মার্চ ০৮, ২০১২ ১৫:১৪ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আলে ইমরানের ৪৮ থেকে ৫৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৮ ও ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ (48) وَرَسُولًا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآَيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (49)

"মহান আল্লাহ ঈসাকে গ্রন্থ, বিজ্ঞান, তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছেন।" (৩:৪৮)

"এবং বনী ইসরাইলদের কাছে তাঁকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। ঈসা তাদের বলেন নিশ্চয়ই আমি তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের জন্য নিদর্শন এনেছি। আমি কাদা দিয়ে একটা পাখীর মূর্তি তৈরী করে,তাতে ফু'দেব। আর আল্লাহর ইচ্ছায় তা পাখী হয়ে যাবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করব এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে মৃতকে জীবিত করব। তোমরা তোমাদের ঘরে যা খাও ও জমা কর আমি তাও তোমাদের বলে দেব। তোমরা যদি বিশ্বাসী হও তবে সত্য মেনে নেয়ার ব্যাপারে এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (৩:৪৯)

গত কয়েকটি পর্বে আমরা বলেছিলাম জন্মের পর হযরত ঈসা (আ.) মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁর মায়ের সতীত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই দুই আয়াতে তাঁর আরো কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। নবীরা সমাজের নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব পালন করেন বলে তাঁদের মধ্যে জ্ঞান ও সচেতনতার মত বিভিন্ন গুণাবলি থাকা জরুরি। তাই আল্লাহ নিজেই নবীদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন যাতে প্রথমত : তাঁদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় কোন ধরনের ভুল ত্রুটি না থাকে এবং দ্বিতীয়ত : তাঁরা যেন মানুষের সাধনার মাধ্যমে অর্জিত সাধারণ জ্ঞান ছাড়াও অদৃশ্য জগতের,অতীতের ও ভবিষ্যতের জ্ঞানও লাভ করতে পারেন। অবশ্য নবীদের জন্য শুধু জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের নবুয়্যতের ব্যাপারে মানুষের মনে যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে, সেজন্য তাঁরা কিছু মোজেজা বা অলৌকিক শক্তিরও ক্ষমতা রাখেন। মোজেজা দেখার ফলে মানুষ সাধারণত নবীদের কথা শোনে ও তাঁদের নির্দেশ মেনে চলে।

হযরত ঈসা নবীর জন্মই ছিল এক মোজেজা। আল্লাহর ইচ্ছায় মারিয়াম (সা.) কোন স্বামী ছাড়াই ঈসা নবীকে জন্ম দেন এবং তিনি জন্মের পর পরই দোলনায় থেকে মানুষের সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু এতসব মোজেজার পরও ঈসা (আ.) নবী হিসেবে বনি ইসরাইল জাতির কাছে গিয়ে তাদেরকে আরো কিছু মোজেজা দেখিয়েছিলেন যাতে তারা তাঁর ওপর ঈমান আনে। তিনি কাদা ও মাটি দিয়ে জীবন্ত পাখী সৃষ্টি করা ছাড়াও কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করেছেন,জীবিত করেছেন মৃতকে এবং জীবিতদের ঘরে কী ঘটছে তাও বলে দিতেন। এসবই হত আল্লাহর ইচ্ছায়। কারণ, কোন কিছু সৃষ্টি করা ও অদৃশ্যের খবর রাখা একমাত্র আল্লাহরই গুণ। কিন্তু আল্লাহ চাইলে যে কেউ এসব কাজ করতে পারে। হযরত ঈসা (আ.)'র প্রতি যারা ঈমান এনেছে,তাঁদের অধিকাংশই এই নবীর বিশেষ ধরনের জন্ম ও তাঁর ঐসব মোজেজা দেখে তাঁকে অতিমানব বা আল্লাহর পুত্র বলে ভুল ধারণা করেছে। আসলে তিনি আল্লাহর পুত্র নন। তিনি মারিয়াম (সা.)'র পুত্র। তাঁর মাধ্যমে যা কিছু ঘটেছে সেসব তাঁর ক্ষমতা ছিল না,সেসব ছিল আল্লাহরই ক্ষমতা।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমত : আল্লাহর প্রেরিত নবী ও আওলিয়ারা আল্লাহর শক্তি ও ইচ্ছার মাধ্যমে সৃষ্টি জগত ও প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব করতে পারেন এবং এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটাতে পারেন।

দ্বিতীয়ত : যদি আল্লাহর সৎ বান্দারা পৃথিবীতেই মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারেন,তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর পক্ষে পুনরায় মানুষকে জাগিয়ে তোলা মোটেই কঠিন কাজ নয়।

