জুন ১৪, ২০২২ ১৯:১০ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভালো ও সুস্থ আছো। প্রত্যেক আসরের মতো আজও তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, আজকের আসরে রয়েছে দুটি গল্প ও একটি গান। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই ইরাকে প্রচলিত একটি গল্প শোনা যাক। গল্পটির নাম 'সওদাগরের স্বপ্ন'। 

অনেক দিন আগে বাগদাদ শহরে এক ধনী সওদাগর বাস করতেন। খুব সুন্দর একটি বাড়ি ছিল তাঁর। বাড়ির পাশে ডালিমগাছের চমৎকার বাগান। কিন্তু এই সওদাগরের সুখ বেশি দিন থাকল না। তিনি ব্যবসায়ে মার খেয়ে এমন গরিব হয়ে গেলেন যে এখন তাঁকে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হয়।

এক রাতে তিনি ঘুমিয়ে আছেন, স্বপ্নের মধ্যে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন সওদাগর। কে যেন তাঁকে বলছে, ‘শোনো! তুমি কায়রো চলে যাও। ওখানে গেলে অনেক টাকাপয়সা পাবে, ধনসম্পদ পাবে। দেরি কোরো না। কায়রো যাও।’

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তিনি কায়রোর পথে রওনা হয়ে গেলেন। অনেক দিন পরে তিনি কায়রো শহরে পৌঁছালেন। তখন রাত হয়ে গেছে। রাতটি কাটানোর জন্য সওদাগর একটি মসজিদে ঢুকলেন।

কিছুক্ষণ পরে একদল চোর এল মসজিদের পাশে। তারা মসজিদের পাশের বাড়িটিতে চুরি করার মতলবে এসেছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেলেন বাড়ির মালিক। তিনি হইচই করে বাড়ির অন্য সদস্যদের ডাকাডাকি করতে লাগলেন। এমন শোরগোল শুনে চোরের দল ভয়ে পালিয়ে গেল।

গৃহকর্তার চিৎকারে ছুটে এল নৈশপ্রহরীরা। তারা চোরগুলোকে পেল না, পেল মসজিদে ঘুমিয়ে থাকা সওদাগরকে। তারা তাঁকে গ্রেফতার করল এবং লাঠি দিয়ে পিটুনি দিল। মার খেয়ে বেচারা গেলেন অজ্ঞান হয়ে। সৈন্যরা সওদাগরকে কারাগারে পুরে দিলেন। ওখানে তিন দিন তিন রাত পড়ে থাকলেন সওদাগর।

তারপর বিচারক এসে সওদাগরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তুমি? কায়রো শহরে কেন এসেছ তুমি?’

বেচারা সওদাগর জবাব দিলেন, ‘আমি বাগদাদের একজন সৎ ও পরিশ্রমী সওদাগর। খুব অভাবের মধ্যে পড়েছি আমি। সেদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটি কণ্ঠ আমাকে বলছে, আমি যেন কায়রো চলে আসি। এখানে এলে নাকি আমি ধনসম্পদ পাব। কিন্তু ধনসম্পদের বদলে পেলাম লাঠির মার!’

এ কথা শুনে হেসে উঠলেন বিচারক। বললেন, ‘তুমি দেখছি খুবই বোকা! স্বপ্নে বিশ্বাস করো। আমি নিজেও তো অন্তত তিনবার স্বপ্নে দেখেছি একটি কণ্ঠ আমাকে বলছে, ‘বাগদাদে যাও। ওখানে ডালিমগাছের ধারে একটি বাড়ি আছে। ওই বাড়ির উঠানে আছে একটি ঝরনা। সেই ঝরনার নিচে তুমি অনেক ধনসম্পদ পাবে।’ তোমার কি মনে হয় আমি এতই বোকা যে স্বপ্নে কী বলল আর তাই শুনে আমি বাগদাদ ছুটে যাব?’

সওদাগরের নির্বুদ্ধিতায় বিচারক আবারও একচোট হেসে নিলেন। তারপর তিনি তাঁকে টাকাপয়সা দিলেন বাড়ি ফিরে যেতে। দ্রুত বাগদাদ ফিরে এলেন সওদাগর। কারণ, তিনি জানেন বিচারক যে বাড়ি, ডালিমগাছ ও উঠানের কথা বলেছেন, সেটি তাঁর নিজেরই বাড়ি, ডালিমগাছ ও উঠান।

