২০১৯-০৯-০৭ ২০:৫৯ বাংলাদেশ সময়

শোভাময় মাছকে কতভাবে শ্রেণী বিভাজন করা হয় এবং সেগুলোর রূপবৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা বলেছিলাম যে, এইসব শোভাময় মাছের অস্তিত্ব ইরানে প্রাচীনকাল থেকেই ছিল।

সবচেয়ে বেশি যে মাছগুলো ইরানে পাওয়া যায় তা হলো গোল্ডেন ফিশ মানে সোনালি কিংবা লাল রঙের মাছ। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক ইরানির বাসাতেই কাঁচের জারে সাধারণত এই গোল্ড ফিশ ছিল এবং এখনও থাকে। এই মাছগুলো বেশ চঞ্চল প্রকৃতির। বছরের শুরুতে বিশেষ করে বর্ষবরণকালে এই মাছ শোভা বর্ধন করার পাশাপাশি প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতীক হিসেবেও ইরানিরা বাসায় রেখে আসছে। নওরোজে যে হাফত-সিন সাজানোর সংস্কৃতি ইরানের ঐতিহ্যের অংশ, সেই হাফত-সিনের টেবিলে এই মাছ রাখা একটা প্রাচীন প্রথা।

ইরান বিশাল  বিস্তৃত একটি দেশ। এ দেশের জলসীমাও বেশ বিস্তীর্ণ। উত্তরে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগর আর দক্ষিণে রয়েছে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগর। এইসব সাগরজলে রয়েছে অনন্য সাধারণ সব মাছ এবং মাছ জাতীয় সম্পদ। দক্ষিণের সমুদ্রজলে রয়েছে বিচিত্র শোভাময় মাছের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এখানকার শোভাময় মাছ বেশিরভাগই রপ্তানি করা হয় বিভিন্ন দেশে। বিশ্বের শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ শোভাময় মাছই বসবাস করে প্রবাস সমৃদ্ধ সমুদ্রজলে। ইরানের দক্ষিণ উপকূল যেমন কিশ দ্বীপ, খর্ক, সিরি, বুশেহর, হরমুজগান এবং গেনাভে ইত্যাদি সমুদ্র উপকূলও সেই প্রবাল সমৃদ্ধ। প্রবাল দিয়েই গড়ে উঠেছে এইসব সমৃদ্ধ উপকূল।

এইসব সমুদ্র উপকূল শোভাময় মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শত শত প্রকারের শোভাময় মাছ রয়েছে সারা বিশ্বে। এর মধ্যে অন্তত ৮০ প্রকারের মাছ কেবল ইরানেই পাওয়া যায়। টনে টনে মিষ্টি কিংবা নোনাজলের এই শোভাময় মাছ ইরান থেকে বাইরের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ কীশ দ্বীপের কথাই ধরা যাক। এই দ্বীপটিতে রয়েছে একটা প্রাকৃতিক অ্যাকুরিয়াম। সেখানে বিভিন্ন প্রকারের শোভাময় মাছ দেখতে পাওয়া যাবে। এগুলোর মাঝে মোরগ মাছ নামে এক প্রকারের শোভাময় মাছ আছে সেগুলোকে জীবিত শিকার করে প্লাস্টিকের ব্যাগে পানি ঢুকিয়ে বিশেষ উপায়ে ইতালিতে পাঠানো হয়। প্লাস্টিকের ওই ব্যাগের দুই তৃতীয়াংশ পানিতে পূর্ণ আর এক তৃতীয়াংশ থাকে ফাঁকা।

বাসাবাড়ি বা অফিস-আদালতে অ্যাকুরিয়াম তৈরি করে বিভিন্ন প্রকার শোভাময় মাছ সংরক্ষণ করা একদিকে যেমন শোভাবর্ধনের উপায় অপরদিকে এটা একটা আনন্দ ও শখের বিষয়। যারা এই আনন্দ নিতে চান তারা প্রচুর অর্থ খরচ করে নিজেদের বাড়িতেই ছোট্ট একটি সামুদ্রিক বিস্ময় স্থাপন করে রাখেন। অনেক পয়সা খরচ  করে তারা এই শখটি মিটিয়ে থাকেন। এ কারণেই বিশ্ববাজারে এই শোভাময় মাছের অর্থমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এই অ্যাকুরিয়াম ফিশ মাটি, কাঁচ, ধাতব বক্সে লালন পালন করা যায়। অ্যাকুরিয়ামের বিভিন্ন ডিজাইন রয়েছে। কেউ একেবারে ঘরের মতো ডিজাইন করে ঘরেই রাখেন। কেউ গোলাকার কিংকা ক্যাপসুল আকারের অ্যাকুরিয়াম তৈরি করেন। বিশ্বব্যাপী এই অ্যাকুরিয়াম তৈরি একটা শিল্পে পরিণত হয়েছে এখন।

ইরানে অ্যাকুরিয়াম শিল্পের ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন বলা যাবে না। প্রায় অর্ধ শতাব্দিকাল আগে থেকে এই শিল্পের প্রচলন হয়েছে। ইরানে অবশ্য অ্যাকুরিয়াম তৈরির বহু কারখানা রয়েছে এখন। নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সার্বিক দিক নিশ্চিত করেই এই অ্যাকুরিয়াম তৈরি করা হয়। ইরানিদের সংগ্রহে প্রায় দুই শ প্রকারের শোভাময় মাছ রয়েছে। বছরে বিশ কোটির মতো শোভাময় মাছ উৎপাদন করে ইরান। এইসব মাছ দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। তুরস্ক, আজারবাইজান, আর্মেনিস্তান এবং ইরাক ইরানের শোভাময় মাছের উল্লেখযোগ্য ক্রেতা। 'ক্লাউন লোচ' ইরানে উৎপন্ন মিষ্টি পানির অন্যতম শোভাময় মাছ। লোচ প্রজাতির মাছের মধ্যে ক্লাউন লোচই সবচেয়ে বেশি রঙীন এবং সুপরিচিত। এগুলোর আচরণ এবং ঘুরে বেড়ানো বেশ উপভোগ্য।

সমুদ্রের তলদেশের সৌন্দর্য কেবল এই রঙীন মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং প্রবালের সৌন্দর্যও দেখার মতো। বিশ্বব্যাপী সৌখিন এবং ধনী মানুষেরা অনেক টাকা খরচ করে সমুদ্রের প্রবাল দিয়ে তাদের ঘরের কিংবা অফিসের অথবা মার্কেটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার স্বার্থে অ্যাকুরিয়াম সাজায়। মাঝারি সাইজের একটি প্রবালের বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে তিন শ ডলারের মতো। অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরানের সম্ভাব্য আরেকটি উচ্চমূল্যবান বস্তু হলো সামুদ্রিক উদ্ভিদ। বিশ্বব্যাপী বছরে চল্লিশ লাখ টনের মতো জলজ উদ্ভিদ চাষ হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব বাজারে ইরানের সমুদ্র শৈবালের একটা বিশেষ স্থান রয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল এবং খাদ্য শিল্পে ব্যবহার করা হয় এইসব সমুদ্র শৈবাল। ইরানী সমুদ্র শৈবালের অন্যতম প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন ও জাপান।

যাই হোক অ্যাকুরিয়াম ফিশ শিল্প বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠায় ইরানে এই শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে এই মাছ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণও ক্রমশ বাড়ছে। এই শিল্পটি বিদেশি মুদ্রা আহরণের অন্যতম একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সুতরাং মৎস্য শিল্পের বিকাশ ইরানে যে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ০৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য