ডিসেম্বর ২৬, ২০২১ ১৮:২৯ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি এরকম: এক ব্যবসায়ী তেলের ব্যবসা করতো।

তেল কেনাবেচা করে ভালোই পয়সাপাতি করেছিল ওই ব্যবসায়ী। তার এক প্রতিবেশী ছিল সহজ সরল এবং অর্থ-প্রাচুর্যহীন দরবেশ। ওই দরবেশ কোনো কাজকাম করতো না। বরং বলা উচিত কাজকর্ম জানতো না সে। সুতরাং বেকারত্বের গ্লানি তাকে ভোগ করতে হতো। কোনো আয়-রোজগার না থাকলে যা হয় আর কি! তবে একটা ব্যাপার ছিল তার। সে ছিল খুবই সৎ এবং ভালো মনের একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ। তার এই ভালোমানুষি স্বভাবের কথা সবার মুখে মুখে ছিল।

ব্যবসায়ী যেহেতু ভালোই ধনী ছিল সে দরবেশের সততা এবং স্বচ্ছ মনের বৈশিষ্ট্যকে শ্রদ্ধা করতো এবং সে কারণে দরবেশকে প্রায়ই সাহায্য করতো। যখনই তেলের ব্যবসায় লাভ হতো দরবেশের বাসায় খানিকটা তেল পাঠিয়ে দিতো। দরবেশের দৃষ্টি একটু একটু করে পরিবর্তিত হতে শুরু করলো। মনে মনে বললো: এক ঘটি তেল কাউকে হাদিয়া দিলে কোনো লাভ নেই। তেল তো দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া হাদিয়া দেওয়ার ব্যাপারটা সাধারণত নির্ভর করে যার চাকরি বাকরি আছে, একটা আয়-রোজগার আছে। কিন্তু অন্যদের চেয়ে আমার মাঝে কীসের অভাব আছে? আমি কেন বিয়ে-শাদি করবো না? আমার কেন সন্তানাদি থাকবে না? দরবেশ এরকম চিন্তা করতে শুরু করে দিলো।

দরবেশ যেহেতু সহজ সরল জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত ছিল তাই হাদিয়ার তেল থেকে খুব কমই খরচ করতো এবং বাকি তেল একটা ঘটিতে জমাতো। জমাতে জমাতে ঘটি পূর্ণ হয়ে গেল। মনে মনে এবার দরবেশ ভাবলো: আমার তো এতো তেল দরকার নেই। আমি বরং এমন কাউকে তেলগুলো দিয়ে দেই যার প্রয়োজন আমার চেয়ে বেশি। কিন্তু তার প্রতিবেশীদের মধ্যে কারুরই তেলের প্রয়োজন নেই। দরবেশ চিন্তায় পড়ে গেল। কাকে দেবে এই তেল, কোথায় নিয়ে যাবে। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো- তেল বিক্রি করে কিছু টাকার অধিকারী হবে এবং ওই টাকা দিয়ে কোনো একটা কাজে লাগাবে যাতে কিছু আয়-রোজগার হয়। তাহলে প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে কিছু সাহায্য করা যাবে। এবার ঘটি পরীক্ষা করে দেখলো কতটুকু তেল জমা হয়েছে। পণর লিটারের মতো হবে। কত দাম পাওয়া যাবে? দুই শ তুমান তো হবেই।

তুমান হচ্ছে ইরানের মুদ্রার স্থানীয় নাম। প্রাচীনকালে তুমান খুবই মূল্যবান ছিল। এতোই মূল্যবান যে দরবেশ ওই দুই শ তুমান দিয়ে পাঁচটা মেষ কেনার কথা চিন্তা করলো। এখন তো গ্রীষ্মকাল। মেষের জন্য তরমুজের খোসা কিংবা লেটুস পাতার অভাব হবে না। চারণভূমিগুলো এখন ঘাসে ভরপুর। মেষগুলোকে ভালোভাবেই চরানো যাবে। মাস ছয়েকের মধ্যে যদি প্রত্যেকটি মেষ দুটি করে বাচ্চা দেয় তাহলে তো অনেকগুলো মেষের একটা পাল হয়ে যাবে। অন্তত পনরটি দুম্বার মালিক হয়ে যেতে পারবো। ওদের জন্য শীতকালে খাবারের লক্ষ্যে কিছু ঘাস শুকিয়ে রাখবো। ছয় মাস পর দেখা যাবে আরও বহু দুম্বার বাচ্চা হবে। প্রত্যেকটি দুম্বা যদি একটি করেও বাচ্চা দেয় তাহলে বিশটির মতো দুম্বা হয়ে যাবে।