বাড়ি ফিরেই তিনি উঠানের ঝরনার নিচে মাটি খুঁড়লেন। মাটির নিচে পেলেন ঘড়া বা কলসভর্তি সোনা, হিরে, পান্না ও মুক্তো। ‘বিচারকের স্বপ্নের কণ্ঠস্বরটি তাহলে সত্যি ছিল!’ আপনমনে হাসলেন তিনি। তারপর থেকে আবার সুখ-শান্তি ফিরে এল সওদাগরের জীবনে। তাঁকে আর কখনো অভাবে পড়তে হয়নি।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা আরেক সওদাগরের গল্প শোনাব। এক গ্রামে এক সওদাগর বাস করতো। সে বাণিজ্য করতে দূর দেশে যাবে। তার কাছে কিছু সোনার মোহর ছিল। সেই গ্রামে তার আপন বলতে কেউ নেই। যারা ছিল তাদের ওপর সওদাগরের কোন আস্থা ছিল না। মোহরগুলো কোথায় রেখে যাবে এই নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। পরে খুব চিন্তাভাবনা করে বের করল।

পাশের বাড়িতে বুড়িমা আছে। খুবই ভালো মানুষ। তার কাছে রাখা যেতে পারে। সে আমানতের কোনদিনও খেয়ানত করবে না।

পরদিন সে বুড়িমার কাছে গেল এবং বলল ‘বুড়িমা এই পুঁটলিটা একটু যত্ন করে গুপ্তস্থানে লুকিয়ে রাখবে। আমি দূর দেশে সওদা করতে যাচ্ছি। ফিরতে ছয় মাস সময় লেগে যাবে। ফিরে এসে তোমার কাছ থেকে আমার আমানতের জিনিস আমি ফেরত নেব।

বুড়ি মা বললো : ‘ঠিক আছে বাবা, আমি বেঁচে থাকতে তোমার এই জিনিস কাউকে ধরতে দেবো না।’

সওদাগর এবার নিশ্চিন্তে বাণিজ্য করতে চলে গেল। সওদাগর যাবার কিছুদিন পরই বুড়িমা অসুস্থ হয়ে পড়ল। দিন দিন অসুখ বাড়তে থাকায় বুড়িমা সওদাগরের আমানতের জিনিস নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। বুড়িমা বুঝতে পারল যে তার মৃত্যু কাছাকাছি এসে পড়েছে।

আপনজন বলতে বুড়িমার কেউ ছিল না। কার কাছে রেখে যাবে এই আমানত! এসময় মনে মনে চিন্তা করল, এই গ্রামের মোড়লের তো অনেক ধনসম্পদ আছে। সে এগুলোর প্রতি লোভ করবে না। এখানে তো সামান্য কয়েকটি পিতলের পয়সা মনে হয়।

সেদিনই অসুস্থ শরীর নিয়ে মোড়লের কাছে গেল এবং বলল : ‘বাবা, আমি তো মরে যাব, তুমি আমার একটা কথা রাখবে।’

মোড়ল বলল : ‘কী কথা বুড়ি মা?’

বুড়ি বলল : ‘আমার এই পুঁটলিটা তোমার কাছে আমানত হিসেবে রাখতে হবে। পুঁটলিটার মালিক পাশের বাড়ির সওদাগর। সওদাগর এলে তার হাতে তুমি নিজ দায়িত্বে তুলে দেবে। আমার এ কথাটা তোমার রাখতে হবে- বাবা।’

পুঁটলিটা নিয়ে মোড়ল বলল: ঠিক আছে বুড়িমা, ঐ সিন্ধুকটায় ভালো করে ভরে রাখবো।’

বুড়িমা মোড়লের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার দিন রাতেই মারা গেল। বুড়িমা মারা যাবার পাঁচ দিন পার না হতেই মোড়ল সেই পুঁটলিটা খুলে ফেলল। পুঁটলিটা খুলেই মোড়ল হতভম্ব। পুঁটলির ভেতর দামি দামি সোনার মোহর দেখে সেগুলোর প্রতি মোড়লের লোভ হলো।

পুঁটলির দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে থাকে ‘বুড়ি মরেছে ভালোই হয়েছে। এখন এই মোহর আমার হয়ে গেল।’  

বুড়ি মারা যাওয়ার ছয় মাস পর সওদাগর ফিরে এলো। বুড়িমার খোঁজ করতেই জানতে পারল অনেকদিন আগে সে মারা গেছে। বুড়িমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করল সওদাগর। এরপর বুড়ির ঘরটায় অনেক তল্লাশি করলেও কোথাও খুঁজে পেল না তার পুঁটলিটা।

সওদাগর এবার চিন্তিত হয়ে পড়ল। চিন্তায় চিন্তায় পাগল হবার পালা। কারণ সে সারাজীবন কষ্ট করে এই সম্পদ অর্জন করেছে। সওদাগর ভেঙে না পড়ে মনে মনে চিন্তা করল যে,  বুড়িমা যেহেতু খুব বুদ্ধিমতী ও সৎ ছিল তাই নিশ্চয়ই পুঁটলিটা কারো কাছে রেখে গেছে।

এই ভাবনার পর সওদাগর আরো ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারল যে, বুড়িমা যেদিন মারা যায় সেদিনই মোড়লের বাসায় গিয়েছিল। তার হাতে ছিল একটা পুঁটলি। কথাটা শোনা মাত্রই সে মোড়লের কাছে ছুটে গিয়ে সব খুলে বলল। কিন্তু মোড়ল সব অস্বীকার করল।

