জানুয়ারি ১৪, ২০২২ ১৫:৩৭ Asia/Dhaka
  • মসনবীর গল্প: সরল উট মালিক

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভালো ও সুস্থ আছো। সপ্তাহ ঘুরে রংধনুর আসর সাজিয়ে তোমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছি আমি নাসির মাহমুদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই হিজরী সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত ইরানি কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির নাম শুনেছো। তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে মসনবী। মাওলানা রুমি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এ গ্রন্থটি রচনা করেন।

মসনবী হলো সমুদ্রের মতো সীমাহীন বিস্তৃত একটি গ্রন্থ। সমুদ্রের সম্পদের যেমন শেষ নেই তেমনি মসনবীর রয়েছে নতুন নতুন মুক্তা। আটশ' বছর আগের এই গ্রন্থে রূপকধর্মী গল্প, রহস্যময় গল্প, আধ্যাত্মিক গল্প, শিক্ষণীয় এবং নৈতিক অনেক গল্প রয়েছে।

বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা মসনবী শরীফ থেকে একটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে একটি গান। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। 

এক দেশে এক বিলাসী, পেটুক, নিষ্কর্মা ও বেখেয়ালী লোক ছিল। সে সবকিছু ভোগ করতে চাইত কিন্তু কোনো কাজই জানত না। এর ওপর লোকটি ছিল চরম অলস; যাকে বলে অপদার্থ। শেষ পর্যন্ত বাবার দিয়ে যাওয়া সহায় সম্পদ জমিজমা সব খুইয়ে কিছু কাল কাটিয়ে দিল ঋণ করে ও ফেরত না দিয়ে। এছাড়া বন্ধক রেখে অর্থ গ্রহণ, জামিনে ঋণ গ্রহণ, ফাঁকি, প্রতারণা ও বাটপারি করে তার কিছুকাল কাটে।

কয়েকবার সে মহাজনদের নিকট থেকে ব্যবসায়ীদের জামিন রেখে জিনিসপত্র এনে অর্ধেক দামে তা বাজারে বিক্রি করে এবং সেই অর্থ কয়েকদিনের মধ্যে খেয়ে দেয়ে শেষ করে দেয়। কয়েকবার মহল্লা পাল্টিয়ে বাড়ি ভাড়া করে থেকেছে। তখন প্রতিবেশীর আসবাবপত্রের দোকান থেকে বাকিতে আসবাবপত্র কিনে হঠাৎ আসবাবপত্রসহ উধাও হয়েছে।

আরো কয়েকবার এদিক সেদিক দোকান খুলেছে ও আমানত হিসেবে দ্রব্য সামগ্রী এনে এক ফাঁকে সব বিক্রি করে দিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। এভাবেই এই টাউট ব্যক্তি মানুষের টাকা-পয়সা, সহায় সম্পদ ভোগ করতো।

অতি চালাকের যেমন গলায় দড়ি তেমনি একবার এক পাওনাদার তাকে বাগে পেয়ে ধরে নিয়ে গেল শহরের কাজীর কাছে। কাজীর নির্দেশে শহরের শাসক তাকে জেলখানায় আটক করল। গণপ্রতারক টাউট জেলখানায় আটকা পড়েছে শুনে চারদিক থেকে পাওনাদাররা জমা হলো এবং মামলা দায়ের করল। সবাই যখন তার অসৎ চরিত্রের কথা জেনে গেল তখন একজনও তাকে আর সুযোগ দিতে রাজি হলো না। কেউ তার জন্যে জামিন হতেও রাজি নয়। এভাবেই এ দেউলিয়া প্রতারক বহুদিন জেল খাটল।

টাউট কিন্তু জেলখানাকেই তার জন্য শান্তির জায়গা বলে মনে করল। কারণ শহরে কেউ তাকে ইজ্জত-সম্মান দিচ্ছে না। সবাই তাকে হেয় করে, পাওনা টাকাপয়সা মালমাত্তা চায়, তেড়ে মারধর করতে আসে। তাই তার কাছে জেলখানাই আরামের জায়গা বলে বিবেচিত হলো। সে মনে মনে বলল, আমার তো কিছুই নেই। থাকার মতো শরীরটা আছে, তাও জেলখানার পোশাকে ঢাকা। এছাড়া আছে পেট, পেটও জেলের খানায় ভরাট হচ্ছে। তাই সে জেলখানাতেই নির্বিঘ্নে মনের সুখে থাকতে লাগল।

