ডিসেম্বর ২৫, ২০২১ ১৯:০৮ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আমাদের অনেক অনেক আদর ও ভালোবাসা নাও। আশা করি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি নাসির মাহমুদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, আজকের আসরে তোমাদের জন্য রয়েছে একটি শিক্ষণীয় গল্প। গল্পটি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির “মসনবী” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। গল্পের পর থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও গ্রন্থনা ও প্রযোজনা করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

অনেক অনেক আগের কথা। একদিন এক লোক হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে এসে বলল: হে আল্লাহর নবী! আমি আপনার কাছে একটি আবেদন নিয়ে এসেছি। আমি চাই পশু-পাখির ভাষা শিখতে। আমি পশু-পাখির কথাবার্তা থেকে শিক্ষা ও উপদেশ লাভ করতে আগ্রহী।

মূসা নবী বললেন: এ কাজটি তোমার জন্য মঙ্গলজনক নয়। মানুষের যে ভাষা তোমার জানা আছে তা থেকেই যত পারো উপদেশ গ্রহণ কর- এটাই তোমার সারা জীবনের জন্যে যথেষ্ট হবে। কিন্তু পশু-পাখির ভাষা জানা একটি বাজে চিন্তা, লোভ-লালসার ফল। জেনে রেখো অতি লোভ মানুষকে বিপদে ফেলে।

লোকটি বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো পশু-পাখির ভাষা শিখে ব্যবসা করতে চাই না। শুধু জানতে চাই এরা কী কী কথা বলে। এ ছাড়া ওদের কথাবার্তা থেকে নিজের চরিত্র সংশোধন করাই আমার আসল উদ্দেশ্য।

হযরত মূসা (আ.) বললেন: আমার কথা শোন, এই বাজে খেয়াল ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজ করগে। অতো বেশী চালাক-চতুর হতে চেয়ো না। মনে রেখো অতি চালাকের গলায় দড়ি।

লোকটি নাছোড়বান্দার মতো বলল: হে রাসূল! আমার মনে শান্তি নেই, মনটা খালি ছটফট ছটফট করে, পশুদের ভাষা যে আমার জানতেই হবে। এ জন্যে প্রয়োজনে না হয় বিপদাপদ ও বালা-মুছিবতও মাথা পেতে নেব। আমাকে অন্ততঃপক্ষে মোরগ ও কুকুরের ভাষা হলেও শিক্ষা দেন। এ দুটোতেই আমি রাজি।

হযরত মূসা নবী বললেন: ঠিক আছে। বিপদাপদই যখন মাথা পেতে নিতে রাজি আছো তাহলে যাও, আমি দোয়া করছি, আল্লাহ তোমাকে মোরগ ও কুকুরের ভাষা শিক্ষা দিন। তবে শুনে যাও, এতে যদি তোমার কোনো ক্ষতি হয় তাতে কিন্তু আমি দায়ী নই।

লোকটি খুশিতে গদ গদ হয়ে বাড়ি চলে গেল। সারাটা রাত সুখস্বপ্নে কাটিয়ে দিয়ে ভোরে খুব তাড়াতাড়িই জেগে উঠল। চাকরকে হুকুম দিল, যাও আমার নাশতা নিয়ে এসো, সাথে সাথে ঐ কুকুর ও বড় মোগরটিকেও আনতে ভুল করো না যেন!

একজন চাকর গিয়ে মনিবের আদরের কুকুর ও বড় মোরগটি নিয়ে এলো। ইতোমধ্যে নাশতাও হাজির। মনিব দস্তরখানায় বসে নাশতা খাওয়া শুরু করল। এক টুকরা রুটি ছুঁড়ে দিল কুকুরের দিকে। রুটির টুকরা দেখামাত্রই মোরগ লাফ দিয়ে ছুটে এসে মুখে লুফে নিল।

কুকুরটি এতে আপত্তি জানিয়ে বলল: আজব বদ চরিত্রের মোরগ তো তুই। গম খাস, যব খাস, ভুট্টা খাস, মাছ খাস, কীটপতঙ্গ খাস, আরো কতো কী খাস। তুই ভালো করেই জানিস যে, ঐ সামান্য রুটি ছাড়া আমার ভাগ্যে আর কিছুই জুটে না- আর সেই এক টুকরা রুটিও লুফে নিলি!

