নভেম্বর ১৫, ২০২২ ১৭:২৫ Asia/Dhaka
  • জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইরানিদের অবদান-(পর্ব-১৩)

গত পর্বের আলোচনা অনুষ্ঠানে আমরা আধুনিক ইরানের খ্যাতনামা গণিতবিদ মারিয়াম মির্জাখনি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য এবং পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম।

পদার্থ বিজ্ঞানের মূল অবদান হচ্ছে প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলোর আবিষ্কার। ক্ষুদ্রতম যেসব কণিকা দিয়ে বস্তু জগত তৈরি এবং মৌলিক যে বলগুলো প্রকৃতিতে কাজ করছে তা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের উদ্ভাবিত তত্ব ও পরীক্ষার মাধ্যমে। পদার্থবিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা পরমাণুর অভ্যন্তর থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের দূরতম গ্যালাক্সি সম্পর্কে জানতে পারছি। পদার্থবিজ্ঞান এমন একটি বিষয় যার সাথে বায়োফিজিক্স এবং কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির মতো বেশ কিছু  বিষয়ে গবেষণার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বলা যায়, এখনো পদার্থ বিজ্ঞানের সঠিক সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। পদার্থ বিজ্ঞানে যে নতুন নতুন ধারণা জন্মায় তার বেশিরভাগের মৌলিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অন্যান্য বিজ্ঞান দ্বারা গবেষণা বা প্রমাণ করা হয়। ফলে পদার্থ বিজ্ঞানে নতুন নতুন গবেষণার দরজা খুলে যায় এমনকি গণিত ও দর্শনশাস্ত্রেও নতুনত্ব আসে। বাস্তবতা হচ্ছে, পদার্থবিজ্ঞানের উন্নয়ন ও অগ্রগতি প্রযুক্তির আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অতীতকাল থেকেই একজন মানুষ বয়সে ছোট কিংবা বড় হোক, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত হোক, কর্মজীবী কিংবা বেকার হোক, কেউ চাক বা না চাক সব মানুষকেই পদার্থ বিষয়ক জ্ঞানার্জন ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জীবন যাপন করতে হতো। দেখা ও শোনা, যে কোনো ঘটনার বিপরীতে পাল্টা প্রতিক্রিয়া, রাস্তায় হাটার সময় ভারসাম্য রক্ষা করে চলা প্রভৃতি আমাদের কাছে সাধারণ বিষয় বলে মনে হয় কিন্তু এসব কিছুর সাথে পদার্থ বিজ্ঞানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

এ ছাড়াও প্রকৃতির আরো কিছু বিস্ময় যেমন রংধনু, আলোর প্রতিফলন, আকাশের বজ্রধনি ও বিদ্যুত চমকানো, চন্দ্র গ্রহণ, সূর্য গ্রহণ এসব কিছুর রহস্য ভেদ করার জন্য পদার্থ বিজ্ঞানের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। আজকের যুগে আমরা যে রেডিও, টেলিভিশন,  উপগ্রহ, ইন্টারনেট, টেলিফোন প্রভৃতি ব্যবহার করছি তার পেছনেও সরাসরি পদার্থবিজ্ঞানের বিরাট অবদান রয়েছে। খুব সহজভাবে বলা যায় যদি ফিজিক্স বা পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়মনীতির  অস্তিত্ব না থাকতো তাহলে মানব জীবন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অচলাবস্থার তৈরি হতো।

আমাদের জানা উচিত পদার্থবিদ্যা পরমাণুর গতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ গঠন-কাঠামো বর্ণনা করে। সমস্ত বস্তু পরমাণু নিয়ে গঠিত সুতরাং বস্তুর সঙ্গে জড়িত যেকোনো বিজ্ঞানের সাথে পদার্থবিজ্ঞানের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, রসায়ন, জীববিদ্যা, ভূতত্ব, চিকিৎসা বিজ্ঞান, দন্ত চিকিৎসা, ওষুধ তৈরি, পশু চিকিৎসা, ফিজিওলজি,  রেডিওলজি, ম্যাকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা যন্ত্র প্রকৌশল, বিদ্যুত, ইলেক্ট্রনিক্স, খনিজ দ্রব অনুসন্ধান ও উত্তোলন, স্থাপত্য শিল্প, কৃষি প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা যায় যার সাথে পদার্থবিজ্ঞানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিল্প কারখানা, খনিজ, মহাকাশ গবেষণা, জাহাজ ও বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম নীতির ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া, দন্তচিকিৎসা ও অপারেশনে লেজার রশ্মির ব্যবহার, রেডিওলোজীতে এক্স-রে রেডিওগ্রাফি এবং লোহা ঝালাই করার ক্ষেত্রেও পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থাৎ যে কোনো কাজে পদার্থবিদ্যার কোনো বিকল্প নেই এবং বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার পেছনে পদার্থবিজ্ঞানের ভূমিকা রয়েছে। 

