২০১৯-১১-০২ ১৬:৪০ বাংলাদেশ সময়

সুরা ফাজর্‌ পবিত্র কুরআনের ৮৯ তম সুরা। অবশ্য নাজিল হওয়ার আদি ধারাক্রম অনুযায়ী এ সুরা ছিল কুরআনের দশম সুরা।

মক্কায় নাজিল হওয়া অন্য অনেক ছোট সুরার মত সুরা ফজর্‌ও সুরময় ও ছন্দ-সমৃদ্ধ। ত্রিশ আয়াতের এ সুরায় রয়েছে অনেক সুসংবাদ ও হুঁশিয়ারি। 

সুরা ফাজরের প্রথমদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি শপথ। অভূতপূর্ব এসব শপথ জালিম ও বলদর্পীদের জন্য খোদায়ি শাস্তির সতর্কবাণীর ভূমিকা।  এরপর ইশারা করা হয়েছে আদ ও সামুদের মত শক্তিশালী জাতি এবং পরাক্রান্ত জালিম ফেরাউনের খোদাদ্রোহিতার কঠোর পরিণামের কথা। মানুষের জন্য পরীক্ষা, সৎকর্মে তাদের অবহেলা, পরকাল ও পুনরুত্থান, কাফের ও পাপীদের পরিণাম, মুমিনদের প্রশান্ত আত্মার অধিকারী হওয়ার মত পুরস্কার লাভের বিষয়েও বক্তব্য রয়েছে সুরা ফাজরে।

এ সুরার প্রথমদিকে ফাজর্‌ বা প্রভাতের, দশ রাতের, জোড় ও বেজোড়ের শপথ নেয়া হয়েছে।

ফজরের শুভ্র সফেদ আলোকিত পরিবেশ মহান আল্লাহর মহিমার অন্যতম নিদর্শন। অন্ধকার রাতের অবসান ঘটিয়ে প্রভাত বা ফজরের উন্মেশ ঘটে। জোরদার হতে থাকে আলোর কর্তৃত্ব। শুরু হয় জীবন্ত সত্তাগুলোর কর্ম তৎপরতা। অবসান ঘটে নিদ্রা ও নীরবতার। ভোর বেলায় অন্ধকারের পর্দা চিরে পূর্ব দিগন্ত থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আলোর বন্যা। অজ্ঞতার আঁধার চিরে ইসলামের উন্মেশকেও প্রভাত বা সূর্যোদয়ের সাথে তুলনা করা যায়। মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদির (আ) অভ্যুত্থানকেও তুলনা করা যায় প্রভাতের সঙ্গে। কারণ তিনিও জুলুম ও অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়া বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করবেন সত্য আর ন্যায়বিচাররূপ আলোর কর্তৃত্ব। আশুরার ঐতিহাসিক ও অনন্য মহাবিপ্লব এবং খোদাদ্রোহিতা ও কুফরির বিরোধী অন্য সব বিপ্লবগুলোকেও প্রভাত বা ফজরের সাথে তুলনা করা যায়। এমনকি পাপীদের অন্ধকার হৃদয়েও যখন সচেতনতা ও জাগরণের প্রথম চেতনা বা স্ফুলিঙ্গ জেগে ওঠে এবং যে চেতনা তাদেরকে তওবার দিকে আহ্বান জানায় তাও ফজর বা প্রভাত-তুল্য।  

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, সুরা ফাজরে প্রভাতের যে শপথ নেয়া হয়েছে সেই প্রভাতে রাসূল (সা.) তায়েফে ছিলেন এবং তাঁর সাথে বারো হাজার লোক ছিল। তাঁরা সবাই তৃষ্ণার্ত ছিলেন এবং পানি পাওয়া  যাচ্ছিল না। অবশেষে মহানবী একটি পেয়ালা চেয়ে নিয়ে তাতে নিজ আঙ্গুল রাখলেন, অমনি চারটি ঝরনা প্রবাহিত হল এবং পুরো বাহিনী পানি পান করল। আবার কারো কারো মতে এ আয়াতে উল্লেখিত প্রভাত মানে আশুরার প্রভাত।

আর এ সুরায় উল্লেখিত দশ রাত প্রসঙ্গে বলা হয় (মুহাম্মাদ বিন নাস্‌র কিতাবুস সালাতে আবি উসমান হতে বর্ণনা করেছেন যে) মানুষ তিনটি দশ দিবসীয় দিনকে অত্যধিক সম্মান করত। যিলহজ ও মুহররমের প্রথম দশদিন এবং রমযানের শেষ দশ দিন। (তাফসীরে দুররে মানসূর, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ৩৪৬ দ্রষ্টব্য)

সুরা ফাজরের ২২ নম্বর আয়াতে কিয়ামত বা বিচার-দিবসের অবস্থা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: (২২) এবং যখন তোমার প্রতিপালকের আদেশ ও ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবে। -এখানে অনেক অনুবাদকই আক্ষরিক অনুবাদ করতে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাদের উপস্থিত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিপালকেরও উপস্থিত হওয়ার কথা লিখেছেন যা ভুল। আসলে এখানে লিখতে হবে স্বয়ং প্রতিপালক নয় বরং তার আদেশ সেখানে উপস্থিত হবে। অবশ্য আদেশ শব্দটি এ আয়াতে উহ্য আছে। আয়াতটি নিঃসন্দেহে মুতাশাবিহ বা উপমা বা তুলনা-জাতীয় আয়াতের অন্তর্ভুক্ত যাকে মুহকাম বা দ্ব্যর্থহীন আয়াতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে হবে। পবিত্র কুরআনের একটি দ্ব্যর্থহীন আয়াত হল ‘কোন কিছুই তাঁর মত নয়।’পবিত্র কুরআনের বর্ণনা মতে মহান আল্লাহ এমন এক সত্তা যিনি সব কিছুর সঙ্গে রয়েছেন ও সমগ্র অস্তিত্ব-জগতকে ঘিরে আছেন এবং সর্বাবস্থায় সবস্থানে বিরাজমান। তাই তাঁর মত অসীম সত্তার ক্ষেত্রে কাজের জন্য আগমণের বিষয়টি সুস্পষ্ট আয়াত ও বুদ্ধিবৃত্তিরও পরিপন্থী। কারণ যে সত্তা কোন কাজের জন্য স্থানান্তরের মুখাপেক্ষী অবশ্যই সে সীমিত সত্তা এবং সীমিত সত্তার পক্ষে কখনই অসীম জ্ঞান ও অসীম শক্তির অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। তাই আসা-যাওয়ার মত অপূর্ণতার বৈশিষ্ট্যটি মহান আল্লাহর ন্যায় পূর্ণ সত্তার ক্ষেত্রে কখনই প্রযোজ্য নয়।

