জুন ১৫, ২০২২ ২০:৫৬ Asia/Dhaka

কোনো দেশে নির্বাচন নিয়ে অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্যই নিয়মতান্ত্রিক, সাংবিধানিক এবং আইনানুগ প্রতিবাদ হতে পারে। আবার প্রতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে পারে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্নরকম কর্মসূচি পালন করতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো। এসব বিষয় অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। নির্বাচনকে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার জন্য এগুলো অপরিহার্য।

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য  নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী পক্ষপাতদুষ্টতা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ আছে। আর এসবই সমস্যার সৃষ্টি করে। কতগুলো প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে, কতগুলো নিয়মনীতি মেনে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছবে, নানারকমের সমস্যার সমাধান হবে-এটাই হলো রাজনীতি। আর তার জন্য সংসদ থেকে শুরু করে আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এটাই সত্যিকারার্থে রাজনীতি। এরবাইরে যেটি হয় রাজপথ দখল করা। অর্থাৎ রাজপথে সব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাজপথে কোনোদিন সমস্যার সমাধান হয় না। রাজপথে সমস্যাটা আরো তীব্র হয় এবং নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হয়, ব্যাপক হয়, প্রকট হয়, ভয়াবহ হয় এবং সহিংস হয়! এই যে রাজপথের চিত্র- সেটাই কিন্তু উত্তেজনা, উত্তাপ এবং সহিসংতা সৃষ্টি করে। রাজপথে কোনো কিছুর সমাধান হয় না।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা এবং প্রযোজনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: ড. বদিউল আলম মজুমদার, আপনার কাছে প্রথমে যে বিষয়টি জানতে চাইছি-সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের নানা কথাবার্তা থেকে এমনটাই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কীভাবে দেখছেন পরিস্থিতি?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তাপ সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় সেটি হচ্ছে অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম। নিয়মতান্ত্রিক, সাংবিধানিক এবং আইনানুগ প্রতিবাদ হতে পারে। আবার প্রতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে পারে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্নরকম কর্মসূচি পালন করতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো। এসব বিষয় অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। নির্বাচনকে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার জন্য এগুলো অপরিহার্য। আর এসব করতে গিয়ে কিছুটা উত্তাপ তো সৃষ্টি হবেই। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা রদবদলের সম্ভাবনা থাকে। ফলে উত্তাপ –উৎসাহ একইসাথে  শঙ্কাও থাকে। কিন্তু কোনো ভাবেই এটি কাম্য নয় যে ঐসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোনোরকম সহিংসতা সৃষ্টি, কোনো রকম অনিয়মতান্ত্রিকতা, কোনোরকম বাড়াবাড়ি, বাধা দেয়া, হুমকি দেয়ার মতো কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনী  (ফাইল ফটো)

তো এরকম ঘটেছে কিছুটা, কিছুটা বাড়াবাড়ি হয়েছে। আর এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা বিশেষত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ। তারা সবাইকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সুশৃঙ্খলভাবে করার জন্য সুযোগ করে দেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী পক্ষপাতদুষ্টতা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ আছে। আর এসবই সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রতিবাদ, প্রতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করা হবে সেটাই স্বাভাবিক।

রেডিও তেহরান: ড. মজুমাদার আপনি বলছিলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে একটা উত্তেজনা থাকে। কিন্তু আপনি যে কথাটি বললেন, হুমকী-ধমকি, প্রভাব বিস্তার করা –যেমন দেখা গেল সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের নেতাকর্মীদের রাজপথ দখলের নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের কর্মীদের প্রায়ই এমন নির্দেশ দিয়ে থাকেন। রাজনীতির এই সংস্কৃতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

