২০১৯-১০-২৪ ১৬:২৭ বাংলাদেশ সময়

গত আসরে আমরা বিশ্বব্যাপী মাছ বাজারজাত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছিলাম। যেমন মাছ জীবিন্ত সরবরাহ করা, কেটে আঁশ এবং কাঁটা ফেলে দিয়ে প্যাকেটে সরবরাহ করা হয়, ফ্রোজেন বা জমাটবদ্ধ করার মাধ্যমে, শুটকি, গ্যাসের ধোঁয়ায় শুকানোর মাধ্যমে, লবণে রেখে, মাছ দিয়ে সস তৈরি করে, ক্যানজাত করে ইত্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতিতে বাজারজাত করা হয়।

এইসব পদ্ধতির কল্যাণে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ার পথ সুগম হয়েছে।

সেইসঙ্গে বলেছি যে মাছ রান্নারও রয়েছে বিভিন্ন প্রক্রিয়া। কেউ রেঁধে খায়, কেউ কাবাব করে খায়, কেউ গ্রিল করে আবার কেউ ভর্তার মতো করে। অনেকেই আবার মাছের সসেস পছন্দ করে। বাঙালি যেহেতু ভাতে মাছে বাঙালি, সুতরাং মাছ খাওয়ার পক্রিয়া তাদের ভালোই জানা আছে। যাই হোক আজকের আসরে আমরা আলোচনা করবো ইরানের তেল-বহির্ভুত রপ্তানি পণ্য নিয়ে। বিশেষ করে  শুকনো খুরমা নিয়ে আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।

খুরমা বাংলাভাষীদের কাছে 'খুরমা খেজুর' নামেই পরিচিত। ইরানে শুধু খুরমা বলা হয়। খুরমার খাদ্যমান বেশ উন্নত। বলা হয়ে থাকে যে প্রায় চার শ রকমের খুরমা ইরানে রয়েছে। সাধারণত ইরানের দক্ষিণাঞ্চলেই এই খুরমা বেশি পাওয়া যায়। খুরমাকে বেহেশতি ফল বলে মনে করা হয়। ঐশী গ্রন্থগুলোতে খুরমার নাম উচ্চারিত হয়েছে বহুবার। এর রহস্যটা হতে পারে খুরমার ভেতর রয়েছে বহু উপকারি উপাদান। যদিও বলা হয়ে থাকে যে খুরমা বৃক্ষ সেই দ্বিতীয় ভূতাত্ত্বাকি যুগেই আবিষ্কৃত হয়েছে তবে কোনো কোনো গবেষক বলছেন আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে মানুষ খুরমার খাদ্যমান বা পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে পেরেছে। প্রাচীন দলিল দস্তাবেজ যেসব পাওয়া গেছে মিশর, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ফিলিস্তিনের জনগণের লেখা পুরোণো তথ্যপঞ্জিতে পাওয়া যায় বিশেষ করে আশুরি, ব্যাবলনীয় যুগে খোরমা কেনাবেচার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ আইন বা নীতিমালা অনুসরণ করা হতো।

খোরমা নিশ্চয়ই দেখেছেন এবং খেয়েছেন আপনারাএকটিমাত্র বিচি থাকে খোরমার ভেতরে। গরম এলাকার ফল এটি। খোরমা গাছ যে ঠিক কোন এলাকায় প্রথম চাষ করা হয়েছিল সুস্পষ্টভাবে তথ্য দেওয়া কঠিন। তবে অনেকেই খোরমা গাছকে এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা মেসোপটেমিয় এলাকার বলে মত দিয়েছেন। আবার অনেকেই বলেছেন আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলেই প্রথম খোরমা গাছ বেড়ে উঠেছিল এবং এই খোরমাকে খুবই মূল্যবান এবং ওষুধি গুণ সম্পন্ন বলে মনে করা হতো। শুকনো কিংবা গরম আবহাওয়ায় যেখানে পানির তেমন সংকুলান নেই সেরকম অনুর্বর পরিবেশেও খোরমা গাছ বেড়ে ওঠে সহজেই। খোরমা গাছ সাধারণত ১০ থেকে বিশ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। খোরমা বাগানের ছায়ায় মানব বসতিও গড়ে উঠেছিল বাসোপযোগী পরিবেশের কারণে।

