২০১৯-১০-১৫ ২২:২৮ বাংলাদেশ সময়

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম কেরমানশাহ প্রদেশের সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি প্রদেশ হামেদানে।

হামেদান প্রদেশে রয়েছে ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক নানা নিদর্শন। বিশেষ করে এখানকার আলিসাদর গূহার প্রাকৃতিক বিস্ময়ের সঙ্গে খানিকটা পরিচিত হয়েছি আমরা। বলেছিলাম যে ১৯৯৪ খৃস্টাব্দে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক বিস্ময়কর এই আলীসাদ্‌র গুহার উপর গবেষণা চালিয়ে বলেছেন,এটি বিশ্বের অন্যান্য গুহার তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এবং নিশ্চিতভাবে এই গুহাটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ পানিগুহা। প্রকৃতপক্ষে, আলোর ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হওয়ায় কিংবা আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ আবিষ্কার হওয়ার পর এ গুহার গভীরতা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে মানুষ জানতেই পারেনি এ গুহা এত দীর্ঘ হবে। ১৯৯১ সালে আলিসাদ্‌র ট্যুরিজম কোম্পানি পুরো এলাকার উন্নয়নকাজ শুরু করে। গুহা মুখের বাইরে হোটেল, অতিথিশালা, কাঠনির্মিত ভিলা এবং তাঁবু গাড়ার মতো প্রশস্ত জায়গা অহরহ এবং সহজলভ্য। এছাড়াও আছে বিনোদনের জন্যে সিনেমা-থিয়েটার ও খেলারমাঠ। খাওয়া-দাওয়ার জন্যে আছে রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা। সবমিলিয়ে আলীসাদ্‌র গুহা মনোরম একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবেও বিখ্যাত। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পানিগুহা আলীসাদ্‌র নিয়ে আজ আর কথা নয়। আজ যাবো লালজিন শহরের দিকে। এই শহরের বিচিত্র সৌন্দর্যের সঙ্গে আমরা পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

আমরা জানি না এখন পর্যন্ত আপনারা হামেদান ভ্রমণ করেছেন কিনা। করে থাকলেও হামেদান-কেরমানশাহ রাস্তা ধরে যাবার সময় আপনার বাস, মিনিবাস কিংবা গাড়ি পশ্চিম ইরানের চমৎকার একটি অবকাশ যাপনকেন্দ্রে থেমেছে কিনা। যেখানে মৃৎ শিল্পের বিচিত্র সংগ্রহ যে কারুরই দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। বিশাল একটি শপিং মল। চারু, কারু, মৃৎশিল্পের বিচিত্র পণ্য সামগ্রীই বিক্রি হয় এখানে। ছোটো, বড়ো, মাঝারি সব সাইজেরই মৃৎশিল্প রয়েছে এখানে। শিল্পমনা যারা তারা এসব কাজ দেখে একবার অন্তত চোখ বুলাতে বাধ্য হবেন। মৃৎশিল্পের ওপর দেওয়া বিচিত্র রঙের চকচকে প্রলেপ, সেগুলোর নকশা, ডিজাইন ইত্যাদি রসিক মনকে আকৃষ্ট না করে পারে না। হামেদান কিংবা কেরমানশাহ সফরে গিয়ে এই বিচিত্র সংগ্রহশালাটি একবার না দেখে আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

অনেকেই জানে যে লালজিন হচ্ছে ইরানের মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। বরং বলা যায় লালজিনই ইরানের মৃৎশিল্পের প্রধান কেন্দ্র। অনেকেই মনে করেন লালজিন ইরানের ভেতরে যতোটা পরিচিত তারচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে দেশের বাইরে। লালজিন শহরটি ইরানের মৃৎশিল্প রপ্তানির শীর্ষস্থানীয় শহরের মর্যাদা লাভ করেছে। লালজিন শহরে প্রবেশ করার সময় একটা বড় ময়দান মানে স্কোয়ার পড়বে। সেখানে একটি সুন্দর ভাষ্কর্য রয়েছে। ভাষ্কর্যটি একটি পাথরের ওপর স্থাপিত। একজন মৃৎশিল্পী ওই পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি মৃৎশিল্পের নমুনা শোভা পাচ্ছে। তার পাশেই আরো কয়েকটি মৃৎ পাত্র রয়েছে নীল রঙের। বেশ সুন্দর দেখতে ওগুলো। এদের একটি কলসির মতো। এইসব ভাষ্কর্য থেকে বোঝা যায় এই এলাকাটি মৃৎশিল্পের এলাকা। ছবি যারা তোলেন মানে ফটোগ্রাফার যারা তাদের জন্য চমৎকার একটি স্পট এটি।

