মার্চ ২৭, ২০২২ ২১:৫৩ Asia/Dhaka
  • অধ্যাপক রুহুল আমীন
    অধ্যাপক রুহুল আমীন

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। একইসাথে চলছে আলোচনা। বিশ্ব এখন ইউক্রেন ইস্যুতে পাখির চোখ করে আছে। পাল্টাপাল্টি কথা চালাচালি চলছে, চলছে হুমকি-ধমকি। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ এবং বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহা.রুহুল আমীন রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বললেন, এতদিন আমেরিকা এবং পাশ্চাত্য ল্যাটিন আমেরিকাসহ অ্যফ্রো এশিয়া এবং অন্যান্য জাতি রাষ্ট্রের ওপর যে নির্যাতন, অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছে সেটাই এখন তাদের দিকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

একটি উদাহরণ দিলে এমন দাঁড়াবে যে একটি বন্দুক যা অন্যের দিকে তাক করা ছিল এখন সেটি তাদের দিকেই তাক করা। ইউক্রেন-রাশিয়ার যে যুদ্ধ কিংবা সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে এবং চলছে তা কেবল ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমি এটাকে বিশ্ব যুদ্ধে রূপ নেয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছি না।

বিশিষ্ট এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আরো বলেন, জ্ঞানের জগতে পাশ্চাত্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন রেডিও তেহরানে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক রুহুল আমীন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। থামার নাম নেই, একমাস গড়িয়ে গেছে। রাশিয়ার সামরিক অভিযান শেষ হওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে দু'পক্ষের আলোচনা চলছে। তো এ যুদ্ধ আসলে কোন দিকে যাচ্ছে, এ যুদ্ধ কি প্রলম্বিত হবে নাকি দু'পক্ষ খুব শিগগিরিই যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে? কি হচ্ছে আসলে?

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘ হতে পারে

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: দেখুন, আমি শুরুতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিষয়ে যে-কথা বলতে চাই সেটি হচ্ছে, এই যুদ্ধ আসলে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তত্ত্বায়নের যে বিভ্রাট অর্থাৎ (ইউরো আমেরিকা) পাশ্চাত্যের দ্বারা যে তাত্ত্বিক সন্ত্রাস তারই ফল। তারা ল্যাটিন আমেরিকাসহ অ্যাফ্রো এশিয়া এবং অন্যান্য জাতি রাষ্ট্রের ওপর যে নির্যাতন, অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছে সেটাই এখন তাদের দিকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একটি উদাহরণ দিলে এমন দাঁড়াবে যে একটি বন্দুক যা অন্যের দিকে তাক করা ছিল এখন সেটি তাদের দিকেই তাক করা। অন্যভাবে বললে বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকাসহ পাশ্চাত্য তাদের স্বার্থে তাদের মতো করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক  ও সামাজিক সুবিধার জন্য একপেশে পাশ্চাত্যমুখী যে নীতি তত্ত্ব ও বাস্তবে প্রয়োগ ঘটিয়েছিল তারই ফলশ্রুতি আজকের পরিস্থিতি। দেখুন এটি আমার একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক রুহুল আমীন, আপনি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পাশ্চাত্য সন্ত্রাসের কথা বলছিলেন, আফ্রো এশীয়ার দেশগুলোর উপর যে নির্যাতন চালিয়েছে সেটিই এখন বুমেরাং হয়েছে। তো এর প্রায়োগিক ব্যখ্যা কি হতে পারে?