মোরগ বলল: রাগ করিসনে ভাই। আজ ধৈর্য কর, কাল তো তোর খুশির দিন। আগামীকাল মনিবের ঘোড়াটি মারা যাবে। তখন তোর মন যত চায় গোশত খেতে পারবি। আমি তো গোশত খাই না।

কুকুর শান্ত হয়ে বলল: আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে, কথাটা আমার মনে ছিল না। যা ব্যাটা রুটি তুইই খেয়ে নে।

পাশে বসা মনিব তাজ্জব হয়ে ওদের কথা শুনল এবং মনে মনে বলল, আজব ব্যাপার, তাহলে আমার ঘোড়াটি কাল মারা যাচ্ছে। বেশ ভালোই হলো বিষয়টি জেনে গেলাম। পশু-পাখিদের ভাষা জানার ফায়দা তো এটাই! এ কথা ভেবেই মনিব ঘোড়া পালককে ডেকে পাঠাল এবং বলল, জল্‌দি ঐ ঘোড়াকে বাজারে নিয়ে যা আর যে দামে পারিস বিক্রি করে ফেল।

এ ঘটনার পরের দিন নাশ্‌তা খাওয়ার সময় মনিব ইচ্ছে করেই এক টুকরা রুটি কুকুরের সামনে ছুঁড়ে মারল। কিন্তু মোরগ এক লাফে তা লুফে নিল। কুকুর বলল: এ কি কাণ্ড, আজও নিয়ে গেলি! গতকালতো বড় গলা করে বলেছিলি মনিবের ঘোড়া মারা যাবে আর আমি মজা করে খাব। কিন্তু কই! মনিব তো ঘোড়া বিক্রি করে দিলেন। আজও তুই আমার ভাগ ছিনিয়ে নিলি, আমাকে যে দুপুর পর্যন্ত একেবারে উপোস থাকতে হবে।

মোরগ বলল: আরে ভাই আমি কি মিথ্যা বলেছিলাম? ঘোড়াটির তো মারা যাওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু মনিব তা বিক্রি করে দিলেন। ঘোড়া মরল তবে খরিদ্দারের ঘরে গিয়ে। সে যাক। যেহেতু মনিবের মালের কিছু ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল তা হবেই। শুনে রাখ আজ তার গাধাটি মারা যাবে। আর গাধার মরণ মানেই কুকুরের ঈদ। আগামীকাল তুই পেট পুরে গোশত খাবি কিন্তু আমি একটুও খাব না।

কুকুর একথা শুনে বলল, ওহো! তাই তো। আমার মোটেও স্মরণ ছিল না। ভালো কথা তাহলে রুটি আজও তোর পেটেই যাক।

মনিব কুকুর মোরগের একথা শোনামাত্রই চাকরকে ডেকে পাঠালো এবং বলল, শিগগির বাজারে যা, গাধাটি বিক্রি করে আয়।

চাকর মনিবের কথা মতো গাধাটি বাজারে নিয়ে বিক্রি করে এলো। তৃতীয় দিন ভোরে নাশতার সময় কুকুর মোরগকে লক্ষ্য করে বলল: তুই ব্যাটা একেক দিন একেক কথা বলিস আর আমাকে মিছামিছি রঙিন স্বপ্ন দেখাস। শুধু বলিস, আগামীকাল এই হবে সেই হবে। কিন্তু গোশতের কোনো খবরই নেই।  