 

২০১৬ থেকে ফার্সি চার শাহরিভার মানে খ্রিষ্টিয় ২৫ আগস্ট তারিখে ‘আন্তর্জাতিক মৃৎশিল্প শহর’ হিসেবে এই লালজিনকে নির্বাচন করা হয়েছে এবং সেই থেকে ২৫ আগস্টে লালজিন শহরে প্রতি বছর বিশ্ব মৃৎশিল্প উৎসব পালন করা হচ্ছে। এই উৎসবের কারণে লালজিন শহর ব্যাপক পরিচিতি পায় সারা বিশ্বব্যাপী। বিশ্ব হস্তশিল্পের গুণমান যাঁরা বিচার করেন তাদের একটি দল ২০১৭ সালের শুরুতে এই লালজিন শহর সফর করেন। তারা এই শহরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। এখানকার মৃৎশিল্প তৈরির কারখানাগুলো ঘুরে ফিরে দেখেন এবং দোকানপাট বিশেষ করে মৃৎশিল্প বিক্রির দোকান এবং বাজারও ভালো করে দেখেন। ঘুরে ফিরে দেখার পর লালজিন শহরটিকে ‘বিশ্ব মৃৎশিল্প শহর’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন।

লালজিন শহরটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের মৃৎশিল্প তৈরির কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত। লালজিন শহরের শতকরা আশি ভাগ লোকজন কোনো না কোনোভাবে এই মৃৎশিল্প কেন্দ্রিক কাজের সঙ্গে জড়িত। কেউ সরাসরি মৃৎশিল্প তৈরি করেন অর্থাৎ কুমারবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। কেউ সিরামিক কাজের সঙ্গে জড়িত। কেউবা আবার মৃৎশিল্প কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। লালজিন এই মৃৎশিল্পের গুণগত মান এবং প্রাচীনত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই লালজিনের মৃৎশিল্প রপ্তানি হয়ে আসছে এবং এখানকার মৃৎশিল্পের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। আরব দেশগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় বড় ফুলদানি ব্যবহার করে বেশি। এইসব ফুলদানিতে দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন ও নকশা করা হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইসলামি মৌলিক ডিজাইনকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফুলদানির বাইরেও প্লেট, বাটি, পটারি, মোমদানি, বিচিত্র ডিজাইনের কলসি  এবং জগও তৈরি করা হয় এখানে।

লালজিনে কিছু কিছু মৃৎশিল্প তৈরি করা হয় বেশ নকশাবহুল এবং উন্নত ডিজাইনের। বাহারি রঙ এবং ডিজাইনের এসব মৃৎশিল্প সাধারণত ইউরোপ আমেরিকায় বেশি ব্যবহৃত হয়। সুতরাং এ ধরনের মৃৎশিল্প সামগ্রী ইউরোপ আমেরিকাতেই রপ্তানি হয় বেশি। এগুলোর মধ্যে ফুলদানির পাশাপাশি গৃহসজ্জার জন‍্য ব্যবহার্য প্লেট, বাটিসহ আরও বহু রকমের তৈজস রয়েছে। এগুলো ঘুরে ফিরে দেখার সুযোগ রয়েছে লালজিন শহরে। এই শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় প্রচুর মৃৎশিল্প কারখানা রয়েছে। ভ্রমণকারীরা এগুলো দেখে নিশ্চয়ই অভিভুত না হয়ে পারেন না। কীভাবে বানানো হয় এগুলো সে বিষয়ে খানিকটা ধারনা নেয়াটা মনে হয় অযৌক্তিক নয়। কারখানাগুলোর জন্য মৃৎপাত্র তৈরির প্রয়োজনীয় মাটি শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম দাস্তজের্দ্ থেকে সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে মাটিগুলো নিয়ে কাদা বানানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়। মাটির সঙ্গে পানি মিশিয়ে বড় পাত্রে মাখানো মিশ্রিত করা হয়। কয়েকটি পর্ব পেরুবার পর পাত্র তৈরির উপযোগী কাদায় পরিণত হয়।

মৃৎশিল্প সামগ্রী তৈরির জন্য এক ধরনের চরকা আছে। ওই চরকার সাহায্যে সামান্য একটু কাদা দিয়েই অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি করে ফেলতে পারেন কাঙ্ক্ষিত পাত্র। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য