নভেম্বর ২৪, ২০২২ ১৪:৫৪ Asia/Dhaka

প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্পের" আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রবাদের গল্প।

প্রবাদটি এরকম: 'কামারের কাজ কিছুই না, ছড়িয়ে দিলে বেলচা হবে, লেজ টানলে রড'। মজার ব্যাপার না? কামারের পেশার মতো এতো কঠোর পরিশ্রমের একটা কাজকে কীরকম হালকাভাবে মূল্যায়ন করা হলো। কিন্তু কেন? কীভাবে এই প্রবাদটি সাহিত্যের ভুবনে এলো-তার পেছনের গল্পটি কীরকম ছিল-সেই কাহিনী শুনবো আমরা।

'কাহিনীটা শুরু হয়েছে এক বুড়ি এবং তার একমাত্র ছেলেকে ঘিরে। বুড়ি ছিল বিধবা। বহু বছর আগেই বুড়ির স্বামি মারা গেছে। তারপর থেকেই বুড়ি একাকী নি:সঙ্গ জীবন কাটিয়ে দিয়েছে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। ছেলেকে লালন পালন করে বড় করাই বুড়ির একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র সন্তান হলে সাধারণত আলালের ঘরের দুলাল হয়ে ওঠে। ভীষণরকম অলস এবং অনেকটা মেয়েলি স্বভাবের হয়ে ওঠে। তাই হয়েছে। 

কামার

প্রতিবেশিরা বুড়িকে সবসময় বলতো: তোমার ছেলেকে এতো বেশি আশকারা দিও না। ও তো আলালের ঘরের দুলাল হয়ে উঠেছে। ছেলে এখন বড় হয়েছে। ওকে এখন তোমার আঁচল থেকে বের করে কাজকর্মে পাঠাও! ব্যবসা-বাণিজ্য শিখুক! বাম-কাজ শিখুক। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুক। অন্ততপক্ষে রুটি-রুজির সন্ধানে যেতে শিখুক! বুড়ির কাছে কথাগুলো ভালোই লাগতো। সে নিজেও চাইতো না তার ছেলে বেকার বসে কাটাক, অলস জীবন যাপন করুক। সে কারণে একদিন বুড়ি ছেলের হাত ধরে বাড়ির বাইরে গেল। সোজা তাকে নিয়ে হাজির হলো এক কামারের কাছে। কামারকে অনুরোধ করে বুড়ি বললো: আমার ছেলেটাকে তোমার শাগরেদ হিসেবে কবুল করো! ওকে খুব ভালো করে তোমার কাজটা শিখিয়ে দাও!

কামার তো এই বুড়ি এবং তার ছেলেকে আগে থেকেই চিনতো। সে কারণে তাদেরকে সহযোগিতা করতে চাইলো এবং রাজি হলো শাগরেদ বানাতে। পরের দিনই ছেলে কাজের পোশাক পরে কামারের দোকানে গিয়ে হাজির হলো। কর্মক্ষেত্রে তার কাজের প্রথম দিনটা কেটেছে পানি আর ঝাড়ু দিয়ে। দ্বিতীয় দিন কেটেছে মূল কাজের প্রাথমিক পর্ব দিয়ে। এইদিন তাকে শেখানো হলো জ্বলন্ত লোহাকে কী করে চুল্লি থেকে বের করে আনতে হয়। ছেলেটা এই কাজ করতে গিয়ে চুল্লির আগুনের উত্তাপ প্রতিরোধ করতে পারছিলো না। জানা ছিলো না তার। সুতরাং বিরক্ত হয়ে গেল এবং কাজটা একবার করেই দোকানের এক কোণে গিয়ে বসে পড়লো।