তৃতীয়ত : আল্লাহর ঘনিষ্ট ব্যক্তি বা আওলিয়াদের ব্যাপারে অতিরঞ্জিত কোন ধারণা রাখা ঠিক নয়। তারা মানুষের উর্ধ্বে অতিমানব বা আল্লাহর কাছাকাছি জাতীয় কেউ নন। এ ধরনের ধারণা তাওহীদ তথা একত্ববাদের বিরোধী।

সূরা আলে ইমরানের ৫০ ও ৫১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآَيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (50) إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ (51)

"ঈসা বললেন, আমার পূর্বে যে তাওরাত এসেছে আমি তার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং তোমাদের জন্য অতীতে হারাম করা হয়েছে এমন অনেক কিছুকে আমি হালাল বা বৈধ করবো। আর আমি তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের জন্য নিদর্শন এনেছি। তাই আল্লাহকে ভয় কর ও আমাকে অনুসরণ কর।" (৩:৫০)

"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং আল্লাহর ইবাদত কর। এটাই সরল পথ।" (৩:৫১)

হযরত মুসা (আ.) ছিলেন বনি ইসরাইলের নবী এবং তিনি তাদের জন্য ঐশী গ্রন্থ তাওরাত এনেছিলেন। এই আয়াতে হযরত ঈসা (আ.) বনি ইসরাইলদের বলছেন সেই মুসা নবীর খোদাই আমাকে পাঠিয়েছেন এবং আমি মুসা (আ.)'র ওপর অবতীর্ণ ঐশী গ্রন্থ তাওরাতকে সত্যিকারের ঐশী গ্রন্থ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছি। তোমাদের পাপের শাস্তি হিসেবে তাওরাতে উল্লেখিত কিছু নিষেধাজ্ঞাকে আমি তুলে নিচ্ছি। তবে শর্ত হলো, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে এবং আমার ধর্ম তথা ঐশী ধর্মকে মেনে চলবে। এরপর হযরত ঈসা (আ.) নিজেকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের প্রতিপালক। আর তাই আমাদের সবারই উচিত আল্লাহর দাসত্ব করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা। কারণ, এ পথই সরল ও মধ্যম পথ।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হলো,

প্রথমত : আল্লাহর নবীগণ একে অপরকে মানেন ও স্বীকার করেন। প্রত্যেক নবী তাঁর পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ ও নবীকে সত্য বলে ঘোষণা করেছেন।

দ্বিতীয়ত : নবীদেরকে পাঠানোর বিষয়টি একটি ঐশী বা খোদায়ী প্রক্রিয়া। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট গোত্রে বা সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সীমিত ছিল না।

সূরা আলে ইমরানের ৫২ ও ৫৩ নম্বর নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ (52) رَبَّنَا آَمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ (53)

"যখন ঈসা (আ.) তাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করলেন, তখন তিনি বললেন আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী? তাঁর শীষ্যরা বলল, আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী, আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস এনেছি। আপনি সাক্ষী থাকুন আমরা আত্মসর্মপনকারী।" (৩:৫২)

"হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যা অবতীর্ণ করেছেন তাতে আমরা বিশ্বাস করেছি এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং আমাদেরকে ঈসা (আ.)'র নবুওতের প্রতি সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন।" (৩:৫৩)

হযরত ঈসা (আ.)'র সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক অলৌকিক নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও বনি ইসরাইলের অধিকাংশ মানুষই ঈসা (আ.)'র প্রতি ঈমান আনেনি বরং তারা ঈসা নবীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বনি ইসরাইলের হাতেগোণা কয়েকজন মানুষ তাঁর ওপর ঈমান আনে। পবিত্র কোরআনে তাদেরকে হাওয়ারী বলা হয়েছে। 'হাওয়ারী' শব্দের অর্থ হলো- ‘বিচ্যুতির পথ ত্যাগকারী এবং সত্য পথের অনুসারী'। এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো-

প্রথমত : মুমিন ও ধর্ম বিশ্বাসীদের পরিচয় জেনে তাদেরকে সংঘবদ্ধ করা ধর্মীয় নেতাদের অন্যতম দায়িত্ব।

দ্বিতীয়ত : নবীরা জনগণকে আল্লাহর জন্য সাথে চান, নিজের জন্য নয়। এজন্যেই হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেন, কে আল্লাহর পথে সাহায্যকারী হবে?

তৃতীয়ত : ঈমান বা বিশ্বাসের পরবর্তী ধাপ হলো,আল্লাহ ও তার নবীর বিধানের অনুসরণ করা। আর এটাই হলো,আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন। #

ট্যাগ