মে ০৫, ২০২২ ২১:২২ Asia/Dhaka

চমৎকার একটি প্রবাদের গল্প: 'কবুতরের সঙ্গে কবুতর, বাজের সঙ্গে বাজ'।

গল্পটি এরকম: পুরোণো দিনের এক পাখি শিকারী পাখিদের আটকানোর জন্য বিভিন্ন রকমের ফাঁদ পেতে রাখতো। যেসব নিরীহ পাখি ওই ফাঁদে আটকা পড়তো সেগুলো সে খাঁচায় ঢুকিয়ে বাজারে নিয়ে মানুষের কাছে বিক্রি করতো। পাখি বিক্রেতার দোকান বিচিত্র পাখিতে ভর্তি ছিল। একেক পাখির একেক রকমের সুর। বিচিত্র সুরে তারা দোকানকে সারাক্ষণ সুরের ঝংকারে মুখরিত করে রাখতো। কোনো কোনো পাখি ছিল তারা শব্দ নকল করতে পারতো। কেউ দোকানে ঢুকে সালাম দিলে কিছুক্ষণ পর সেই পাখি হুবহু সেরকম শব্দে সালাম দিতো।

পাখির ক্রেতারাও ছিল বিভিন্ন রুচির। কেউ আসতো বুলবুল পাখি কেনার জন্য কেউ আসতো কবুতর কিনতে। কোনো কোনো ক্রেতা আসতো পাখির সুরেলা সঙ্গীত শুনে হৃদয়মনে আনন্দ পাবার জন্য, প্রশান্তি লাভ করার জন্য। আবার কেউ আসতো পাখি কিনে নিয়ে জবাই করে মাংস দিয়ে কাবাব বানিয়ে খাবার জন্য। কোনো কোনো ক্রেতা আসতো পাখির নিয়ে খেলা করে সময় কাটাবে-এই চিন্তা করে। একেক ক্রেতা আসতো তোতা বা ময়না জাতীয় পাখি কেনার জন্য। তারা এ জাতীয় পাখি কিনে নিয়ে তাদের কথা অনুকরণ করিয়ে আনন্দ পেত। এরকম পাখির বৈচিত্র্যের মতো মানুষ বা পাখি ক্রেতার মধ্যেও বৈচিত্র্য ছিল। যাই হোক একদিন পাখি বিক্রেতা গেল তার পেতে আসা জালের খোঁজখবর নিতে।

শিকারী ফাঁদের কাছে গিয়ে দেখে বেশ কয়েকটা পাখি আটকা পড়েছে। কয়েকটা চড়ুই পাখির সাথে একটা কাকও আছে। এগুলোকে দেখে দোকানদার বললো: ‘কাক আবার আটকা পড়লো কী করতে? এই কাক তো বিক্রি হবে না। কেউ কি কাক কিনতে আসবে? কাকটাকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। সে তার ভাগ্য নিয়ে চলে যাক তার নিজের ভূবনে। কাক, না তার গলায় সুর আছে, না তার গোশত খেতে মজা আছে’। মনে মনে এইসব ভাবতে ভাবতে পাখি বিক্রেতা তার জালে হাত দিলো কাকটাকে বের করে আনার জন্য। কাক পাখি শিকারীকে দেখেই ভয় পেয়ে গেল। তাই সে ভালোমতো একটা ঠোকর বসিয়ে দিলো পাখি শিকারীর হাতে। কাকের মারাত্মক ঠোকরে ব্যথা পেয়ে কঁকিয়ে উঠলো শিকারী। এরপর রেগেমেগে তীব্র চীৎকার দিয়ে কাককে বললো: ‘আমার হাতে ঠোকর দিয়েছিস? আমি চেয়েছি তোকে ছেড়ে দিতে। ঠিক আছে, তোকেও খাঁচায় বন্দী করে রাখবো যাতে আর কোনোদিন এ কাজ না করিস। উচিত শিক্ষা হবে তোর’।

পাখি বিক্রেতা জালে আটকা পড়া চড়ুইগুলোর সাথে কাককেও নিয়ে গেল দোকানে। একটা খাঁচায় বন্দী করে রাখলো কাকটাকে। কাক দোকানে গিয়ে যখন আরও বহু পাখি দেখলো, খুশি হয়ে গেল। সবাইকে বললো: ‘বন্ধুরা! ভালোই হলো। সবাই মিলে আমরা চিন্তা করবো কীভাবে এই খাঁচা থেকে পালানো যায়। চলো সবাই মিলে চিন্তাভাবনা করি, পরামর্শ করি। দেখি কীভাবে কী করা যায়’।

চড়ুই পাখিগুলো কিচির মিচির শব্দ তুলে বললো: ‘ঠিক বলেছো! ওই পাখি শিকারীর দোকান থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায় তার উপায় খুঁজে বের করতে হবে’। তোতা পাখি নিজেকে মনে করতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং ভালো পাখি। কাকের এই মুক্তি চিন্তা তার ভালো লাগলো না। বিশেষ করে খাঁচায় বন্দী সব পাখি কাকের কথায় সায় দেওয়াতে তার আরও খারাপ লাগলো। সবেমাত্র এসেই কেমন নেতাগিরি শুরু করে দিয়েছে কাক। তোতা তাই কাককে লক্ষ্য করে বললো: ‘এইসব কথা তোমার মতো একটা কালো পাখির মুখে মানায় না। চুপ করো! নিজের চরকায় তেল দাও’।                      