দুম্বার হিসাব নিকাশ নিয়ে ব্যস্ত ছিল দরবেশ। ভাবলো দুম্বাগুলোকে বছর দুয়েক প্রতিপালন করবে সে। তাহলে দুম্বার পাল একটা বড় পালে পরিণত হবে। ব্যস! দুম্বার দুধ, দই, পনির, মাখন, পশম এবং বিষ্ঠা বিক্রি করবো। আহা! কতো উপকারী একটা পশু এই দুম্বা। এরপর সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সাজানো গোছানো একটা বাড়ি কিনবো এবং বড়লোকের মতো জীবনযাপন করবো। দ্রুত আমি বিখ্যাত হয়ে যাবো এবং সহজেই সম্ভ্রান্ত কোনো পরিবারের সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করতে পারবো। বিয়ের কয়েক মাস পর আল্লাহ আমাদেরকে একটা সন্তান দেবে। সন্তান ছেলে হোক কিংবা মেয়ে-কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো সন্তানকে সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আমি আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করবো আমার বাচ্চাদেরকে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিতে।

আমি যখন আরও বুড়ো হবো এবং অনুভব করবো যে সব কাজ করার মতো সক্ষমতা এখন আর নেই, তখন একজন রাখাল নিয়োগ দেবো দুম্বার দেখাশোনা করার জন্য। সে দুম্বার দুধ দোহন করবে এবং ঘরের অন্যান্য কাজকর্ম করবে। এ সময় তো আমার সন্তানেরা দুষ্টুমি করতে শিখবে, খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আমার সন্তান যখন ছয় বছরে পৌঁছবে দুষ্টামি করতে গিয়ে দুম্বাগুলোকেও পেটাতে পারে এমনকি জখম করতে পারে। ওরা দুম্বার পিঠে চড়ে বসতেও পারে। অবশ্য ওই বয়সের বাচ্চারা তো বুঝতে পারার কথা নয় যে দুম্বা এমন এক পশু যে পশুর পিঠে সওয়ার হওয়া যায় না। বাচ্চারা দুম্বার পিঠে চড়ে বসলে রাখালের দায়িত্ব হবে ওদেরকে সহজ সুন্দরভাবে নরম সুরে আদর করে বুঝানো যে এই পশুর পিঠে চড়তে হয় না। কিন্তু রাখাল তো তা না করে রেগেমেগে আমার সন্তানকে মেরেও বসতে পারে। তাহলে তো আমার রাগ হতে পারে। রাখাল যে লাঠি দিয়ে আমার সন্তানকে মারবে ওই লাঠি দিয়েই আমি রাখালকে মেরে বসবো।

সরল মনের নিরীহ দরবেশ এভাবেই কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গেল। রাখালকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে, ওকে পেটাতে গিয়ে লাঠিটাকে পিঠের ওপর তুলে সাংঘাতিকভাবে ব্যাপক শক্তি দিয়ে আঘাত করলো। ওই আঘাত গিয়ে পড়লো তেলের পাত্রের ওপর। পাত্র স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে গেল এবং জমানো তেল ছিটকে পড়লো দরবেশের গায়ে, মাথায়, জামায় সর্বত্র। অমনি দরবেশ কল্পনার রাজ্য থেকে সম্বিৎ ফিরে পেল এবং কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হলো।

বুঝতে পারলো কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝে অনেক বড় ফারাক রয়েছে। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো দরবেশ। মনে মনে বললো: তেলের পাত্র না ভেঙে যদি সত্যিসত্যি রাখালের মাথা ফাটাতাম তাহলে সারাজীবন হয়তো জেলেই কাটাতে হতো। ওই বিপদ থেকে মুক্তি পেয়ে দরবেশ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালো।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