রাজপথে সংকটের সমাধান হয় না বরং বাড়ায়

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, এটা তো রাজনীতির সংস্কৃতি নয়; এটি হলো অপরাজনীতির সংস্কৃতি অথবা অপসংস্কৃতি বলা যেতে পারে। কারণ রাজনীতি হলো একটি প্রক্রিয়া। রাজনীতি হলো সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া। কতগুলো প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে, কতগুলো নিয়মনীতি মেনে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছবে, নানারকমের সমস্যার সমাধান হবে-এটাই হলো রাজনীতি। আর তার জন্য সংসদ থেকে শুরু করে আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এটাই সত্যিকারার্থে রাজনীতি। এরবাইরে যেটি হয় রাজপথ দখল করা। অর্থাৎ রাজপথে সব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাজপথে কোনোদিন সমস্যার সমাধান হয় না। রাজপথে সমস্যাটা আরো তীব্র হয় এবং নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হয়, ব্যাপক হয়, প্রকট হয়, ভয়াবহ হয় এবং সহিংস হয়! এই যে রাজপথের চিত্র- সেটাই কিন্তু উত্তেজনা, উত্তাপ এবং সহিসংতা সৃষ্টি করে। রাজপথে কোনো কিছুর সমাধান হয় না। রাজপথে একটা দলের হয়তো পরাজয় হতে পারে কিন্তু তা সাময়িক। এটা হয়তো মেনে নেয় তারা কিন্তু মনে নেয় না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বললে এমনটি দাঁড়ায়। এসবের মাধ্যমে পরিস্থিতি এমন দিকে গড়ায় যেটা কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।

শ্রোতাবন্ধুরা! বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদারের সাক্ষাৎকার শুনছেন। আমাদের সাথেই থাকুন। ফিরছি খুব শিগগিরি।

রেডিও তেহরান: ড.বদিউল আলম মজুমদার, আপনার বক্তব্যের প্রসঙ্গ ধরেই জানতে চাইব-নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়। তো আগামী নির্বাচন কি অংশগ্রহণমূলক হবে? কারণ  নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে শক্তভাবে বলা হচ্ছে তারা নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না। প্রশ্ন হচ্ছে- বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে কী হবে?

বাংলাদেশের ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, নির্বাচন শুধু অংশগ্রহণমূলক হলেই হবে না। নির্বাচন হতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং প্রতিযোগিতামূলক। ২০১৮ সালের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছিল কিন্তু সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয় নি। যারফলে ঐ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় নি। আমাদের নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হলেই কেবল তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল যদি তাদের রাজনৈতিক, নির্বাচনি কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করতে পারে, তারা যদি সভা সমাবেশে করতে না পারে, তারা যদি প্রচার –প্রচারণা চালাতে না পারে, তাদের প্রার্থীরা যদি নির্ভয়ে তাদের ভোটারদের কাছে পৌঁছতে না পারে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইতিবাচক নয় এবং এরমাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হয় না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রতিযোগিতা নিয়মতান্ত্রিকভাবে, আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা রদবদলের পন্থা।

এর বিপরীতে যদি হয় অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে যদি ক্ষমতার রদবদল না হয় তাহলে কিন্তু  সমস্যা সমাধানের পরির্বর্তে সমস্যা সৃষ্টি করে। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সমস্যার সমাধান হওয়ার কথা সেটি হচ্ছে কে পরবর্তী সময় জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং সরকার গঠন করবে। দেশে যদি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন না হয় তাহলে কিন্তু জনগণের সম্মতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না এবং এটা আরও জটিলতা সৃষ্টি করে। আর এই অবস্থা যদি চলতে থাকে অর্থাৎ নির্বাচনি ব্যবস্থা যদি ভেঙে যায় তাহলে ক্ষমতার রদবদল হবে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে, অসাংবিধানিকভাবে এবং সহিংসভাবে। আর সহিংসতাসহ এসব বিষয় কারও জন্য কাম্য নয়, কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।

ড. বদিউল আলম মজুমদার, বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে রেডিও তেহরানের সঙ্গে আজকের সাক্ষাৎকারে অতিথি হিসেবে থাকার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৫

ট্যাগ