এপ্রিল ২২, ২০১২ ১৬:২২ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৩৫ থেকে ৩৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরা ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا (35)

"যদি তোমরা উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে তার বংশ থেকে একজন সালিশ নিয়োগ কর। যদি তারা মীমাংসা কামনা করে,তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং সবার মনের কথা জানেন ।" (৪:৩৫)

এই আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতভেদ দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য পারিবারিক আদালত গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বলা হচ্ছে, যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ চরমে পৌঁছে, তাহলে উভয় পক্ষের পরিবারকে এই দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে। বিবাদ যেন তালাক পর্যন্ত না গড়ায় সেজন্য তাদেরকে সক্রিয় থাকতে হবে এবং স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের অধিকার রক্ষার জন্য উভয় পক্ষের পরিবার থেকে একজন করে সালিশ বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে হবে। সালিশদের কাজ হলো স্বামী ও স্ত্রীর আচরণ সংশোধনের লক্ষ্যে তাদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করা। সমঝোতা প্রতিষ্ঠাই তাদের কাজ। কারো বিচার করে শাস্তি দেয়া তাদের কাজ নয়। ইসলামী এই প্রথার বিশেষ কিছু সুবিধে রয়েছে।

প্রথমত : এরফলে পারিবারিক সমস্যার কথা দুই পরিবারের বাইরে কেউ জানতে পারে না এবং এতে করে পরিবারের মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকে।

দ্বিতীয়ত : মধ্যস্থতাকারীরা সংশ্লিষ্ট পরিবারের মধ্য থেকে নির্বাচিত হওয়ায় পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য তারা আন্তরিক হয়ে থাকেন।

তৃতীয়ত : মধ্যস্থতাকারীরা উভয়পক্ষের মাধ্যমে মনোনীত হন বলে দু'পক্ষের পরিবারই তাদের রায় মেনে নেয়।

চতুর্থত : পারিবারিক আদালত সত্য ও মিথ্যা নির্ণয় বা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোন একজনকে শাস্তি দেয়ার জন্য গঠিত হয় না। কারণ, এসব প্রশ্ন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আরো বাড়িয়ে দেয়। বরং পারিবারিক আদালত স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতভেদের বিষয়গুলো উপেক্ষা এবং উভয়ের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির পথ নির্ণয়ের চেষ্টা করে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমত : পরিবারগুলোর মধ্যে বিবাদ ও তিক্ততার ব্যাপারে আত্মীয় স্বজন এবং সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের উচিত নয় এ ব্যাপারে উদাসীন থাকা। রোগ দেখা দেয়ার আগে জীবন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া উচিত তেমনি তালাক বা বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়ার আগেই তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত : সালিশ বা মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে। উভয়ই শুধুমাত্র একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে পারবেন।

তৃতীয়ত : মানুষ যদি সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ কর্ম করে থাকে তাহলে আল্লাহও তাদেরকে সাহায্য করেন এবং এরফলে তারা ঐসব কাজে সফল হয়।

সূরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا (36)

"তোমরা আল্লাহর বন্দেগী বা দাসত্ব কর। কোন কিছুকে তার শরীক করবে না। বাবা-মা আত্মীয়স্বজন এতিম বা দরিদ্র নিকট ও দূরের প্রতিবেশী সঙ্গী সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারীকে ভালোবাসেন না।" (৪:৩৬)

একজন মোমেন ব্যক্তির পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াতের পর পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে মোমেন ব্যক্তির সামাজিক দায়িত্বগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধারাক্রমের কারণ হলো,মানুষ যেন এটা না ভাবে যে তারা শুধু স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যাপারেই দায়িত্বশীল। বরং আল্লাহর উপর ঈমান রাখা ও আল্লাহর ইবাদত করা ছাড়াও মানুষের উচিত তাদের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী এবং দাস-দাসী ও অধীনস্থদেরসঙ্গে ভালো ব্যবহার করা বা তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকা। বিশেষকরে এতিম ও অনাথদের ব্যাপারে দায়িত্ব অনুভূতি থাকা এবং তাদের সেবা ও উপকার করার ব্যাপারে উদাসীন না থাকা খুবই জরুরী। একটি দুঃখজনক ব্যাপার হলো, অনেক ছেলে মেয়েরা বিয়ের পর বাবা মাকে ভুলে যায় এবং আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখে।

