সৌদি পুলিশের বর্বরোচিত হামলার নিন্দা জানিয়ে ইমাম খোমেনী (রহ.) বলেন, “সৌদি সরকারের একটি বিষয় জেনে রাখা উচিত যে, আমেরিকা সৌদি আরবের ইতিহাসে এমন এক কলঙ্ক কালি লেপন করেছে, জমজম কূপের পানি দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত ধৌত করলেও যার দাগ মুছে যাবে না। … আমরা এই বর্বরোচিত হামলার জন্য আমেরিকাকে দায়ী মনে করছি।”

এদিকে, ইরানকে ৫৯৮ নম্বর প্রস্তাব মেনে নিতে উৎসাহিত করার জন্য ১৯৮৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব পেরেজ ডি কুয়েলার তেহরান সফরে আসেন। তার অনুরোধের জবাবে ইরান জাতিসংঘকে আগে এই যুদ্ধের আগ্রাসী শক্তিকে চিহ্নিত করার আহ্বান জানায়। ইরানে দু’দিনের সফর শেষে জাতিসংঘ মহাসচিব ইরাকে যান এবং সেখানে সাদ্দামের সঙ্গে দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন। কিন্তু সাদ্দাম এই প্রস্তাবে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনার বিরোধিতা করেন।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