মোরগ বলল: তুই ঠিক কথাই বলেছিস। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না মনিব কোত্থেকে এতো বড় চালাক-চতুর হয়ে গেলেন যে, প্রতিদিনই তার মালের ক্ষয়ক্ষতিকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। যাক ভাই, যার বদলা আছে তার জন্য দুঃখ করার কি আছে। শোন! ঘোড়া ও গাধার বদলে এবার মনিবের পালের চারটা কালো দুম্বা মারা যাবে। যখন ওগুলো মারা যাবে তখন তো ওসবকে তুলে নিয়ে বিলে ফেলে আসবে। তখন তুই গিয়ে যত ইচ্ছে গোশত খাবি, ব্যস।

কুকুর জবাবে বলল: আমিও তা টের পেয়েছি। কোনো কোনো ক্ষয়ক্ষতিকে একেবারে ঠেকানো যায় না, ঘোড়াকে বিক্রি করেছেন, গাধাকে বিক্রি করেছেন, এবার কালো দুম্বাগুলো মারা যাবে। ঠিক আছে আজও না হয় ধৈর্য ধরব।

মনিব মোরগ ও কুকুরের কথাবার্তা শুনামাত্রই রাখালকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, শিগগির যা, ঐ চারটে কালো দুম্বাকে বাজারে বিক্রি করে আয়। রাখাল মনিবের নির্দেশ মতো তাই করল। মনিব মনে মনে বললেন, পশু-পাখির ভাষা শেখার এই তো লাভ। বেশ খুশি হলো মনিব।

এ ঘটনার কিছুদিন পর এক সকালে নাশতার সময় মোরগ ও কুকুর যখন একত্রিত হলো কুকুর মোরগকে গালাগালি শুরু করে দিল। কুকুর বলল: আজ কিন্তু আমার পালা। এতদিন আমিও তোর মতো কিছু কিছু বিষয় বুঝেছিলাম। কিন্তু সবই মিথ্যা প্রমাণিত হলো। মনিব খুবই চালাক। যেকোনোভাবেই নিজের ক্ষতি ঠেকাচ্ছেন।

মোরগ পাণ্ডিত্যের সাথে বলল: আরে ভাই, মনিবের চালাকির ওপর এতো ভরসা করিসনে। অতি চালাকির ফল ভালো নয়। আজ তো ওসবের জায়গায় মনিব নিজেই মারা যাবেন। তখন মনিবের আত্মীয়-স্বজন ও জ্ঞাতি গোষ্ঠী দান খয়রাত করবে, পোলাও-কোর্মা বিলাবে, দুম্বা, ভেড়া, গরু কোরবানি করবে, প্রচুর নেয়ামত ও খানাদানার জেয়াফত হবে, তোর ভাগটা এবার হিসাব করে দ্যাখ।

কুকুর বলল, রাখ তোর গলাবাজি। তুই কোথেকে জানলি একথা?

মোরগ বলল, আজ শেষরাতে যখন মুনাজাত করছিলাম তখনই শুনেছি। জানিসতো মনিবের হায়াত এখনো শেষ হয়নি। তার কাছে কিছু হারাম মাল ছিল এবং তার কিছু রক্তও দূষিত ছিল। কথা ছিল মনিবের মালের ওপর দিয়েই বিপদ চলে যাবে ও ঘোড়াটি মারা যাবে। কিন্তু মনিব বড় চালাকি করে ঘোড়াটি বিক্রি করে দিলেন। এরপর কথা ছিল সেই বিপদ গাধার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে উতরে যাবে। মনিব গাধাটাও বিক্রি করে দিলেন। এরপর কথা ছিল তার চারটে দুম্বা মারা যাবে, কিন্তু তাতেও মনিব বাধ সাধলেন। ঐসব ছিল মনিবের স্বীয় জানের বিনিময়। মনিব যেহেতু সবটাতেই বাধা দিলেন সেহেতু এবার তার জানের ওপরই মুছিবত নেমে আসবে। এবার তো নিজেকে বিক্রি করতে পারবে না।

মনিব যেই একথা শুনল অমনি ভয়ে তার আত্মা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। হাতের নাশতার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে দিল ছুট হযরত মূসা (আ.)-এর বাড়ির উদ্দেশ্যে। হযরত মূসাকে দেখামাত্রই তার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল আর ফরিয়াদ করতে লাগল: হে মূসা! আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান! আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে, কপাল পুড়ে গেছে। চোখে মুখে অন্ধকার দেখছি।

হযরত মূসা তাজ্জব হয়ে বললেন: হয়েছেটা কি বলো দেখি। কিসের ভয়? এতো আতঙ্কিত কেন?