কিন্তু কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। মানুষের বদ অভ্যাসও আপনা আপনি বদলায় না। এই টাউট এবার জেলখানাতেও শুরু করল চুরি-ডাকাতি ও ফাঁকি-প্রতারণা। জেলের কয়েদীদের মালমাত্তায় হাত দিতে লাগল। কারো নাস্তা খেয়ে ফেলে, কারো রাতের খানা নিয়ে যায় এবং কোথাও কারো কাছে খানাপিনা দেখতে পেলে তা চুরি না করা পর্যন্ত তার মন ছটপট করতে থাকে।

লজ্জাশরম ও ইনসাফকে একেবারেই সে ভুলে গেছে। দয়ামায়া তার কাছে অজানা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার জিহ্বা ও পেট ছাড়া জগতে সে অন্য কিছুই দেখতে পেত না। শেষ পর্যন্ত জেলখানার কয়েদীরাও তার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। সবাই মিলে জেল-দারোগার কাছে নালিশ করল যে, এ বজ্জাতের যন্ত্রণায় তারা জেলের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট ও পরিশ্রমকে পর্যন্ত ভুলে গেছে। খবর পেয়ে কাজী এলো জেলখানায়।

কয়েদীরা কাজীকে বলল, “আমাদের জন্য কি জেলের কষ্ট যথেষ্ট নয় যে, এই বদমায়েশকে আমাদের ওপর গজব হিসেবে পাঠিয়েছেন? যা পায় তাই খায় সে। জেলে কেউ আর তার কারণে শান্তি পাচ্ছে না। দয়া করে একে এখান থেকে দূর করুন অথবা যেকোন উপায়ে তার অনিষ্টতা থেকে আমাদের নাজাত দিন।”

কাজী কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে বললেন, “তোমরা হক কথাই বলছো। সাধারণতঃ জেলখানা তাদেরই উপযুক্ত স্থান যারা জেলখানায় কষ্ট অনুভব করে। কিন্তু জেলখানা যার কাছে খুশির ব্যাপার, আরামদায়ক সে জেলে থেকে কক্ষণো মানুষ হবে না। বরং বিনা পয়সায় খাওয়া-দাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাকে জেল থেকে বের করতেই হবে এবং যে করেই হোক তাকে দিয়ে পরিশ্রম করাতে হবে। তাকে কারখানার কঠিন কাজে পাঠাব।”

কাজী দেউলিয়া টাউটকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, “পাওনাদারদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য তোকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিতে হবে।”

দেউলিয়া বলল, আমি একজন দেউলিয়া। সাত আসমানের নিচে আমার এক মুঠো মাটিও নেই। দেউলিয়ার আশ্রয় এবার আল্লাহ।”

কাজী:  “তুই যদি দেউলিয়া হয়ে থাকিস তাহলে কোনো কথাই নেই। তবে তুই যে দেউলিয়া এ ব্যাপারে কয়েকজনকে সাক্ষ্য দিতে হবে।”

দেউলিয়া: “জেলখানার সবাই সাক্ষী। এছাড়া আমার আর কোন সাক্ষী নেই।”

কাজী: “জেলখানার সবাই অপরাধী। অপরাধীদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাও কিনা তারাই তোর বিরুদ্ধে একযোগে নালিশ করেছে।”

দেউলিয়া: “সে যাই-হোক, আমার কিছুই নেই। জেলখানার চেয়ে ভালো জায়গাও আমি খুঁজে পাবো না।”

