নভেম্বর ০৫, ২০২২ ১৭:০৯ Asia/Dhaka
  • ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (১৪৪): যুদ্ধের ময়দানে ইরানি যোদ্ধাদের আল্লাহর স্মরণ

আগ্রাসী সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানি যোদ্ধারা আল্লাহকে স্মরণ করতেন এবং অবসরে জিকির-আসগারে মশগুল থাকতেন। তাদের কাছে আল্লাহর স্মরণ ও তাঁকে রাজি-খুশি রাখা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে তারা যুদ্ধে জয়-পরাজয়কে অতোটা গুরুত্ব দিতেন না। এই মানসিক শক্তি নিয়েই তারা অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে ন্যুনতম অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার সাহস পেতেন।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র অন্যতম কমান্ডার খাদেম হোসেইনি এ সম্পর্কে বলেন: এটি অব্যর্থ সত্য যে, ইরাকি শত্রুদের কাছে আমাদের তুলনায় অনেক গুণ বেশি সমরাস্ত্র ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানি যোদ্ধারা কেন সব সময় বিজয়ী হতেন? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, ইখলাস বা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টার কারণেই ইরানি যোদ্ধাদের বিজয় হয়েছে।

রণক্ষেত্রে ইরানি যোদ্ধারা কতটা আল্লাহভীরু ছিলেন তার প্রমাণ হিসেবে কয়েকজন শহীদের ওসিয়তনামা তুলে ধরা যায়। যেকোনো সময় মৃত্যু হয়ে যেতে পারে বলে ইরানি যোদ্ধা ও কমান্ডাররা জীবিত অবস্থায় তাদের ওসিয়তনামা লিখে রেখে যেতেন। এসব ওসিয়তনামায় তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের উপস্থিতির কারণ বর্ণনা করতেন। তাদের বেশিরভাগই লিখেছেন: আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, ইসলাম ও কুরআন, বিপ্লব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থা এবং সর্বোপরি দেশরক্ষা করার লক্ষ্যে তারা আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছেন।

এরকম একজন অজ্ঞাত শহীদের ওসিয়তনামায় বলা হয়েছে: হে আল্লাহ! তুমি জানো আমি শুধু তোমার সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধে আসার পথ বেছে নিয়েছি। আমি এই পথে আমার সামান্য জীবনটাকে উৎসর্গ করে শহীদদের কাতারে শামিল হতে চাই।

আরেকজন শহীদের ওসিয়তনামায় বলা হয়েছে: দ্বীনি দায়িত্ব পালন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ছাড়া যুদ্ধে যাওয়ার আর কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না। আমি বলতে চাই শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে আসার চেষ্টা করেছি এবং এ পথে অন্য কোনো উদ্দেশ্যকে নিজের চিন্তাজগতেই স্থান দেইনি।  আরেকজন যোদ্ধা তার শাহাদাতের আগে নিজের অসিয়তনামায় লিখেছেন: হে আল্লাহ! তুমি অন্য যে কারো চেয়ে বেশি জানো যে, ক্ষমতা বা পজিশন পাওয়ার জন্য কিংবা দুনিয়ার চাকচিক্য লাভের আশায় আমি যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি বরং কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে ইসলামের বিজয়ের মাধ্যমে তোমার পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য জিহাদে এসেছি।

অন্যদিকে ইরাকি সেনাদের হাতে বন্দি ইরানি যোদ্ধাদেরও ইরাকি কারাগারে সময় কেটেছে আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে। ইরাকের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ফেরা একজন ইরানি বন্দি এ সম্পর্কে বলেন: কখনও কখনও আমাদের মনে হতো আমরা আর কখনও মুক্ত জীবনে ফিরে যেতে পারব না। কখনও মনে হতো, কারাগারে বাইরে হয়তো সত্যিই জীবনের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমরা আমাদের অন্তরে এক প্রকাণ্ড শূন্যতা অনুভব করতাম এবং সেই সময়ে একমাত্র আল্লাহর স্মরণ আমাদের অন্তরকে প্রশান্ত করতে পারত। ইরানের একজন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। তিনি একজন ইরানি যোদ্ধার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে: আমার চোখ গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া একজন যোদ্ধার পেটে আটকে গেল। তিনি কিছু বলতে চান বলে মনো হলো।

