জুন ০৬, ২০২২ ২১:১৩ Asia/Dhaka

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের রুপকার-মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রেডিও তেহরানের বিশেষ সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান আলাপনে অতিথি হিসেবে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার ড.তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান।

বিশিষ্ট এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, ইমাম খোমেনী(র.) একজন অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক নেতা। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক নেতার মহান সমন্বয় তাঁর মধ্যে ছিল। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমনটি আর পাওয়া যায় না।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল। এটি প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

জনাব ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান, রেডিও তেহরানে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান: আপনাকে এবং রেডিও তেহরানকে ধন্যবাদ।

রেডিও তেহরান:  জনাব, ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান, বছর ঘুরে এলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেনীর মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি একজন আলেম হয়েও আধুনিক রাজনীতিতে বিরাটভাবে শক্তিমান; একটি জাতিকে আমূল বদল দেয়ার স্বপ্নে উদ্বেলিত করেছেন। সমস্ত উদ্ধত্য শক্তিকে পরাভূত করে তিনি এই আধুনিক সময়ে কোন মন্ত্রবলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন?

ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান: রেডিও তেহরানকে ধন্যবাদ আমাকে আজকের এই সংক্ষিপ্ত আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আমার মনে হয় ইমাম খোমেনীর (র.) যে রাজনৈতিক বিবেচনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সময় এবং জনগণকে বোঝার ভেতরগত অনুভূতি- এসব বিষয় বিশাল ইরানি জনগোষ্ঠীকে মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। ইমাম খোমেনীর বিশাল অভ্যুত্থানকে বোঝার জন্য তাঁর বেড়ে ওঠা, এগিয়ে আসা এবং নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়গুলো বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ইমাম খোমেনী (র.) এর পূর্ববর্তী মারজায়ে তাকলিদ ছিলেন আয়াতুল্লাহ বুরুজের্দি। ১৯৬১ সালে আওয়াতুল্লাহ বুরুজের্দি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর ইমাম খোমেনী (র.)'র নেতৃত্বে আসার বিষয়টি সুগম হয়। তিনি নেতৃত্বের আসনে আসীন হন। কিন্তু আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ হোসেন বুরুজের্দির নেতৃত্বের যে পন্থা সেভাবে না গিয়ে ভিন্ন পন্থায় এগিয়ে আসেন ইমাম খোমেনী (র.)। আর সেই ভিন্ন পন্থারই একধরনের প্রতিফলন বলা উচিত এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে একটি নতুন স্বপ্নে উদ্বেলিত করার পথ দেখানো এবং তাতে সক্ষম হওয়া।

রেডিও তেহরান: ইমাম খোমেনীর ডাকে ইরানের জনগণ আড়াই হাজার বছরের রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দিল। কোন প্রত্যাশায় জনগণ এই অসাধ্য সাধনে সর্বাত্মকভাবে নিবেদিত হয়ে পড়ল?

ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান: ধন্যবাদ। আপনার প্রথম প্রশ্নের সুত্র ধরেই দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। সেটি হলো ইমাম খোমেনী ৬১ সালের পর যে নেতৃত্বে আসীন হলেন তারপর ইতিহাসের দুটো ঘটনাকে আমরা স্মরণ করতে পারি তার প্রথমটি হলো ১৯৬৩ সালের কথিত' শ্বেত বিপ্লব'। যার মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের জানুয়ারিতে ইরানের রেজা শাহ পাহলভী একটি ছয় দফা ঘোষণা করেন শ্বেত বিপ্লব নাম দিয়ে। যার কয়েকটি দফাকে ইমাম খোমেনী (র.) বললেন –ঐসব দফা ইসলামের ওপর সরাসরি আক্রমণ। ইমাম খোমেনী ঐ ছয় দফার বিরুদ্ধে দাঁড়ান।  তিনি ইরানের নেতৃত্বে থাকা ধর্মীয় নেতাদেরকে এ বিষয়ে সজাগ ও সচেতন করতে পেরেছিলেন এবং এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ  করেছিলেন। আর সেই সুত্রেই অন্তত আটজন মারজা'কে সাথে নিয়ে তিনি বিবৃত্তি দিয়েছেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন গণভোটে কেউ যেন অংশ গ্রহণ না করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রতিবাদ করেছেন। তখন তার বিরুদ্ধে রেজা শাহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তাকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে তাঁকে আটক করে তেহরানে আনা হয়। তারপর অবশ্য ইমামকে ছেড়েও দেয়।