কাজী: “জেলখানা হলো শাস্তির জায়গা, কষ্টের জায়গা। কিন্তু তুইতো এখানে শান্তি পাচ্ছিস। এতে তোর শাস্তি হবে কি করে? আমি তোকে জিন্দানখানা থেকে বের করব। আর যেহেতু দেউলিয়া হওয়াতে শরম পাচ্ছিস না সেহেতু তোকে সারা শহরে ঘুরাব যাতে কেউ আর তোকে কোনো ঋণ না দেয়। হয় কাজ করে রুটি রুজির ব্যবস্থা করবি নয়তো আমরা তোকে কঠোর কাজে লাগাবো কিংবা ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলাব।”

কাজী হুকুম দিলেন দেওলিয়া লোকটিকে যেন শহরের বড় ময়দানে নিয়ে যাওয়া হয়। কাজীর হুকুমে লোকটাকে যখন শহরের বড় ময়দানে আনা হলো, তখন দেখা গেল আগে থেকেই শহরের বহু লোক সেখানে উপস্থিত হয়েছে। কাজীর প্রতিনিধি বললেন: এ ব্যক্তিকে কোনো গাধা, গরু বা উটের ওপর সওয়ার করাতে চাই এবং রাত অবধি শহরের সব জায়গায় ঘুরাব এবং মানুষকে বুঝাব যে, এ লোকের কোনো কিছুই নেই।

ঠিক এমন সময় ঐখানে এক কাঠুরিয়া উপস্থিত হলো এবং উটের পিঠ থেকে লাকড়ির বোঝা মাটিতে নামিয়ে উটের রশি ধরে তা ময়দানের মধ্যস্থলে আনলো এবং কাজীর প্রতিনিধিকে বলল: “এই নাও উট। এর পিঠে তাকে সওয়ার করো।”

কাজীর প্রতিনিধি বলল: “না, তুই বরং তোর নিজ কাজেই ফিরে যা। আমরা এমন উট বা গরু কিংবা গাধা খোঁজ করছি যা বেকার।”

কিন্তু সরলমতি উট মালিক একেবারে নাছোড়বান্দা। সে বলল, “এই উট অন্য সবার চেয়ে ভালো”। এরপর সে কাজীর প্রতিনিধিকে কিছু হাদিয়া দিল যাতে তার কথায় রাজি হয়ে যায় ও তার উটকেই বাছাই করে।

দেউলিয়াকে কাঠুরিয়ার উটের ওপর সওয়ার করা হলো। এরপর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরে ঘুরানো হল। ঘোরানোর সময় ঘোষক উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দিতে লাগল: “হে জনতা, ভালো করে তাকিয়ে দেখো। এই ব্যক্তি হচ্ছে দেউলিয়া, তার কিছুই নেই। এ যাবত বহু মানুষের টাকা-পয়সা সে নষ্ট করেছে। কাজী প্রমাণ পেয়েছেন যে, সে এখন দেউলিয়া। এরপর থেকে তাকে যদি কেউ ঋণ দাও কিংবা বাকিতে কিছু বিক্রয় করো তাহলে অনাদায়ে কাজীর দরবারে নালিশ করার কোনো হক থাকবে না। তাকে ভালো করে দেখো ও চিনে রেখো।”

এভাবে প্রতিটি অলিগলিতে উট থামিয়ে ফার্সি, কুর্দি, লোরি ও তুর্কি ভাষায় ঐ কথা কয়টি লোকজনকে বুঝানো হয়। সরল মতি উটের মালিকও উটের সাথে সাথে সারাক্ষণ ঘুরতে থাকল।

রাত ঘনিয়ে আসলে দেউলিয়াকে কাজীর প্রতিনিধি সেই বড় ময়দানে এনে উট থেকে নামিয়ে ছেড়ে দিল। উটকে উট মালিকের নিকট তুলে দিয়ে সরকারী লোকজন চলে গেল যার যার পথে।