ইরানি নির্মাতা আরো বলেন: আমি তার কাছে গেলাম। ভেবেছিলাম জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি হয়তো কোনো ওসিয়ত করতে চান কিংবা তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে সামান্য পানি পান করতে চান। কিন্তু আমি তার মুখে ইয়া আল্লাহ, ইয়া কুদ্দুস, ইয়া জালজালালি ওয়াল ইকরাম ছাড়া আর কিছু শুনতে পেলাম না। আমি ওই মুহূর্তটি আমার ক্যামেরায় ধারণ করতে চাইলাম। কিন্তু আমার হাত ক্যামেরার দিকে অগ্রসর হলো না। আমি এগিয়ে গিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ওই ইরানি যোদ্ধার মাথায় ও মুখে হাত বোলাতে লাগলাম। যখন সম্বিত ফিরে পেলাম তখন তার রুহ আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছে।

ইরানি যোদ্ধাদের কথা ও আচরণে যদিও আল্লাহর স্মরণের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল কিন্তু তারপরও তাদের কিছু আচরণে এ বিষয়টি অনেক বেশি প্রকাশ পেত। নামাজ, তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত, তসবিহ তাহলিল ও দোয়ায় মশগুল থাকা ছিল ইরানি যোদ্ধাদের অবসর সময়ের সবচেয়ে বড় সম্বল।

একজন মুসল্লি যখন নামাজে দাঁড়ান তখন তিনি পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আসমানের দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। তিনি অপবিত্রতা ও পাপ-তাপকে ঝেড়ে ফেলেন এবং পবিত্রতা ও সৌন্দর্যকে ধারণ করার চেষ্টা করেন।  নামাজ হচ্ছে আল্লাহর স্মরণ এবং আল্লাহর স্মরণ যেকোনো অস্থির মনকে শান্ত করে। মুসল্লি ব্যক্তি সব ধরনের অস্থিরতা, উদ্বেগ ও পেরেশানির কথা ভুলে যায় এবং অসম্ভব প্রশান্তি অনুভব করে। আল্লাহ তায়ালা নামাজের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর সাহায্য বেশি প্রয়োজন। কাজেই ইরানি যোদ্ধারা নামাজে দাঁড়িয়ে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন। যুদ্ধের ময়দানে ইরানি যোদ্ধাদের নামাজ ছিল সবচেয়ে বেশি ইখলাসপূর্ণ। ইরাক-ইরান যুদ্ধের দলিলপত্র অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, যুদ্ধের কঠিনতম মুহূর্তেও ইরানি যোদ্ধারা নামাজ ত্যাগ করেননি বরং আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার আশায় নামাজে দাঁড়িয়ে গেছেন।  

এ সম্পর্কে কিছু উদাহরণ পেশ না করলেই নয়। ইরানি কমান্ডাররা মনে করতেন, আন্তরিকতার সঙ্গে নামাজ আদায় করলে যুদ্ধক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য পাওয়া যাবে। একজন ইরানি যোদ্ধা ‘সাহেবাজ্জামান’ নামক অভিযানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমাদের কমান্ডাররা চরম যুদ্ধের মধ্যেও নামাজ ছাড়েননি। ওয়ালফাজর-৪ অভিযানের চতুর্থ দিনে ইরানি কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী কুচানির ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়: পরিস্থিতি শোচনীয় আকার ধারণ করেছিল। চতুর্দিক থেকে গোলাগুলি আঘাত হানছিল। চারদিকে ইরানি যোদ্ধাদের দিকে তাকালে তাদের প্রত্যেকের চেহারায় আধ্যাত্মিকতার নূর ছিল স্পষ্ট। প্রত্যেকে ছিলেন শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত। প্রতেক্যে শাহাদাতাইন পড়ে নিয়েছিলেন। এরইমধ্যে কুচানি দেখতে পান জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে।তিনি নিজে ওজু  করে নেন এবং সহযোদ্ধাদের ওজু করে আসতে বলেন।#

পার্সটুডে/এমএমআই/৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