বিশ্বযুদ্ধে রুপ নিতে পারে ইউক্রেন সংঘাত

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: আমরা যদি বিষয়টির প্রায়োগিক দিকে যাই তাহলে দেখব, ইউক্রেন-রাশিয়ার যে যুদ্ধ কিংবা সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে এবং চলছে তা কেবল ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক দুটি রূপ আছে। আমরা যদি ব্যষ্টিক দিকটি দেখি তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যুদ্ধ তত্ত্ব এশীয়া এই আফ্রিকায় যেটি আছে তা প্রাচ্যকেন্দ্রীক। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছে প্রাচ্যের ওপর এসব যুদ্ধ সন্ত্রাস পাশ্চাত্য চাপিয়ে দিয়েছি। তবে এখন তার পরিবর্তন এসেছে বলে আমার মনে হয় এবং মোড় ঘুরে এখন তা পাশ্চাত্যের দিকে চলে যাচ্ছে। আগের ঐ পরিস্থিতির স্থান পরিবর্তন করে এখন তা পশ্চিম এবং পূর্ব ইউরোপসহ, আমেরিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার এলাকাগুলোতে সম্প্রসারিত হয়েছে। আর এই সম্প্রসারিত এলাকায় যুদ্ধ হবে। আর এই যুদ্ধ তাদের ভেতরে শুরু হয়ে কেবল তাদের ভেতরই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তৃতীয় বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। আমি আজকে এই সম্ভাবনাকে নাকচ করছি না যে আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে বৃহৎ পরিসরে আন্তর্জাতিক অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধে রুপান্তর ঘটতে পারে।

আপনারা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীনের সাক্ষাৎকার শুনছিলেন। ফিরছি খুব শিগগিরি। আমাদের সাথেই থাকুন।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক রুহুল আমীন, মিউজিক বিরতির আগে আপনি ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্তমান যুদ্ধ পূর্বাপর ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক দিকের বিবেচনায়  আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধে রুপ নিতে পারে- তাহলে কি একথা বলা যাবে যে এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে-তাইতো?

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: জ্বি এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে। কেন দীর্ঘায়িত হবে তার তিনটি কারণ আমি বলব। পাশ্চাত্য সব জায়গায় ভায়োলেন্স করছে এবং জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনজীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিকে পুরোপুরি পাশ্চাত্যকরণ করেছে। সামগ্রিক সিস্টেমকে তাদের মতো করে ঢেলে সাজিয়েছে। আর এই পাশ্চাত্যকরণ এমনভাবে করেছে এবং করতে চেয়েছে যে অন্যান্য বিশ্ব যাতে বুঝতে না পারে। অন্যান্য বিশ্বকে তারা বিষয়টি বুঝতে দিচ্ছে না। তারা জ্ঞানের জগৎটাকে খুবই স্মার্টলি হ্যান্ডেল করছে। আর আমরা জেনে-বা না জেনে, সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে তাদের দেয়া তত্ত্বকে গ্রাস করছি এবং গ্রহণ করছি। কিন্তু আসলে তাদের দেয়া তত্ত্বগুলোর যে গ্রহণযোগ্যতা ও সারবত্তা নেই, মানুষ এবং সভ্যতার জন্য উপকারি নয় সেটি আমরা বুঝতে পারছি নে। আর তার একটি বড় প্রমাণ হিসাবে আজকের যুদ্ধ। ইউক্রেনে-রাশিয়ার সামরিক অভিযান এবং ন্যাটো তথা আমেরিকার এখানে জড়িত হওয়া।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক রুহুল আমিন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু বাদের কথা বলা হয় যেমন ধরুন উদারাবাদ বা বাস্তববাদ। অনেকটা তাত্ত্বিক কথা হলেও এসবের ভেতরের কথা একই অর্থাৎ শাসন করো-শোষণ করো, ধ্বংস করো এবং বিশ্বকে গ্রাস করো.. এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে এ যুদ্ধ