বিশ্বের বঞ্চিত এলাকার জনগণের মূল খাবার ছিল খোরমা। একইসঙ্গে দুর্গত এলাকার জন্যও সবচেয়ে উপযোগী খাবার এই ফলটি। বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য, ভূমিকম্প বিধ্বস্ত এলাকার জন্য, যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকা কিংবা খরাপীড়িত এলাকার জন্যও সবচেয়ে উপযোগী খাবার হলো খোরমা। অসংখ্য খাদ্যগুণ ও পুষ্টিগুণ থাকার কারণে খোরমাকে কৃষিজ কৌশলগত খাদ্যপণ্য বলেও মনে করা হয়। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের অনেকেই মনে করেন এক গ্লাস উটের দুধের সঙ্গে দৈনিক একটি করে খোরমা খেলে একজন মানুষের পুরোদিনের খাবারের পুষ্টি চাহিদা মিটে যায়। খুরমায় রয়েছে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট। ৪৫০ গ্রাম খোরমা এক হাজারেরও বেশি পরিমাণ কিলোক্যালোরি শক্তি যোগায়। সুগার ছাড়াও খোরমায় রয়েছে পানি, বিচিত্র মিনারেল যেমন-ফসফরাস, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ক্যালসিয়াম ইত্যাদি। এর বাইরেও রয়েছে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন এ, বি,সি, এবং ই। আরও রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার বা আঁশ।

কেবল খোরমাই নয় বরং খোরমার বীচিতেও রয়েছে প্রচুর প্রোটিন, ফ্যাট, ক্যালসিয়াম এবং ফাইবার। মরুপ্রান্তীয় মানুষেরা খোরমার বীচি দিয়ে রুটি তৈরি করে। অনেকে আবার খোরমার সঙ্গে একটু মিষ্টি মিশিয়ে পানীয়ও তৈরি করে। খোরমা দিয়ে যে খাবারই তৈরি করা হোক না কেন মানব দেহের জন্য সেটাই ব্যাপক উপকারী। উচ্চ পর্যায়ের খাদ্যমানের কারণে খোরমা ভেজিটেরিয়ান বা সব্জিভোগীদের কাছেও বেশ প্রিয় একটি খাবার। আমাদের শরীরে যে খাদ্য শক্তির প্রয়োজন হয় খেজুর তা অল্প সময়ের মধ্যেই পূরণ করে। খেজুর দূর করে শুষ্ক কাশি। এজমার জন্যও এটি উপকারী। উচ্চমাত্রার শর্করা,ক্যালরি ও ফ্যাটসম্পন্ন খেজুর জ্বর, মূত্রথলির ইনফেকশন, যৌনরোগ, গনোরিয়া, কণ্ঠনালির ব্যথা বা ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা,শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী।

খোরমার বিচিত্র উপকারী দিক নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। খোরমা মস্তিষ্ককে প্রাণবন্ত রাখে। যাদের হার্টের সমস্যা আছে তাদের জন্য খেজুর খুবই উপকারী। খেজুর লৌহসমৃদ্ধ ফল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রক্তে লৌহিত কণিকার প্রধান উপাদানের অভাবে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। খেজুর লৌহসমৃদ্ধ বলে এই রক্তশূন্যতা দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। শিশুদের জন্যও খেজুর খুব উপকারী। খোরমা যৌবন শক্তি অর্জনের পাশাপাশি শরীরে অ্যানার্জি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ত্বকের সজীবতার জন্য, দৈহিক সুস্থতার জন্য এমনকি আত্মিক প্রশান্তির জন্যও খোরমা বেশ ইতিবাচক। খোরমায় ম্যাগনেসিয়াম থাকার কারণে এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকার কারণে এর মধ্যে রয়েছে উন্নত মানের ক্যানসার প্রতিরোধক। শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধিতেও খোরমা তুলনাহীন একটি ফল। সব মিলিয়ে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে খোরমা। ইমিউন সিস্টেম আমাদের শরীরকে বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশন ও টক্সিন যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও পরজীবী যা চারপাশের পরিবেশ থেকে আসে তা থেকে সুরক্ষা দেয়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ২৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য