ডিসেম্বর ২৮, ২০২১ ১৯:৪২ Asia/Dhaka

গত কয়েকটি আসরে আমরা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক প্রদেশ জাহেদান সফর করেছি। আশা করি আপনাদের মন্দ লাগে নি। আগেই বলেছি ইরান একটি রূপবৈচিত্রময় প্রকৃতির দেশ।

এর একেকটি প্রদেশ একেক রকম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। যুগে যুগে এদেশে বিভিন্ন রাজা-বাদশা শাসন করেছেন। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হয়ে আছে ইরানের মাটি।

তাদের সেইসব কীর্তি আর প্রকৃতির স্বাভাবিক দান এখন ইরানের গর্ব। গত পর্বে আমরা জাহেদানের নামকরা একটি গ্রাম লাদিজে গিয়েছিলাম। সেখানকার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, উপভোগ্য আবহাওয়া, ঐতিহাসিক স্থাপনা, যাদুঘর ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। আজকের আসরে আমরা যাবো এই প্রদেশেরই আরেকটি বিস্ময়কর নিদর্শন 'পোড়াশহরের' দিকে। এই শহরটি সত্যিই দৃষ্টি-মনন অবাক করা একটি নিদর্শন।

'পোড়াশহর' এখানকার মানে জাহেদান শহরের আরেকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। সিস্তান থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে প্রাদেশিক মূল শহর যাহেদানের দিকে যেতে পোড়াশহরটি পড়ে। পোড়াশহরটি খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ২২০০ সাল পর্যন্ত সিস্তানের রাজধানী ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালে এটি ছিল বিশ্বের সবচে বড়ো শহর এবং তৎকালীন প্রাচ্য সভ্যতার কেন্দ্র। এখানকার কিছু কিছু নিদর্শন এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এই পোড়া শহরটিতে খনন কাজ চালিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের খনন কাজের ফলে কিছু স্থাপত্য নিদর্শন এবং চতুর্ভুজ আকৃতির কিছু ভবনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এখানে। এগুলো ছয় থেকে দশ রুম বিশিষ্ট।

রুমগুলো অবশ্য পৃথক পৃথক। ছোট ছোট দেয়াল দিয়ে একটি রুমকে অপরটি রুম থেকে আলাদা করা হয়েছে। এছাড়া দরোজা-জানালা,সিঁড়ি,ইট তৈরির চুল্লি,নকশা করা মাটির পাত্র, কাঠ-পাথর এবং স্টিলের বিচিত্র সামগ্রীও পোড়াশহর খনন করে পাওয়া গেছে।হামুন ও হিরমান্দ হ্রদের পাশে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই শহরের মর্যাদাই অন্যরকম। প্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন এই পোড়াশহরটি।

আমেরিকার বিখ্যাত ইরানবিদ রিচার্ড এন. ফ্রেই ইরানের সিস্তানে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই বিস্ময়কর নিদর্শনটি পরিদর্শন করে এই ভূখণ্ড সম্পর্কে তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন: সিস্তান হলো পুরাতত্ত্ববিদ গবেষকদের জন্য একটি বেহেশত।পুরাতত্ত্ববিদরা যেসব গবেষণামূলক খননকাজ চালিয়েছেন এই প্রাচীন স্থাপনাটিতে সেইসব গবেষণায় দেখা গেছে: পাঁচ হাজার বছর আগে এই শহরটি ছিল বাণিজ্য ও সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।এখানে এরকম একটি শহর গড়ে ওঠা কিংবা একটি সভ্যতার গোড়াপত্তনের পেছনে নি:সন্দেহে হামুন ও হিরমান্দ হ্রদের অস্তিত্ব অন্যতম কারণ।

পোড়াশহরটি কিন্তু এখন আর আবাসিক কোনো এলাকা নয়। বর্তমানে এটি কেবল একটি প্রাচীন সাইটের নাম।  বলা যায় পরস্পর সংযুক্ত এবং বেশ প্রশস্ত একটি টিলাগুচ্ছের নাম। পোড়াশহরটি জাবোল শহরের দক্ষিণ-পূর্বে জাবুল-জাহেদান সড়কের পাশে অবস্থিত। শহরটি খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার দুই শ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং হঠাৎ খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার দুই শ বছর আগে অদৃশ্য হয়ে যায়। লেন বিট নামে একজন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা এই শহরটি দেখার পর তাঁর স্মৃতিকথায় এই শহরের উল্লেখ করেছেন। তিনিই এই শহরটির নাম 'বার্ন সিটি' মানে পোড়া শহর বলে স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন।  তাঁর ভাষ্যমতে তিনি এই শহরে অগ্নিকাণ্ডের বহু নিদর্শন দেখেছেন যা শহরটির ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকতে পারে।

পোড়াশহর নিয়ে কথা বলছিলাম।প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে লেন বিটের দেওয়া তথ্যের চেয়ে ভিন্নরকম তথ্যও পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে যে এই শহরটি ধ্বংসের মূল কারণ আগুন বা অগ্নিকাণ্ড নয়। বরং এই শহর ধ্বংসের মূল কারণ হলো দুটি উপাদান। একটি পানি এবং অঅরেকটি বাতাস। বছরের পর বছর ধরে এই সভ্যতা ধ্বংস করেছে এই পানি এবং বাতাস। অনন্য এই প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটটি বিখ্যাত ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার অরেল স্টেইন প্রথমবারের মতো অনুসন্ধান করেছিলেন। এ নিয়ে বেশ গবেষণা করেন তিনি। পোড়া শহরে পাওয়া জিনিসগুলি বিচিত্র ধরনের।

পোড়া শহরের অর্ধেকেরও বেশি উপাদানের মধ্যে রয়েছে ভাঙা মৃৎশিল্প,পাথর,ধাতু ইত্যাদি। যদিও এই প্রাচীন সাইটের ছোট্ট একটি অংশের সন্ধান পাওয়া গেছে তবু এখন পর্যন্ত খুব যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো বেশ মূল্যবান। অন্যান্য জিনিসগুলির মধ্যে চার হাজার আট শ বছরের পুরানো একটি কৃত্রিম চোখ পাওয়া গেছে এই পোড়া শহরে। এই কৃত্রিম চোখটি পঁচিশ কিংবা ত্রিশ বছর বয়সী একজন মহিলার বলে মনে করা হচ্ছে যাকে এই পোড়া শহরের একটি কবরে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। মজার এই ঐতিহাসিক তথ্যটি বিশেষজ্ঞদের জন্য খুবই মূল্যবান।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