শহরের বহু লোক তখনানো দেউলিয়ার চারপাশে জমা হয়ে তামাশা দেখছে। দেউলিয়া যেই ভীড় ঠেলে বেরোবার পথ খুঁজছে সরলমতি উট মালিক তার জামা টেনে ধরল এবং বলল: “বাপু, দেখতে পাচ্ছ রাত অনেক হয়েছে। আমার পথও অনেক দূর। সারাদিন বেচাকেনা আর রোজগার কিছুই করিনি। লাকড়িও বিক্রি করা হলো না। সেই সকাল থেকে এখন পর্যন্ত আমার উটেই সওয়ার হয়ে ঘুরেছো। আমি বলছি না যে, আমার ও উটের খরচ দাও। তবে সামান্য কিছু খড়কুটো বা ঘাস কিনে দাও যাতে উটটি উপোস না থাকে।”

দেউলিয়া লোকটি বলল, “দেখো এই লোকের কাণ্ড দেখো! তাহলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা কী করলাম? কি ঘোষণা দেয়া হলো? ব্যাটা বোকা কোথাকার! তোর কি চোখ কান সাথে ছিল না? বুদ্ধি জ্ঞান কোথায় ছিল? আমি যে দেউলিয়া, কপর্দকশূন্য, ভিক্ষুক, নিঃস্ব, ইজ্জতহীন- সে ঘোষণা তো আসমানেও গিয়ে পৌঁছেছে। আর শহরের বাচ্চারা পর্যন্ত জেনে গেছে যে, আমার কিছুই নেই। তুই কি এখনো তা বুঝতে পারলি না?”

উট মালিক: “আমি এসব কিছু বুঝি না। আমি শুধু এটিই জানি যে, সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তুমি আমার উটের পিঠে চড়ে শহর ঘুরেছো। আমার পাওনা আমাকে দিতেই হবে। তা না হলে তোর ইজ্জত-সম্মান নষ্ট করব।”

দেউলিয়া: “সত্যি তুই ব্যাটা আমার চেয়েও হতভাগা আর অন্যান্য পাওনাদারের চেয়ে বেশি লোভী। আমার সাথে যারাই লেনদেন করেছে সবাই তাদের লোভের কারণে ও বেশি লাভের লোভে ফাঁদে পড়ে ঠকেছে। কারণ, তারা দেখেছে যে, আমি প্রয়োজনীয় দ্রব্য দ্বিগুণ দামে তাদের কাছ থেকে বাকিতে ক্রয় করেছি, আয়ের চেয়ে শতগুণ বেশি খরচ করেছি। তবু বেশি লাভ হওয়ার লোভে বাকিতেই আমাকে জিনিসপত্র ধার দিত। তারা ভাবত, আমার নিশ্চয়ই সহায় সম্পদ কিছু আছে। কিন্তু তুই সেই সকাল থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার বার শুনেছিস যে, আমার কিছুই নেই, এরপরও বুঝতে পারলি নে? ব্যাটা আহাম্মক কোথাকার! আমার টাকাই যদি থাকতো আর টাকা পাওনাদারদের ফেরত দেয়ার স্বভাবও যদি থাকতো তাহলে কি এতো অপমান ও বেইজ্জতি সারাদিনভর সইতে হতো? যা ব্যাটা, যদি এরপরও তোর নালিশ করার কিছু থাকে তবে কাজীর কাছে যা।”

দেওলিয়া লোকটির যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে সরল উটের মালিকের আর কিছুই বলার থাকল না। নিজের বোকামির জন্য আফসোস করতে করতে সেখান থেকে চলে গেল।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে একটি শিশুতোষ গান। 'আমরা শিশু' শিরোনামের এই গানটিতে শিশুদের মনের কথা ও তাদের চাওয়া-পাওয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। গানটির গীতিকার ও সুরকার লিটন হাফিজ চৌধুরী। আর গেয়েছে শিশুশিল্পী জাইমা নূর, নাবিহা নূর, পারিশা, মাহদিয়া, সোবহান, ওসমান, রাহি, সাদিয়া, তাহনিক, তাশফিক, তাশদিদ, বাপি, হাসান ও হুসাইন।

একঝাঁক ছোট্টবন্ধুর পরিবেশিনায় গানটি শুনলে। আশা করি তোমাদের ভালো লেগেছে। তো, বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকে আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো পরবর্তী আসরে। সে পর্যন্ত তোমরা সবাই ভালো ও সুস্থ থেকো।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