লোকটি বলল, 'ভয় অহেতুক নয়। আমি নিশ্চিত যে মাথার উপর বিপদ আসছে'। এরপর সে হযরত মূসা (সা.)-এর নিকট সবকিছু খুলে বলে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল।

হযরত মূসা নবী বললেন: বাপু! আমি তো তখনি তোমাকে বলেছিলাম পশু-পাখির ভাষা জানা তোমার জন্য ক্ষতিকর। এখন আমার করার কিছুই নেই; কারো বাঁচা-মরার এখতিয়ারও আমার হাতে নেই। তবে এখন এক কাজ করতে পার, যাও ওগুলোর ক্রেতাদের কাছে- যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে তাদের ক্ষতিপূরণ কর। যদি তারা রাজি হয় তাহলে হয়তোবা তোমার এই বিপদ কেটে যেতেও পারে।

এ কথা শুনে লোকটি উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলল বাড়ি পানে। বাড়িতে গিয়ে রাখালের কাছ থেকে জেনে নিল দুম্বা, গাধা ও উট কার কাছে বিক্রি করেছে। নাম-ঠিকানা জেনে একে একে তিন ক্রেতার কাছে গিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইল লোকটি। কিন্তু কেউই ক্ষতিপূরণ নিতে রাজি হল না। তারা জানাল- পশু মারা যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হলেও বিনিময়ে তারা বড় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। পশুর উপর দিয়ে গেছে তাদের বালামুছিবত। সে কারণে তারা ক্ষতিপূরণ নিতে রাজি নয়।

সবখানে নিরাশ হয়ে লোকটি ছুটে চলল তার বাড়ির পানে। বাড়ির কাছে এসেই দেখতে পেল দেয়ালের ওপর তার পোষা মোরগটি বসে আছে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার। মোরগকে লক্ষ্য করে বলল: এই মোরগ, আমার যাবতীয় বালা-মুছিবতের জন্যে দায়ী তুই। সারাজীবন আমার খাবার-দাবার খেয়ে কেন তুই এসব ভবিষ্যতবাণী শুনাতে গেলি?  

মোরগ জবাব দিল: আমরা আমাদের কাজ করেছি-তুই বেটা যেখানে আদম জাতির ভাষা থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করিসনে সেখানে কী কারণে পশু-পাখির ভাষা শিখতে গেলি?

এমনি সময় মনিব বেচারার অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করল। আছাড় খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। আর সাথে সাথেই জান চলে গেল জানের মালিক আল্লাহর হাতে।

বন্ধুরা, আল্লাহর রাসূল হযরত মূসা (আ.)-এর নিষেধ অমান্য করে পশু-পাখির ভাষা শেখায় লোকটার পরিণতি কেমন হলো তা জানতে পারলে আজকের গল্প থেকে। তাই আমাদের সবার উচিত নবী-রাসূলদের কথা মেনে চলা এবং তাদের আদেশ-নিষেধ ও উপদেশ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করা। আমাদের সকল কাজ-কর্ম ও অনুপ্রেরণার উৎস হওয়া উচিত নবী-রাসূলদের জীবন ও কর্ম। তো বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে এ সম্পর্কেই রয়েছে একটি গান। গানের কথা ও  সুর : কবি মতিউর রহমান মল্লিকের আর গেয়েছে শিশু শিল্পী মাইমুনা বিনতে জামাল।

বন্ধুরা, তোমরা গানটি শুনতে থাকো আর আমরা বিদাই নিই রংধনুর আজকের আসর থেকে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