সওদাগর মোড়লের বাড়ি থেকে ফেরার পথে মনে মনে বলতে লাগল- আমার এই সম্পদ যদি কষ্টের ও হালালের হয়ে থাকে তবে আল্লাহর ইচ্ছায় আমি একদিন না একদিন তা ফিরে পাবোই।

এর পর থেকে মনের দুঃখে সওদাগর প্রায়ই বুড়িমার কবরের কাছে গিয়ে কাঁদতে লাগল। একদিন সওদাগর স্বপ্নে দেখল বুড়িমা তাকে বলছে, ‘সওদাগর তুমি আর কেঁদ না। আমার সাথে বেঈমানি করেছে মোড়ল। আমানতের খেয়ানত করেছে। এজন্য সে মারাত্মক শাস্তি ভোগ করবে। তোমার জিনিস যদি হালালের ও সৎ উপার্জন হয়ে থাকে তবেসেটা অবশ্যই ফেরত পাবে।’

সওদাগর এবার যেন কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পেল। এরপর দেখতে দেখতে অনেক দিন পার হয়ে গেল। একদিন সে শুনতে পেল- মোড়ল এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কত দেশের কত কবিরাজ এলো, ডাক্তার এলো কিন্তু কেউই কোনো রোগ ধরতে পারল না। মোড়লের ধন-সম্পদ কমতে কমতে ভীষণ খারাপ অবস্থা হতে লাগল। শেষমেশ সেই পুঁটলিটার ওপর নজর পড়ল।

যেদিন রাতে মোড়ল ওই পুঁটলিটা বের করতে গেল ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়িতে ডাকাত পড়ল। ডাকাতরা তার সব ধন-সম্পদের দলিল বের করে টিপসই নিলো মোড়লের। সাথে নিল সেই পুঁটলিটা।

ঠিক সেদিনই সওদাগর আবার বুড়িমার কবরের কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদলে বলতে লাগল- আমার মেয়ের বিয়ের জন্য পুঁটলিটা রেখেছিলাম। মেয়েটা বড় হয়েছে, তার বিয়ে হচ্ছে না টাকার জন্য। গ্রামের মোড়ল আমার এই আমানতের জিনিস খেয়ানত করেছে। আমি আল্লাহর কাছে অভিশাপ দিচ্ছি যে, আমার এই পুঁটলিটা আটকিয়ে রেখেছে তার যেন ভয়াবহ কঠিন অসুখ হয়। পৃথিবীর কোনো ডাক্তার কবিরাজ তাকে ভালো করতে না পারে।   

বুড়িমার কবরের পাশে ছিল একটা বড় বটগাছ। সেই বটগাছের নিচে বসে ডাকাতি করা লুটের জিনিস ভাগযোগ করছিল ডাকাতরা। ডাকাতদের সর্দার হঠাৎ সওদাগরের করুণ আর্তনাদ শুনে ফেলল। সে বুঝতে পারল যে, এই পুঁটলিটা সওদাগরের। পুঁটলিটা চুরি করার জন্যই মোড়ল আজ কঠিন অসুখে ভুগছে এবং তার ধনসম্পদ সব গোল্লায় গেছে। আমরা যদি তার পুঁটলিটা ফেরত না দেই, তাহলে আমাদের ওপরও অভিশাপ লাগবে।

এসব ভেবে ডাকাত সর্দার ডাকাতদের সব ঘটনা খুলে বলে। সবার সম্মতি নিয়ে ডাকাত সর্দার ঐ পুঁটলিটা সওদাগরের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল: ভাই সওদাগর! আমরা বুঝে গেছি, মানুষের সৎ হালালের পয়সা কখনো হজম করা যায় না। এই নাও তোমার সোনার মোহরের পুঁটলিটা। তুমি তোমার মেয়ে বিয়ে দাও ধুমধাম করে। আর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা আর কখনো ডাকাতি করবো না।’

সব ডাকাতকে বিয়ের দাওয়াত দিল সওদাগর। সওদাগরের মেয়ের বিয়েতে আসার নিমন্ত্রণ পেয়ে ডাকাতরা মহা খুশি হলো। সওদাগর ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিলো। সওদাগরের খুশির সীমা রইল না।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে একটি নাতে রাসূল। 'মুহাম্মাদ নাবীয়ানা' শিরোনামের গানটি লিখেছেন কবি মোশাররফ হোসেন খান, সুর করেছেন গোলাম মাওলা। আর গেয়েছে শিশুশিল্পী জাইমা নূর, নাবিহা নূর, শামিন, রাফা, মাহা, মুহান্নি, মুনতাহিনা, মাঈশা, ইউশা, আঞ্জুম, মারিয়া, রাবেয়া ও বুশরা।

বন্ধুরা, তোমরা গানটি শুনতে থাকো আর আমরা বিদায় নিই রংধনুর আজকের আসর থেকে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