কাক তোতা পাখির দিকে তাকিয়ে বললো: ‘ছি ছি! কীরকম অহংকারী তুমি! খাঁচার ভেতরে থেকে এতো অহংকার দেখাচ্ছো! যদি মুক্তি পেয়ে আকাশে কিংবা সীমাহীন বনজঙ্গলে যেতে পারতে তাহলে কী করতে? তখন তো বোধ হয় বলতে- আমি পাখিদের খোদা। দেখছোনা তোমার গলার সুরকে কীভাবে মানুষেরা সরু করে ফেলছে! এই মানুষেরা আমাদের মতো পাখিদের জন্য কী করতে পারে-হয় খাঁচায় ভর্তি করে রাখবে অথবা জবাই করবে-এই তো। তুমি সেই মানুষদের কথা নকল করে এভাবে অহংকার করছো? তোতা বললো: ব্যস। ব্যস। অনেক হয়েছে। আর বলতে হবে না। তোর ওই কর্কশ কণ্ঠস্বর বিশ্রি লাগছে। আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। মেজাজটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তুই যদি পারিস মানুষের কথা নকল করগে,যাহ। কাক বললো: আমি কোন দুঃখে অনুকরণ করতে যাবো? তোমার মতো কথা নকল করে মানুষের বাসায় বন্দী হয়ে থাকবো? আর খাঁচায় থেকে ভাঁড়ের অভিনয় করবো? প্রশ্নই আসে না। সে-ই ভালো, মানুষ আমার কর্কশ কণ্ঠ শুনে ভালো না বাসুক, তোমার মতো খাঁচার ভেতর আটকে না রাখুক।

চড়ুইগুলো একসাথে বলে উঠলো: আমাদের কিচির মিচির গুঞ্জরণ অনেক ভালো। তোমার পছন্দ না হলে কানে তুলা দিয়ে রাখো। কবুতরেরাও বলে উঠলো: আমাদের বাকবাকুম শব্দ শুনতে যেরকমই লাগুক আমাদের জন্য সেটাই ভালো। আমাদের বাকবাকুম করতেই ভালোবাসি। কাক এতোক্ষণ চুপ করে বসে থেকে কী যেন ভাবছিল। সবার কথা শুনে এবার বললো: হ্যাঁ, ঠিকই! চড়ুই পাখি কিচির মিচির শব্দ করতেই ভালোবাসে আর পায়রারা বাকবাকুম। আর আমরা কাকেরা কা-কা করতেই পছন্দ করি।

ওই পংক্তিটা শোনোনি:

                   কবুতরের সাথে কবুতর, শ্যেনের সাথে শ্যেন

                   স্বজাতির সাথে স্বজাতির হওয়া উচিত লেনদেন।

কাক আরো বললো: মানুষেরা কিন্তু আমাদের পাখিদের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে নি। তোতা পাখি যখন মানুষের কথা নকল করলো তখনই মানুষ তোতাদের ধরে বাসায় নিয়ে খাঁচায় রাখতে শুরু করলো। আর এই তোতার কারণে আমাদেরও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাই হে তোতাজান!‍ মানুষের ভাষা নকল করে তুমি যেহেতু মজা পাও, সেহেতু তুমি এখানেই থাকো। সারাজীবনের জন্য মানুষের খাঁচায় বন্দী থাকো। আর আমি ভালো করেই জানি আমার কী করা উচিত।’ কাকেরা এমনভাবে কা-কা করে চেঁচামেচি করতে লাগলো যে পাখি বিক্রেতার মাথাটাই খারাপ করে দিলো। এদিকে কাকেদের কা কা শব্দ শুনে দোকানের আশেপাশে আরো যত কাক ছিল সবাই এসে দোকানের আশেপাশে সমবেত হলো এবং অভ্যাসবশত সমস্বরে কা-কা করতে লাগলো।

দোকানদার তার কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়ে বিরাট খাঁচার দুয়ার খুলে দিলো আর কাকের সাথে আরো কিছু পাখিও সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে উড়ে মুক্ত আকাশে চলে গেল। কিন্তু তোতাপাখি রয়ে গেল খাঁচায়। মানুষের কথা নকল করার জন্য সে আপন খাঁচাতেই বন্দী হয়ে রইলো।  এই ঘটনার পর থেকে কেউ যখন বলতে চায় বা বোঝাতে চায় মানুষের উচিত তার সমমনাদের সাথে ওঠাবসা, চলাফেরা করা, তখনই তারা এই পংক্তিটা উচ্চারণ করে:

কবুতরের সাথে কবুতর, শ্যেনের সাথে শ্যেন

স্বজাতির সাথে স্বজাতির হওয়া উচিত লেনদেন।#

 

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/  ০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