জানুয়ারি ১৫, ২০২২ ১৭:৪২ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা ইরাকের হালাবজা শহরে সাদ্দাম বাহিনীর রাসায়নিক বোমা হামলা নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ আমরা ইরাকের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং দেশটির রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে যাওয়া সম্পর্কে আলোচনা করব।

ইরাকি শাসক সাদ্দাম টানা ছয় বছর ইরানের ছোট-বড় নানা অভিযানে পরাজিত হওয়ার পর অবশেষে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পরাশক্তিগুলোর পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করে। সে সময় ইরান সাধারণত বড় অভিযানগুলো জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের দিকে পরিচালনা করত। কিন্তু যুদ্ধের শেষ বছরে এসে একই সময়ে ইরান কোনো অভিযান পরিচালনা না করায় লন্ডনের বিবিসি রেডিও তাদের কথিত পর্যবেক্ষকদের বরাত দিয়ে জানায়, “এ বছর ইরান বড় কোনো অভিযান চালাতে পারবে বলে মনে হয় না।” ওদিকে ভয়েস অব আমেরিকাও এক প্রতিবেদনে জানায়, “মনে হচ্ছে এ বছর ইরান আগের বছরগুলোর মতো বড় কোনো অভিযান চালাতে পারবে না। হয়তো বা কোনো অভিযানই চালাতে পারবে না। প্রচণ্ড শীত ও তুষারঝড়ের মতো বৈরি আবহাওয়ার কারণে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো অভিযান চালানোকেই অসম্ভব মনে হচ্ছে।”

এদিকে যুদ্ধের অষ্টম বছরে ইরান দক্ষিণ ফ্রন্ট দিয়ে ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে না পারলেও উত্তরাঞ্চল দিয়ে ওয়ালফাজর-১০ এর মতো বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করে।  এ অবস্থায় ইরানকে মোকাবিলা করার জন্য ইরাক সরকারের সামনে দু’টি পথ খোলা ছিল। নিজের সেনাবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করে ইরানি যোদ্ধাদের অগ্রাভিযান প্রতিহত করা। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে ইরাক যদি দক্ষিণাঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করে উত্তরাঞ্চলে নিয়ে যায় তাহলে ইরানের পক্ষে দক্ষিণ ফ্রন্ট দিয়ে আবার হামলা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু ইরাকের সামনে থাকা দ্বিতীয় উপায়টি ছিল তুলনামূলক সহজ। দক্ষিণাঞ্চলে মোতায়েন সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে ইরানের হাতে দখল হয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা। ইরান যেহেতু তার সেনাবাহিনীকে উত্তরাঞ্চলে মোতায়েন রেখেছে, কাজেই দক্ষিণাঞ্চলে দেশটির মোতায়েন করা সেনা এখন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত রয়েছে।

ইরাকি শাসক সাদ্দাম ভেবেছিলেন, এই সুযোগে ইরানের বিভিন্ন শহরে রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপ করে ইরানি সেনাবাহিনীর মানোবল ভেঙে দেয়া সম্ভব হবে।  এ কারণে ইরাক ইরানের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী শহরের পাশাপাশি ইরাকের হালাবজা শহরে ভয়াবহ রাসায়নিক বোমা হামলা চালায়। সাদ্দাম সঠিকভাবেই ধরে নিয়েছিল, অতীতের হামলাগুলোর মতো এবারের রাসায়নিক হামলা নিয়েও বিশ্বের কোনো হৈ চৈ হবে না। সাদ্দামের ভাবনা সঠিক প্রমাণিত হয় তখন যখন মানবাধিকারের কথিত রক্ষক পশ্চিমা সরকারগুলো হালাবজার নিরপরাধ নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপর চালানো ভয়াবহ গণহত্যা সম্পর্কে রহস্যজনক নীরবতা অবলম্বন করে।  

ইরাকি বাহিনী ‘শুধুমাত্র আত্মরক্ষা করার’ নীতি থেকে সরে গিয়ে ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে আক্রমণাত্মক অবস্থানে গিয়ে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। এর আগেই ইরাকি শাসক সাদ্দাম ১৯৮৭ সালের শেষদিকে ইরাকি বাহিনীর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে নিয়েছিল। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ইরাকি সেনাবাহিনীর সদস্যা সংখ্যা আগের চেয়ে দেড় লাখ বাড়ানো হয়। সাদ্দাম তার সেনাবাহিনীর সাতটি কোরকে এই নির্দেশ দেন তারা যেন আলাদা আলাদা অভিযান চালিয়ে ইরানের হাতে দখলীকৃত ইরাকি ভূখণ্ডগুলো পুনরুদ্ধার করে। ইরাকি বাহিনী পূর্ণ উদ্যোমে আক্রমণ চালানোর ফলে এতদিন যে ইরান যেকোনো সংঘাতের স্থান ও সময় নির্ধারণ করত তার পক্ষে আর যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ইরাকি বাহিনী একই সময়ে সাতটি ফ্রন্টে হামলা চালানোর কারণে আত্মরক্ষা করাই ইরানের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। নতুন করে কোনো অভিযান চালানোর চিন্তা করারও সুযোগ থাকে না।

এ সময় সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যার দিক দিয়ে যেমন ইরাকের সঙ্গে ইরানের আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল তেমনি অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে ইরান ছিল অনেক পিছিয়ে। ইরানের যুদ্ধবিমানগুলোর বেশিরভাগই ছিল সেকেলে ও ব্যবহার অনুপযোগী। পারস্য উপসাগরে মোতায়েন ইরানের যুদ্ধজাহাজগুলি থেকেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ইরানের যেসব যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ছিল উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ও প্রস্তুতির অভাবে সেসব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে পারস্য উপসাগরে আমেরিকা ইরানের পক্ষ থেকে তেমন কোনো হামলার মুখোমুখি হয়নি। আমেরিকার উদ্বেগ ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পক্ষ থেকে মোতায়েন করা সিল্কওয়ার্ম ক্ষেপণাস্ত্র, আইআরজিসি’র দ্রুতগামী গানবোট ও পারস্য উপসাগরে ভাসমান ওয়াটার মাইন।

এ সময়ে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের অভাবও যুদ্ধে ইরানের সুবিধাজনক অবস্থানে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ৫৯৮ নম্বর প্রস্তাব পাস, আমেরিকার পক্ষ থেকে কুয়েতি তেল ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা প্রদান, পারস্য উপসাগরে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া, উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টে ইরানের পক্ষ থেকে চালানো কয়েকটি অভিযান এবং ইরাকের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি- ইত্যাদি ঘটনা থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ফল বেরিয়ে আসেনি। তবে এসব ঘটনায় পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। ১৯৮৮ সালের ১৭ এপ্রিল ইরাকি বাহিনী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় ফাও দ্বীপ পুনরুদ্ধারের অভিযান শুরু করে। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ওই দ্বীপ ইরান নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