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: জ্বি আপনি ঠিকই বলেছেন, আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করি কিছু তত্ত্ব দিয়ে। যেমন ধরুন ‘উদারাবাদ’। দীর্ঘদিন উদারাবাদ ও বাস্তবতাবাদ তত্ত্বের লড়াই হয়েছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের আগ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বাস্তববাদ বা রিয়ালিজম চলেছে। এরপর রিয়ালিজমের মুখোশ পরিবর্তন করে এসেছে নব্য রিয়ালিজম। এরপর ৭০ এর দশক থেকে ৮০/৯০ এর দশক থেকে শুরু হলো নব্য উদারাবাদ। অর্থাৎ উদারাবাদ এবং বাস্তবাদ এ দুটোর মধ্যেই চলেছে বিতর্ক এবং পরিবর্তন। যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে বা থাকছে তখন তারা তাদের নীতিতে সারা বিশ্বকে শাসন করেছে। ফলে উদারাবাদ কিংবা বাস্তববাদ দুটোর অর্ন্তানিহত সারবস্তু একই। অর্থাৎ শাসন করো, শোষণ করো,ধ্বংস করো, গ্রাস করো এবং দখল করো। আর সেই নীতিই সব সময় তারা প্রয়োগ করেছে। যখন তাদের আসলে চেহারাটা ধরা পড়ছে তখন তারা নতুন একটা রুপ ধারণ করছে।উদারাবাদ-বাস্তববাদ, নব্য উদারাবাদ-নব্য বাস্তবাদ। এসব ব্যর্থ হওয়ার পর এখন বিশ্বায়ন মতবাদ নিয়ে এসেছে।

রেডিও তেহরান: তো বিশ্বায়নের যে সময় এখন চলছে এটি কতোটা সমভাবাপন্ন নাকি নতুন তো ভাবনায় বিশ্বকে মনোনিবেশ করতে হবে?

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: জ্বি বর্তমানে চলছে বিশ্বায়ন। জাতিসংঘ বিভিন্ন তত্ত্বের ব্যাপারে বড় বড় দার্শনিকের স্মরণাপন্ন হলো। দার্শনিকদের একটি পক্ষ বলল নতুন তত্ত্ব লাগবে। অপর পক্ষ বলল এই তত্ত্ব সংশোধন করে নিতে হবে। আমি অধ্যাপক রুহুল আমিন- আমার বক্তব্য হচ্ছে, না ঐসব পুরনো তত্ত্বে চলবে না। নতুন তত্ত্বের দিকে যেতে হবে। আর এই নতুন তত্ত্বের সন্ধানে আজ পৃথিবী কাজ করছে। তবে সেখানে জ্ঞানের জগতে পাশ্চাত্য সহিংসতায় এগিয়ে আসবে। অর্থাৎ জ্ঞানের জগতে পাশ্চাত্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক রুহুল আমিন, পশ্চিমা বিশ্ব জ্ঞানের জগতে এবং বাস্তবে সন্ত্রাস করছে। তো এ থেকে মুক্তির উপায় কি বলে আপনি মনে করেন?

ইমাম খোমেনী (র.)

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন: এ-থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে আমি বলব, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার মানুষকে জাগতে হবে। যেমন জেগেছিলেন ইরানের বিপ্লবের রুপকার আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনীসহ বিশ্বের আরও বেশ কয়েকজন নেতা। তাঁদের মতো মহানপুরুষদের আমাদের দরকার। আমাদের দরকার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, আমাদের দরকার চে গুয়েভারা, আমাদের দরকার আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনী (র.)। এরকম নেতা না এলে পৃথিবী টিকবে না। আফ্রো-এশীয়া, ল্যাটিন আমেরিকায় যেমন ঐরকম রাষ্ট্রনায়কের দরকার তেমন রাষ্ট্রের তাত্ত্বিকেরও দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী তাদের মধ্য থেকে আসবে তত্ত্ব। আমরা আর পুরনো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব নিয়ে এগোতে পরি না। এই জাতিংসঘ নিয়ে এগোতে পারি না। গোটা বিশ্বকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। আর সেজন্য দরকার বৈশ্বিক উদ্যোগ। সেক্ষেত্রে বড় এবং ছোট রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব নেয়া দরকার। সবাইকে একসাথে মিলে ঐ কাজটি করতে হবে। আর তা না করা হলে ইউক্রেনের মতো যুদ্ধ একটা না হাজার হাজার যুদ্ধ বাঁধবে এবং পৃথিবীর মুক্তির কোনো পথ নেই।

তো জনাব অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন- ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বিশ্ব বাস্তবতা নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

অধ্যাপক মুহা. রুহুল আমীন : আপনাকেও ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৭

ট্যাগ