ইসলাম ধর্মে ন্যাচারাল সায়েন্স বা প্রকৃতি বিজ্ঞানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফে হাজারেরও বেশি আয়াত রয়েছে যেখানে প্রাকৃতিক নানা রহস্য উন্মোচন বা গবেষণার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। দর্শন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইসলামি প্রকৃতিবিজ্ঞান দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্ব প্রকৃতি খুবই সুশৃঙ্খলভাবে গঠিত এবং প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনাই তার নিজস্ব কিছু কারণের ফলাফল মাত্র। আবার প্রকৃতিতে বড় কোনো পরিবর্তন বা ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে এর পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ রয়েছে। প্রকৃতি খুবই  সুশৃঙ্খল এবং একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। আর যে কোনো ঘটনা বা পরিবর্তন তার চিরাচরিত  নিয়ম  অনুযায়ী হয়। খোদা প্রদত্ত নিয়মের বাইরে প্রকৃতিতে কিছুই হয় না। ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহর পরিচিতি ও ইচ্ছাকে দুটি জায়গায় তুলে ধরা হয়েছে। একটি হচ্ছে কোরআন শরীফ আর অন্যটি হচ্ছে বিশ্ব প্রকৃতির মধ্যে। এ কারণে খ্যাতনামা মুসলিম চিন্তাবিদ ও গবেষকরা মনে করেন প্রকৃতি সম্পর্কে জানা সবচেয়ে জরুরি। আর আল্লাহর ক্ষমতা ও পরিচয় সম্পর্কে জানতে হলে প্রকৃতির মাঝেই তার অনুসন্ধান করতে হবে। 

ইসলামি সভ্যতা বিকাশের যুগে অর্থাৎ যে সময়টিকে আমরা মুসলমানদের সোনালী যুগ বলে থাকি সে সময় মুসলিম মনীষীরা তারও আগে প্রাচীন কালের বিভিন্ন গবেষণাকর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন এবং আরবি ভাষায় সেগুলো অনুবাদ করতেন। আবু ইউসুফ  কান্দি, ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ প্রভৃতি মুসলিম দার্শনিক ও মনীষীরা প্রাচীন গ্রিক চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণাধর্মী বইপত্র নিজেদের  ভাষায় অনুবাদ করতেন। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন বিষয়বস্তুর পাশে ব্যাখ্যাও লিখে রাখতেন। সবচেয়ে বেশি অনুবাদ হয় ইবনে হিশাম ও আবু রেইহান বিরুনির সময়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, মুসলিম মনীষীরা পাশ্চাত্যের রজার বেকন ও উইতোলোর মতো গবেষকদের এ সংক্রান্ত তৎপরতা শুরুর আগেই আগেই মুসলিম মনীষীরা অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন।

মুসলিম মনীষীরা ব্যাপকভাবে অনুবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ায় এ সময় মুসলমানরা টমাস অ্যাকুইনাসের মতো খ্যাতনামা রোমান দার্শনিকের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। তিনি খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের সাথে প্রাচীন দর্শনের মিলন বা যোগসূত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। তিনি এরিস্টটলকে প্রাচীন যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইরানে পদার্থবিজ্ঞানের বিজ্ঞানীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, পদার্থবিজ্ঞানে ইরানের অতীত সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের পদচিহ্ন খুঁজে বের করা। প্রাচীন ইরানে পদার্থবিজ্ঞানের আওতায় জ্যোতির্বিদ্যা, সময়গণনা, ওজনবিজ্ঞান, যেকোনো কিছুর সাইজ বা বিশালত্ব মাপা, আলোকবিজ্ঞান চর্চা, কারিগরি কাজ, তরল বলবিজ্ঞান ও শব্দ নির্ণয় করা হতো। এ ছাড়া, বস্তু, গতি, স্থান ও সময়ের হিসাব বোঝার ক্ষেত্রেও পদার্থবিজ্ঞানের ব্যবহার হতো। এসব ক্ষেত্রে প্রায় একশত ইরানি মনীষীর গবেষণাকর্ম ও আবিষ্কারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় প্রাচীনকাল থেকেই ইরানের ইতিহাসে বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞান চর্চা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। #

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