নভেম্বর ২২, ২০২২ ১৬:২২ Asia/Dhaka

শ্রোতা ভাই ও বোনেরা, সালাম ও শুভেচ্ছা নিন, আশা করছি যে যেখানে আছেন ভালোই আছেন।  'নারী: মানব-ফুল'- শীর্ষক সমাজ ও পরিবারে নারীর আদর্শ ভূমিকা বিষয়ক নতুন ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব থেকে আপনাদের সবাইকে জানাচ্ছি সাদর আমন্ত্রণ।

ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে  এবং সন্তান প্রতিপালন ও প্রশিক্ষণে নারীদের রয়েছে প্রধান ভূমিকা। তাই নারীর অধিকার রক্ষার ওপর ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। মহানবী (সা) কন্যা সন্তানকে সুগন্ধি ফুল বলে উল্লেখ করেছেন। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ)ও নারীকে সুগন্ধি ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর অর্থ নারী অত্যন্ত কোমল মন, দেহ ও স্নেহময় প্রকৃতির অধিকারী। তাই নারীর সঙ্গে সহিংস ও কঠোর আচরণ করা উচিত নয় এবং তাদের ওপর কোনো কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়।  

ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবারসহ সমাজে প্রশিক্ষক ও প্রশান্তিদাতা হিসেবে নারীর ভূমিকা এবং তাদের অধিকার ও সম্মানের বিষয়ে আমরা এ নতুন ধারাবাহিকে কথা বলব। তবে তার আগে প্রাচীন যুগ থেকে বিশ্বের নানা সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করব। 

নারী নিয়ে বিশ্বে দুই ধরনের প্রান্তিক বা চরমপন্থী চিন্তার ব্যাপক প্রভাব দেখা গেছে যুগে যুগে। এক শ্রেণীর মানুষ নারীকে অতি-মানুষ ও এমনকি খোদার আসনে সমাসীন করে উপাস্য বলে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। অন্যদিকে এক শ্রেণীর মানুষ নারীকে মানুষের চেয়ে নিকৃষ্ট বা পশুর সমগোত্রীয় বলে নারী জাতির প্রতি চরম অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে।

গ্রীসের প্রাচীন রূপকথায় নারী-ঈশ্বরী বা নারী-খোদা হিসেবে 'জিউস'-এর স্ত্রী 'হেরা' বা হিরা নামটি দেখা যায়। হিরাকে নারীদের ও নারী জগতের  স্রস্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে! জিউসের কন্যা 'ইরিস' বা 'আইরিস'কে রঙধনুর ইশ্বর, 'হেস্টিয়া'কে শান্তি ও অগ্নি-রক্ষক হিসেবে, 'আর্টিমিস'কে যুব সমাজের সহযোগী ও তাদের জন্ম বিষয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। 'আফ্রোদিতি'কে প্রেমের খোদা বা দেবতা হিসেবে ও 'দিনিসুস'কে আঙ্গুর বাগানের স্রস্টা ও 'ডিমটার'কে শস্যের খোদা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এইসব রূপকথায় নারীর মা হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে এবং নারীকে দয়ালু ও স্নেহপরায়ণ হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি মানব প্রজন্মের টিকে থাকা, তাদের জীবন ও খাদ্যের যোগানদাতা হিসেবে নারীকে শাসক ও খোদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে! 

প্রাচীন গ্রিস 

প্রাচীন পারস্যেও নারী খোদার উপাসনার রেওয়াজ ছিল। ইরানের প্রাগৈতিহাসিক যুগে স্থানীয় আদিবাসীদের সব বিষয়ের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ছিল নারী। ইরানে আর্যদের আগমনের আগ পর্যন্ত শাসন-ব্যবস্থা ছিল মাতৃশাসন-কেন্দ্রীক। আর এই প্রবণতারই চরম প্রকাশ হিসেবে নারীদের উপাস্য মনে করে পূজা করার প্রথা চালু হয়। অ্যাকামেনিয় বা হাখামেনিশিয় যুগেও নারী-প্রভুর উপাসনা করা হত। সম্রাট দ্বিতীয় আর্দেশির (Artaxerxes II) জনগণকে 'নাহিদ' নামক মাতৃদেবীর উপাসনা করতে উৎসাহ দিতেন। তিনি তার বিশাল সাম্রাজ্যের নানা অঞ্চলে এ জন্য বিশেষ উপাসনালয় নির্মাণ করেছিলেন। ফলে হাখামানেশিয় শাসনামলে শত শত বছর ধরে নাহিদ-উপাসনার প্রচলন ছিল। এই পূজা স'সানিয় শাসনামলেও অব্যাহত থেকেছে। সম্রাট দ্বিতীয় আর্দেশির-এর স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনি নাহিদ-এর মূর্তির সামনে নতজানু হয়ে স্ত্রীর আরোগ্য কামনা করেছিলেন। নাহিদ-এর কাছে পাঠানো হত সোনা, রূপা ও ঘোড়ার মত নানা অর্ঘ। ইরানের প্রাচীন স্থাপত্যের নানা অংশে এই দেবীর মূর্তিসহ নানা নিদর্শন দেখা যায়। 

গ্রিক ও ইরানিরা ছাড়াও অন্য অনেক জাতির মধ্যেও নারীকেন্দ্রিকতা ছিল। আরব জাতিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আরব জাতির উপাস্যগুলোর মধ্যে অনেক নারী দেবী বা উপাস্যের নাম দেখা যায়। অন্যদিকে যুগে যুগে নারীর প্রতি ঘৃণা বা অবমাননারও চরম প্রকাশ দেখা যায়। গ্রিকরা নারীকে কখনও মূল্যহীন পণ্য ও কখনও বাজারের কেনা-বেচার দ্রব্য বলে মনে করত। তারা মনে করত নারী হচ্ছে অপবিত্র সত্ত্বা ও শয়তান হতে জন্ম নেয়া এবং ঘরের কাজকর্ম ছাড়া বাইরের কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নারীকে দেয়া হত না!

