মে ২১, ২০২২ ১৯:১৫ Asia/Dhaka

আশা করছি আপনারা প্রত্যেকে ভালো আছেন। গত আসরে আমরা ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর দৃষ্টিতে আট বছরের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ইরানের বিজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেছি। আজ আমরা যুদ্ধের ময়দানে ইরানি শিবিরের আধ্যাত্মিক পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।

ইরানের ওপর ইরাকের আট বছরের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এতে ইরানের সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে যুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ অংশগ্রহণ করে এবং দেশের সেনাবাহিনীর প্রতি গণমানুষের সমর্থন থাকে সে যুদ্ধে ওই দেশের জয়লাভের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ইরাকি আগ্রাসনের মোকাবিলায় যখন ইরানের সাধারণ জনগণ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ প্রতিরক্ষার কাজে এগিয়ে যায় তখন সেনাবাহিনীর মনোবল বহুগুণে বেড়ে যায়। সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মে যে, আগ্রাসী বাহিনী যত বড় শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের জয় হবেই।

আমরা আগেও বলেছি, যুদ্ধের এ পর্যায়ে ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.) দেশের তরুণ সমাজকে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করার নির্দেশ দেন। তাঁর এ নির্দেশে সারাদেশে ব্যাপকভাবে সাড়া পাওয়া যায় এবং লাখ লাখ তরুণ ও যুবক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে নিজেদের নাম লেখায়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এসব ইরানি তরুণ ও যুবকের একেক জন একেক বিষয়ে পারদর্শী ছিল।  ফলে যুদ্ধের ময়দানে সব বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিদের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটে।  এসব তরুণ ও যুবকের কারোই যুদ্ধ করা বা সমরাস্ত্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু তাদের কেউ কেউ যুদ্ধে গিয়ে এত বড় যোদ্ধা হয়ে ওঠেন যে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার সৈন্যর চেয়েও বেশি নৈপূণ্য প্রদর্শন করেন।  

এখানে উদাহরণ হিসেবে শহীদ বাকেরির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।  তিনি সাংবাদিক হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন ফ্রন্টের খবরাখবর সংগ্রহ করার জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজেকে দেশরক্ষার কাজে এতটা আত্মনিয়োগ করেন যে, তিনি হয়ে ওঠেন একজন কমান্ডার এবং তার নেতৃত্বে একের পর এক সফল অভিযান চালায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। এছাড়া, এই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে বহু কারিগরি সমস্যার সমাধান করার কাজে লাগে। প্রতিরক্ষা শিল্পে ইরানের চোখধাধানো উন্নতির পেছনে রয়েছে প্রতিভাবান এসব তরুণের উদ্ভাবনী প্রতিভা ও দেশকে স্বনির্ভর করার অদম্য বাসনা। সার্বিকভাবে আট বছরের যুদ্ধকে মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে ইরানের হাজার হাজার প্রতিভাবান তরুণ ও সেনা কমান্ডার শত্রুবাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছেন ঠিকই কিন্তু একইসঙ্গে এই স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন প্রতিশ্রুতিশীল ও সম্ভাবনাময় কিছু মানুষ যারা পরবর্তীতে ইরানের পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।

এদিকে যুদ্ধের দিনগুলোতে ইরানের গ্রাম ও শহরগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করা ছিল একটি দুরুহ কাজ। কিন্তু এই কাজে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর উপস্থিতির ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাদের দায়িত্ব পালন অনেকাংশে সহজ হয়ে যায়। এভাবে আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়। যুদ্ধের ময়দানে আত্মত্যাগ ও পরোপকারের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর জওয়ানরা। পেশাদার বাহিনীগুলোর মতো স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সৈনিকেরা আগে প্রশিক্ষণ নিয়ে পরে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হননি বরং লড়াই করতে করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছেন ও শক্তিমত্তা অর্জন করেছেন। তারা বিভিন্ন অভিযানে ইরাকি বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত গনিমতের অস্ত্রসস্ত্র দিয়ে পরবর্তী অভিযানগুলোতে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর শিখিয়ে দেওয়া স্লোগান- ‘আমরা পারি’কে নিজেদের ব্রত করে নিয়েছিলেন। ইরানি যোদ্ধারা তাদের প্রতিটি কর্মে মহান আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করতেন। এ কারণে তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে যেমন আন্তরিক ছিলেন তেমনি কোন কাজটি করলে আল্লাহ বেশি পছন্দ করেন সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। বেশিরভাগ ইরানি যোদ্ধা মনে করতেন, পার্থিব জীবনের প্রতি ভালোবাসা হচ্ছে সব অপকর্ম ও পাপ কাজের উৎস। এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রেখে তারা নিজেদের জৈবিক বাসনাকে দমন করতেন। যুদ্ধে ময়দানে রেষারেষির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। একজন কোনো অবস্থাতেই আরেকজনকে অপমান করতেন না। কেউ নিজেকে অনর্থক অন্যের চেয়ে বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। সবাই চেষ্টা করতেন ভালো কাজগুলো গোপনে করতে যাতে নিজেদের মধ্যে অহংকার প্রবেশ না করে। একটি ক্যাম্পের যোদ্ধারা হয়তো ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতেন তাদের জুতাগুলো কেউ পালিশ করে রেখে গেছে কিংবা তাদের খাবারের থালা-বাসনগুলো কেউ ধুয়ে রেখে দিয়েছে।  

ইরানি যোদ্ধারা সতরঞ্চি বিছিয়ে তার চারপাশে গোল হয়ে বসে খাবার খেতেন। কারো বাড়ি থেকে বিশেষ কোনো খাবার এলে তা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খেতেন।  বিপদে আপদে তারা কখনও ধৈর্যহারা হননি বরং পরস্পরকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। তাদের মনে ছিল পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের মর্মবাণী যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: “যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপৰ্যয়ই আসে তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমরা তা কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি যাতে তোমরা যা হারিয়েছ তাতে যেন তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত না হও। নিশ্চয় আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” যুদ্ধের ময়দানে কেউ আহত হলে কিংবা কোনো অভিযানে সফল হতে না পারলে সূরা হাদিদের ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতের এই মর্মবাণী মনে করে নিজেদের সান্ত্বনা দিতেন ইরানি যোদ্ধারা। আর আল্লাহর এই বাণীকে বুকে ধারণ করে ইরানি যোদ্ধারা শাহাদাতের জন্য নিজেদের সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত করে রাখতে পেরেছিলেন বলেই আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের বিজয় সম্ভব হয়েছিল।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /২১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