এ আয়াতের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দয়া ও দান খয়রাত করাকে মানুষের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত দরিদ্র ও নিঃস্বদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে দান খয়রাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শুধু গরিব বা দরিদ্রদের দয়া করতে হবে এমন কোন বাধ্য বাধকতা নেই। অন্যদের জন্য যেকোন ভালো বা কল্যাণকর কাজ করা উচিত। যেমন- মা-বাবার সেবা করা এবং তাদেরকে ভালোবাসাও সবচেয়ে ভালো কাজের অন্যতম দৃষ্টান্ত। আয়াতের শেষাংশে বাবা-মা, এতিম, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও পথচারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে এবং যারা এদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না তাদেরকে অহংকারী ও দাম্ভিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমত : এ আয়াতে যেমন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করাকে মানুষের দায়িত্ব বলা হয়েছে তেমনি মানুষ ও আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করা এবং তাদের দয়া করাকেও মানুষের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটাই ইসলাম ধর্মের পরিপূর্ণতা ও সামাজিক বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গীর প্রমাণ।

দ্বিতীয়ত : শুধুমাত্র নামায, রোজা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ইবাদতই যথেষ্ঠ নয়, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও আল্লাহকে মনে রেখে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাধনা করতে হবে। তা না হলে মানুষ শিরকে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য।

তৃতীয়ত : মহান আল্লাহর পর মা-বাবা, সন্তানদের জন্ম দেয়া ও লালন পালনে মৌখিক ভূমিকা রাখেন। তাই বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন ও তাদের সুখ এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করাও সন্তানের দায়িত্ব।

চতুর্থত: এতিম, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অধীনস্থ কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা করা প্রত্যেক মানুষের জন্যেই জরুরী।

এই সূরার ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'লা বলেছেন,

الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا (37)

"যারা কৃপণতা করে ও মানুষকে কৃপণতার শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দান করেছেন তা গোপন করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না। তিনি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।" (৪:৩৭)

এ আয়াতে বলা হচ্ছে, একদল মানুষ প্রচুর অর্থ ও সম্পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নিজেরা তো দান-খয়রাত করেই না একইসঙ্গে অন্যরাও গরীবদের দান করুক তা চায় না। কৃপণতা এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী তাদের মধ্যে এত বিস্তৃত যে, এমনকি তারা নিজেদের বেলায়ও জীবন উপকরণ পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করে না। দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষেরা তাদের সম্পদের কথা জেনে ফেলে হয়তো হাত পাততে আসবে এ ভয়ে তারা সম্পদ লুকিয়ে রাখে। পবিত্র কোরআন এই কৃপণতাকে ঈমানের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন এবং এ ধরনের মানুষকে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী বা কাফের হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, কঠিন শাস্তি ও লাঞ্ছনাই তাদের প্রাপ্য।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমত : কৃপণতার মতো কোন কোন মানসিক রোগ অনেক শারীরিক রোগের মতই ব্যাপক ও সংক্রমক। কৃপণ লোকেরা অন্যদের দয়া ও দান খয়রাতের জন্যও বাধা।

দ্বিতীয়ত : আল্লাহর দেয়া বিভিন্ন নেয়ামতের শোকর করার একটা পন্থা হলো, নিয়ামতগুলোর কথা উল্লেখ্য করা ও সেগুলো ভোগ করা। আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের কথা গোপন করার অর্থ হলো নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা।

সূরা নিসার ৩৮ ও ৩৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

وَالَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَمَنْ يَكُنِ الشَّيْطَانُ لَهُ قَرِينًا فَسَاءَ قَرِينًا (38) وَمَاذَا عَلَيْهِمْ لَوْ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقَهُمُ اللَّهُ وَكَانَ اللَّهُ بِهِمْ عَلِيمًا (39)

"যারা মানুষকে দেখানোর জন্য দান করে এবং পরকাল ও আল্লাহর প্রতি যাদের ঈমান নেই,আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না এবং যাদের সহচর শয়তান সে কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী । (৪:৩৮)

"যদি তারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতো এবং আল্লাহ তাদের যা দিয়েছেন তা থেকে দান করতো তাহলে তাদের কি ক্ষতি হতো? আল্লাহ তাদের বিষয়ে ভালো জানেন।" (৪:৩৯)

আগের আয়াতের বক্তব্য পূর্ণ করার জন্য এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, কৃপণতার মনোভাব মানুষকে আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। কারণ যাকাত দেয়া ও দান খয়রাত করা ঈমানের জন্য জরুরী এবং যারা এই ফরয বা আল্লাহর নির্দেশিত অবশ্যপালনীয় কর্তব্য পালনে বিরত থাকে তারা নিজেদের সম্পদকে আল্লাহর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়। সাধারণত এ ধরনের লোক কোন সময়ই তেমন কোন দান খয়রাত করে না। যদি কখনো দান খয়রাত করেও থাকে তা সামাজিক মর্যাদা বা সম্মান রক্ষার জন্যে করে থাকে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান খয়রাত করে, তাদের ক্ষেত্রে দান করা আর না করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বরং লোক দেখানোর দান খয়রাত গোনাহ বলে এজন্য শাস্তিও পেতে হবে।#

 

ট্যাগ