কোণায় বসে থাকা শাগরেদকে ওস্তাদ যতোই বললো: হাতুড়ি চালাও কিংবা চুল্লিতে লোহা দাাগও, শাগরেদ কোনো কথাই কানে তুললো না। বললো: আমি দেখে দেখেও প্রয়োজনীয় কাজগুলো শিখে নিতে পারবো। কামার শাগরেদকে কাজের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে না ওঠে-সেই চিন্তা করে খুব বেশি পীড়াপীড়ি করলো না। এভাবে দু-তিন দিন কেটে গেল। একদিন শাগরেদ সময়মতো এলো না। অনেক সময় অপেক্ষা করার পরও এলো না। ওস্তাদ একাকীই তার কাজ শামলে নিলো। কামার একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। মনে মনে ভাবলো কোনো বিপদ-আপদে পড়ে নি তো! খোজ নেওয়া দরকার-কোথায় সে। দু'তিন-দিন এভাবে কেটে গেল।

অবশেষে কামার বার্তাসহ লোক পাঠালো শাগরেদের মাকে। বার্তাটি হলো: তোমার ছেলে ক'দিন কাজে আসছে না। কোনো অসুখ-বিসুখ হয় নি তো? বার্তাবাহক কিছুক্ষণ পর শাগরেদের মা-সহ ফিরে এলো। কামার বুড়ির চেহারায় উদ্বেগের চিহ্ন না দেখে স্বস্তি পেলো। বুড়ি বললো: তোমাকে যে কী দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাবো সে ভাষা আমার জানা নেই। আমার ছেলে আমাকে বলেছে কামারের সব কাজ সে শিখে ফেলেছে। তার আর তোমার কাজে কাজ শিখতে আসার দরকার নেই। সে তো খুবই মেধাবি তবে তুমিও খুব ভালো ওস্তাদ। কামার তো বুড়ির কথা শুনে অবাক বনে গেল। বললো: তোমার ছেলে এই দুই-তিনদিনেই সব শিখে ফেলেছে? এরকম আজগুবি কথা কখনই শুনি নি। আমি ত্রিশ বছর কামারের কাজ করছি। অথচ এখনও কাজের সব কলাকৌশল শেখা হয় নি। বুড়ি কামারের কথার জবাবে বললো: বলেছিলাম না, আমার ছেলে ভীষণ মেধাবি? সে বলে, কামারের কাজ তেমন কিছুই না। লোহাকে চুলার ভেতর আগুনে গরম করার জন্য রাখতে হবে। গরম হয়ে গেলে লোহাকে চুলা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। এরপর একটি হাতুড়ি দিয়ে লোহার মাথায় আঘাত করতে হয়। যদি গরম লোহার মাথাটাকে লম্বা করা হয় তাহলে এটি লোহার রড হয়ে যাবে। আর যদি পিটিয়ে দু'পাশের দিকে নেওয়া হয় তাহলে হয়ে যাবে বেলচা, ব্যস। কাজ শেষ। 

কামার বুড়ির কথা শুনে হো হো করে হাসলো। বললো: তোমার ছেলে, মাশাআল্লাহ! ওর গায়ে ধুপ দেওয়া উচিত যাতে কারো নজর না লাগে। সে কেবল কামারবৃত্তিই শেখে নি বরং তোমার মতো বুড়িকেও কামারবৃত্তির কলাকৌশল শিখিয়ে দিয়েছে। বুড়ি এবার বুঝে ফেললো তার ছেলে কিছুই শেখে নি। অলসতা আর কঠিন কাজের কারণে সে মূলত কাজে ফাঁকি দিয়ে ঘরে বসে আছে। এই ঘটনার পর থেকে অলসতা, অক্ষমতা কিংবা শিল্পকর্মে অপারগতার কারণে কেউ অন্যদের প্রতিভাকে অবমূল্যায়ন করলে এই প্রবাদটি বলতে শুরু করলো: 'কামারের কাজ তেমন কিছুই না, পিটিয়ে চ্যাপ্টা করলে বেলচা আর লম্বা করলে হয়ে যায় রড।#

ফার্সি থেকে রূপান্তর: নাসির মাহমুদ

পার্সটুডে/এনএম/২৪
 

ট্যাগ