এরপর আমরা দেখছি ১৯৬৪ সালের ২৬ অক্টোবর রেজা শাহ পাহলভী ক্যাপিটেলেশন অ্যাক্ট জারি করে। যে আইনের আওতায় বলা হয় যে মার্কিন সেনাদের যেকোনো অপরাধের দায়ে আমেরিকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিচার করা হবে।

ঐ আইনের প্রতিবাদে ইমাম খোমেনী (র.) জনগণকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসতে এবং ঐক্যবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন। ১৯৬৪ সালের নভেম্বর মাসে ইমামকে তৎকালীন ইরানি প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী মনসুর ইমাম খোমেনীকে ক্ষমা চাইতে আদেশ দেন। ইমাম প্রধানমন্ত্রীর সেই আদেশকে প্রত্যাখ্যান করেন। তখন হাসান আলী মনসুর ইমামের সাথে মন্দ ব্যবহার করেন এবং  ইমামের গায়ে আঘাত করেন। আমরা দেখি ঐ ঘটনার দুই মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী  হাসান আলী মনসুর আততায়ীর গুলিতে খুন হন। ইমাম খোমেনী (র.) জনগণের নেতৃত্বেই থেকে যান। তারপর ১৯৬৪ সালের ৪ নভেম্বর ইমামকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।  প্রথমে তুরস্কে তারপর ১৯৬৫ সালের অক্টোবরে ইরাকের নাজাফে সেখান থেকে ১৯৭৮ সালের ৬ অক্টোবর প্যারিসে ইমামকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ইমামের টানা পনের বছরের নির্বাসিত জীবনে ইরানের জনগণের সাথে সম্ভাব্য যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।

নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ইমাম খোমেনী ইরানি জনগণকে বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে যথার্থ এবং উপযোগী নির্দেশনা দিতে থাকেন। আমরা দেখছি ঐ সময়টাতে ক্যাসেট ব্প্লিব বা অডিও বিপ্লবের একটি ধারণা বিশ্ববাসী জানতে পারেন। ইমাম খোমেনী কখনও নাজাফ থেকে কখনও প্যারিসের উপকণ্ঠ থেকে ইরানি জনগণের জন্য ক্যাসেটবদ্ধ বার্তা পাঠাতে থাকেন। সেইসব বার্তায় ইরানী জনগণ ব্যপকভাবে উদ্ধুদ্ধ হন।

ইমাম খোমেনী (র.) নাজাফে থাকাকালে বেশ কিছু বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতার মূল বিষয়টি ছিল ইসলামি সরকার ব্যবস্থা কিভাবে পরিচালিত হতে পারে সেটি। সেখানে তিনি তার মূল ধারনাটি উপস্থাপন করেন যেটি  খাঁটি অর্থে রাজনীতি বিজ্ঞানের বিবেচনায় একটি যুগান্তকারী নতুন ধারনা। এই ধারনাটিকে আমরা পরে নাম দিয়েছি' 'বেলায়েতে ফকিহ' বা ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের অভিভাবকত্ব। মানে ইসলামি আইন বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ একইসাথে সাধারণ জ্ঞান, সাধারণ আইন এবং সাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় যাঁরা বিশেষজ্ঞ এমন ব্যক্তিদের অভিভাবকত্বে ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। এমন একটি নতুন ধারণা ইমাম খোমেনী (র.) ইরানি জনগণকে দিয়েছিল। আর এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যমান রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য শান্তিময় এবং সমৃদ্ধিময় ইরান গড়ে তোলার জন্য ইরানি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সুতরাং আমরা এখানে ইমাম খোমেনী (র.) এর দেয়া বেলায়েতে ফকিহ তত্ত্বকেই প্রধান কৃতিত্ব দিতে চাই।

