জুন ২৬, ২০২২ ১৯:৪৯ Asia/Dhaka

উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কুমিল্লার সিটি নির্বাচন হয়েছে তবে শেষ মুহূর্তে নাটকীয়তা ছিল। ফলাফল ঘোষণা সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়া কিছুটা বিলম্ব করা ভয়াবহ সন্দেহের উদ্রেক করে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে একথা বলেন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি আরও বলেন, কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে এই নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার অভাব আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাদের অধীনে হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে দেয়া হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব, ড.বদিউল আলম মজুমদার, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে গেল তুমুল উত্তেজনা আর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে। ফলাফলে নগরপিতা হয়েছেন রিফাত।তবে মনিরুল অভিযোগ করে বলেছেন-তাকে পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে। অন্যদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলছেন ভোটের ফল নিয়ে ভিন্ন কিছু হয় নি। তবে মিডিয়াতে এসেছে নাটকীয়তার কথা। তো সব মিলিয়ে কুমিল্লার সিটি নির্বাচন নিয়ে আপনি কি বলবেন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার:  আপনি ঠিকই বলেছেন প্রবল উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। শেষ মুহূর্তে নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। নিরপেক্ষ মেয়রপ্রার্থী ৬ শ'র কিছু বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন। সম্ভবত চারটি কেন্দ্রেরে ফলাফল বাকি ছিল। অবশেষে দেখা গেল আওয়ামী লীগের প্রার্থী  বিজয়ী হয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেছেন কয়েকটি সেন্টার ফল দিতে দেরি করায় পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশে কিছু দেরি হয়েছে। এখন এ বিষয়টি সন্দেহের উদ্রেগ করে যে চারটি কেন্দ্র বাকি থাকতে নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলো  এবং ঐ চারটি সেন্টারে ফলাফল দেরি করে দেয়া হলো একইসাথে ঐ কটি সেন্টারে নয়শ'র মতো ভোটের ব্যবধান তৈরি হলো। এ বিষয়টি অবশ্যই ভয়াবহ সন্দেহের উদ্রেক করে।

রেডিও তেহরান:  ড.বদিউল আলম মজুমদার, কুমিল্লা নির্বাচনেও ইভিএম-এ জটিলতা দেখা গেছে। অনেকেই ভোট দিতে পারেন নি। তারপরও কেন ইভিএম-এ ভোট গ্রহণের লাগাতার চেষ্টা চলে? ইভিএম প্রসঙ্গে আপনি কি বলবেন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, ইভিএম নিয়ে যেটি আরও ভয়ানক সেটি হচ্ছে, এর দুর্বলতা। ইভিএমে কোনোরকম অসঙ্গতি হয়েছে কি না তা যাচাই করার সুযোগ নেই। ইভিএমে কোনো ডেটা রাখা হয় না। নির্বাচন কমিশন যে তথ্য দিয়েছে সেটাই চূড়ান্ত। পুন:গণনার কোনো সুযোগ নেই। আর এই ইভিএমের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। আর এই নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে অন্তত একটি দল ও তাদের সহযোগি বেশ কিছু দল অনাস্থা  পোষণ করেছে।

রেডিও তেহরান: জনাব,ড. বদিউল আলম মজুমদার, আপনি আচরণ বিধি লঙ্ঘনের কথা বলছিলেন, তো  কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনু্ষ্ঠিত হলো। নানা ঘটনা ছিল। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব প্রকাশ। অভিযোগ রয়েছে- নির্বাচনী এলাকায় আচরণ বিধি লঙ্ঘনের জন্য একজন এমপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে নি নির্বাচন কমিশন বরং সিইসি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: জ্বি, নির্বাচন কমিশন তাদের সক্ষমতা প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে। আর এতে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। যদি নির্বাচন কমিশন সক্ষমত হতো তাহলে তারা তাদের আইন কানুন-বিধি বিধান প্রয়োগ করতে পারত। তারা প্রয়োগ করতে পারে নি এটি তাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে। এখানে প্রশ্নটি হচ্ছে একটি স্থানীয় নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলেন সেখানে জাতীয় নির্বাচন যেখানে তিনশ আসনে নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনি ফলাফলের উপর জয়পরাজয় নির্ধারিত হবে। একইসাথে প্রশাসন অর্থাৎ যারা নির্বাচনে কাজ করবে তারাও অতীতের মতো নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কয়েক হাজার থাকবে। তারপর রাজনৈতিক দলগুলো তো আছেই। সেখানে বিরোধী দল আছে –থাকবে সরকারি দল।

রেডিও তেহরান:  জ্বি, আপনি বলছিলেন নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের সক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তো এই অসহায়ত্ব প্রকাশের ঘটনাকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ও সুশীল সমাজের নেতারা ভালোভাবে নেন নি। এ সূত্র ধরে অনেকেই বলছেন এই নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আপনার কী মনে হয়?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বদল হবে। আর সেই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুর্ভাগ্যবশত পক্ষপাতদুষ্ট। তার নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। তিনশ জন এমপি এবং শত শত এমপি প্রার্থী তারা সবাই নির্বাচনি আচরণ বিধি কিংবা আইন কানুন ভাঙার চেষ্টা করবে। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। তো এখনই যদি অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তাহলে তখন কি করবে! এ বিষয়টি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

রেডিও তেহরান: আপনি বলছিলেন, এটা একটা বড় প্রশ্ন এখন এই অবস্থা জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় নির্বাচন তাহলে কিভাবে করা সম্ভব তাদের দ্বারা, অনেকে এও বলছেন, কুমিল্লা সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তাদের গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে পারত। প্রশ্ন হচ্ছে- ইসি কী সে সুযোগ হাতছাড়া করেছে? আপনার কী মনে হয়?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: তারা গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে অপারগতা প্রদর্শন করল।

রেডিও তেহরান: তো জনাব ড. বদিউল আলাম মজুমদার, কুমিল্লা সিটি নির্বাচন, তারপর নানা বিষয়, কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা প্রশ্ন, সন্দেহ এবং বাস্তবতা থেকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী..

ড. বদিউল আলম মজুমদার: নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার ব্যাপারটি বিবেচনায় নিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্দেহ থেকে যায়। কারণ নির্বাচন কমিশন তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে। একইসাথে ইভিএম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ইভিএমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থায় এই নির্বাচনের কমিমনের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।

রেডিও তেহরান:  ড. বদিউল আলম মজুমদার সবশেষে খুব ছোট করে জানতে চাইব, নির্বাচনের প্রসঙ্গ এলেই নির্বাচন কমিশনের কথা আসে। প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় নির্বাচন কমিশন কি স্বাধীন? যদিও সরকার সবসময় বলছে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, কমিশন নিজে বলছে তারা স্বাধীন। তবে আসলে কি নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এই প্রশ্ন বিভিন্ন মহল থেকে উঠতে দেখা যায়। তো এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আর এর দায়বদ্ধতা জনগণের কাছে-সরকারের কাছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা গত দুটি নির্বাচন কমিশনকে দেখেছি তেমনটি হয় নি।  যাদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে-তাদের সেই নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রটি অর্থাৎ পদ্ধতিগত ক্রটি রয়েছে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ হয় নি। আর যে ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সেই ব্যক্তিটি সঠিক ব্যক্তি নয়। দুর্ভাগ্যবশত অনুগত লোকদেরকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং তারা আনুগত্য প্রদর্শন করে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে।

তো ড. বদিউল আলম মজুমদার কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী বিভিন্ন প্রশ্ন, অভিযোগ এবং বাস্তবতা নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৬

ট্যাগ