এথেন্সের পুরুষরা যত খুশি বা যত বেশি সংখ্যক নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চাইত তাতে কোনো বাধা ছিল না।  স্পার্টা অঞ্চলে যে কোনো নারী একই সময়ে কয়েকজন পুরুষের জীবনসঙ্গী হতেন! মানুষের মৃত্যুর পর নারী বা স্ত্রীদেরকে গৃহপালিত পশু ও স্থাবর-সম্পত্তির মত ভাগ করে নেয়া হত! কখনওবা ওসিয়ত বা উইল অনুযায়ী বিশেষ কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হত স্ত্রী ও নারীদেরকে! নারীদের জন্য দামী পাথর কেনা ছিল নিষিদ্ধ। গ্রিক আইনে নারীর জন্য ঘর থেকে বের হওয়া ছিল নিষিদ্ধ এবং তাদের জীবন ছিল বন্দির মত! 

প্রাচীন গ্রিসের কেবল সাধারণ মানুষই যে নারীদের মূল্যহীন বস্তু বলে মনে করত তা নয়, বিশিষ্ট বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং পণ্ডিতরাও নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না! যেমন সক্রেটিস মনে করতেন নারীর কর্মক্ষেত্র হচ্ছে একমাত্র ঘর ও পুরুষের সেবা করা! এরিস্টটলের মতেও নারীকে হতে হবে পুরুষের একান্ত অনুগত এবং তার নিজস্ব ইচ্ছা, পছন্দ ও সিদ্ধান্ত থাকার অধিকার নেই! গ্রিকরা মনে করত নারী যদি কেবল পুত্র সন্তান জন্ম দেয় তাহলেই তারা লাভজনক। সেখানে কারো পুত্র সন্তান জন্ম হলে তার ঘরের কাছে জয়তুন বা অলিভ গাছের পাতা দিয়ে তৈরি একটি মুকুট স্থাপন করা হত এবং এ নিয়ে গর্ব করা হত। কিন্তু কারো কন্যা সন্তান জন্ম হলে তার পিতা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হত এবং নিজেকে লোকজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখত।

প্রাচীন গ্রিসের একটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ

প্রাচীন রোমেও নারীরা ছিল বন্দিনী দাসীর মত এবং সামাজিক সম্মান বলতে তাদের কিছু ছিল না! রোমের সরকারগুলো নারীকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখত এবং নারীর সামাজিক জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখতে তারা নানা আইন প্রণয়ন করত। রোমের বাজারে নারী পণ্যের মত কেনা-বেচা হত। তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান, উপহার ও মোহরানা বলতে কিছু ছিল না। রোমানরা মনে করত নারী ত্রুটিপূর্ণ সত্ত্বা ও অনির্ভরযোগ্য বা মূল্যহীন। খ্রিস্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকেও নারী মানুষ কিনা সে বিষয়ে রোমানরা সন্দিহান ছিল! তাদের মতে নারী যদি মানুষ হয়েও থাকে তবুও তাদেরকে আসলে সৃষ্টি করা হয়েছে একমাত্র পুরুষদের সেবার জন্য। 

রোমের বিধান অনুযায়ী নারীরা হচ্ছে শিশুর মত। তাই কোনো কাজেই তাদের কোনো অধিকার নেই।  ফলে তাদেরকে কাজ করতে হবে পরিবারের অভিভাবকের নজরদারির আওতায় এবং তারই নির্দেশে। কন্যা ও স্ত্রীরা হবে তাদের বাবা ও স্বামীর হুকুমের অনুগত এবং তারা না থাকলে তাদেরকে হতে হবে ঘরের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষের অনুগত।  

রোমান বিধান অনুযায়ী পরিবারের প্রধানই হলেন ঘরের নারীদের শরীর ও প্রাণের মালিক। তারা চাইলে ওদের বিক্রি করে দিতে পারেন ও কাউকে উপহার দিতে পারেন বা হত্যাও করতে পারেন! রোমান সমাজেও কারো মৃত্যুর পর নারীকে ভাগ বাটোয়ারা করা হত স্থাবর সম্পদের মত। বিয়ের বয়স হলে স্বামী একজন পিতার কাছ থেকে তার মেয়েকে কিনে নিত পণ্যের মত। তাই স্বামী যখন মনে করত যে স্ত্রীকে আর তার ভালো লাগছে না তখন সে তাকে কারো কাছে বিক্রি করে দিত!

শ্রোতা ভাইবোনেরা, সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে 'নারী: মানব-ফুল' শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার প্রথম পর্ব এখানেই শেষ করছি। কথা হবে আবারও আগামী অনুষ্ঠানে। আশা করছি তখনও সঙ্গ দিতে ভুলবেন না। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/২২

ট্যাগ