রেডিও তেহরান: বলা হয়- ইমাম খোমেনী বিশ্বের কথিত পরাশক্তিগুলোর ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। কীভাবে সেটা সম্ভব হয়েছে এবং এ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান: ধন্যবাদ আপনাকে। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে  যে ইসলামি বিপ্লবটি সফল হলো-তারই ধারাবাহিকতা দেখি ১৯৭৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইরানের মেহরাবাদ বিমান বন্দরে  ইমাম খোমেনী র. তাঁর স্বদেশে অবতরণ করেন এবং তার দশ দিনের মাথায় ইরানের সেনাবাহিনী ইমামের কাছে আত্মসমর্পন করে। তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে মেনে নেয়।

আমরা অবশ্য অন্য সাধারণ ধারাবাহিকতায় দেখতে পাই মি. রেজা শাহ পাহলভী তার আগে ১৬ জানুয়ারি ইরান থেকে পালিয়ে যায় ৩৮ বছরের শাসনকে পেছনে ফেলে। এর সতের মাসের মাথায় মিশরে রেজা শাহ পাহলভী মৃত্যুবরণ করেন।

ইরানের এই বিপ্লবটিকে আমরা কেন বিদ্যমান দুটি পরাশক্তির ভীত কাঁপানো বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করব?

আমরা দেখতে পাই ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য দুটো পরাশক্তি তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চেষ্টা করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে ইরাককে লেলিয়ে দিয়ে  আট বছরব্যাপী যুদ্ধ চালিয়েছে তারা। ঐ যুদ্ধে বিশ্বের সবশক্তি অর্থাৎ দুই পরাশক্তি থেকে শুরু করে পাঁচ বিশ্ব শক্তি এবং তার আশাপাশের মুসলিম নামধারী শাসকরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। সুতরাং ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের সেই ইসলামি বিপ্লবকে বিদ্যমান পরাশক্তির ভীত কাঁপানো একটি বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করতে কোনো দ্বিধা থাকার কথা থাকার কারণ নেই।

রেডিও তেহরান: ইরানের এই মহান নেতার কর্মময় জীবন এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান: মহান নেতা ইমাম খোমেনী (.র) কর্মময় জীবন এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে মূল্যায়ন করার জন্য আপনাদের সম্ভাব্য সময়টি খুবই কম। খুব সংক্ষেপে একেবারে মিনিমাম উচ্চারণে যদি আমাকে বলার জন্য অনুরোধ করেন তাহলে বলব খাঁটি অর্থে রাজনীতি বিজ্ঞানের ইতিহাসে, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে ইমাম খোমেনী (র.) একজন অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক নেতা। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক নেতার মহান সমন্বয় তাঁর মধ্যে ছিল। বিশ্বের ইতিহাসে অন্য যেসব উদারহরণ আমরা দেখতে পাই সেখানে এই দুই বিশাল যোগ্যতার সমন্বয় আমরা খুব একটা দেখতে পাই না। কেউ হয়তো ভালো তাত্ত্বিক কিন্তু উপযুক্ত নেতা নন; আবার কেউ হয়তো উপযুক্ত নেতা কিন্তু তাত্ত্বিক নন। কিন্তু ইমাম খোমেনীর মধ্যে সেই তাত্ত্বিক নেতা এবং যোগ্যতর নেতৃত্বের সম্মিলন আমরা দেখতে পাই।

শেষ কথাটি বলা উচিত যে, ইমাম খোমেনী তাঁর দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশেষ করে ইসলামি নেতৃত্বকে এমনভাবে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন যে আজ পর্যন্ত ইমাম খোমেনীর ধারাবাহিকতায় যে ধর্মীয় নেতৃত্ব ইরানে বিদ্যমান আছে তাদেরকে সমালোচক, তাত্ত্বিক কিংবা অন্য জনগোষ্ঠী, অন্য ব্যক্তিরা কমবেশি মোল্লাতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে হয়তো কিন্তু এখনও ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে তারা ভোগবাদী বিলাসী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে নি। ব্যাপকভাবে অসৎ নেতা হিসিবেও চিহ্নিত করতে পারে নি। সুতরাং এটা একটা বিশাল স্মরণীয় রাজনৈতিক অস্তিত্বের নাম ইমাম খোমেনী(র.) যিনি তাত্ত্বিকভাবে, বাস্তবে এবং  নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় একটি বিশাল রাজনৈতিক ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তো জনাব ড. তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী র. এর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আপনাকেও ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৬

ট্যাগ