সূরা শুরার ১১নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ: কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়।  এ আয়াতটি পবিত্র কুরআনের একটি দ্ব্যর্থহীন আয়াত। এ আয়াতে কোন কিছুই আল্লাহর সদৃশ ও অনুরূপ নয় বলা হয়েছে। এর অর্থ তাঁর সঙ্গে কোন বস্তু ও সত্তারই বিন্দুমাত্র মিল নেই। আয়াতটির অর্থ কখনই এমন নয় যে, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন সত্তার একশভাগ মিল নেই অর্থাৎ হুবহু তাঁর মত কেউ নেই কিন্তু মানুষ বা অন্য কোন বস্তুর সাথে তার (নাউজুবিল্লাহ) চেহারার মিল রয়েছে শুধু এ পার্থক্য ছাড়া যে, তাঁর আকৃতি বড় যেমনটি আল্লাহর দৈহিক সত্তায় বিশ্বাসীরা মনে করে থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সে সসীম এক সত্তায় পরিণত হবে যার পক্ষে অসীম কোন কিছু ধারণ করা সম্ভব হবে না এবং এমন সত্তা অন্য বস্তু ও সত্তারই বৃহত্তর এক রূপ বলে গণ্য হবে যা বিশ্ব জগত দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আছে। যিনি বিশ্বজগতের ও বস্তুগুলো স্রস্টা তিনি এর দ্বারা গঠিত ও বেষ্টিত এবং সৃষ্টির ন্যায় সীমাবদ্ধ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারেন না। কোন দিক থেকেই তাঁর জন্য সৃষ্টির অনুরূপ হওয়া অসম্ভব। আয়াতটিতে এ বিষয়ের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সুরা ফাজরের ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

 (১৫) মানুষ তো এরূপ যে, তার প্রতিপালক যখন তাকে পরীক্ষা করেন এবং তাকে সম্মান দান করেন ও অনুগ্রহ করেন তখন সে বলে, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে করেছেন সম্মানীত ।’(১৬) এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার জন্য তার জীবিকাকে সংকুচিত করেন তখন সে বলে, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে হীন করেছেন।- মানুষের প্রতি আল্লাহর পরীক্ষায় দেখা যায় সাধারণত মানুষকে যখন মহান আল্লাহ সম্মান ও নেয়ামত দান করেন তখন সে অহংকারী হয়ে পড়ে এবং বলে, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে করেছেন সম্মানীত। আর যখন তাকে পরীক্ষা করার জন্য রিজক বা রুজি কমিয়ে দেন তখন সে হতাশ হয়ে বলে, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে হীন করেছেন। অথচ মানুষের জানা উচিত খোদায়ি পরীক্ষা হচ্ছে মানুষের জন্য বিকাশ ও পূর্ণতার চাবি। মহান আল্লাহ কখনও কাউকে বা কোনো গোষ্ঠীকে বিপুল নেয়ামত দিয়ে কিংবা কখনও বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যারা কৃতজ্ঞ ও বুদ্ধিমান তারা অনেক নেয়ামত বা সম্পদ পেয়ে অহংকারি হন না এবং অভাব বা বিপদের সময়ও আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হয়ে পড়েন না বা তাকে অপমান করা হয়েছে বলে মনে করেন না। বরং সব অবস্থায় সম্মান ও গৌরবের মানদণ্ড হল ঈমান ও খোদাভীতি। এরপর সুরা ফাজর্‌-এ আল্লাহ থেকে মানুষের দূরে থাকার কারণ ও তাদের বিপত্তির কারণ তুলে ধরা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন, এরূপ কখনও নয় তথা আল্লাহ কখনও তোমাদের বিনা কারণে অপমান করেন না, বরং তোমরা  ইয়াতিম বা পিতৃহীনদের সম্মান কর না, (১৮) এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদের অন্নদানে মানুষকে উৎসাহিত কর না।-

ইয়াতিমদের খাবার দিয়ে তাদের ক্ষুধা মেটানোই যথেষ্ট নয়। ইয়াতিমদের মনে যে স্নেহ না পাওয়ার ঘাটতি আছে তা মেটানো তাদের ক্ষুধা মেটানোর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াতিমদের এতই স্নেহ করতে হবে ও তাদের এতই আনন্দের মধ্যে রাখতে হবে যে তারা যেন কখনও বাবা-মা না থাকার কথা মনেই করতে না পারে। ইয়াতিমের লালন-পালন ও তাদের প্রফুল্ল রাখার কাজ মানুষের ঈমান জোরদার করে এবং তা সাফল্য ও সৌভাগ্য বয়ে আনে। সুরা ফাজরের শেষাংশে তথা ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াতে মুমিনদের প্রশান্ত আত্মাকে অত্যন্ত স্নেহ ও সম্মান দেখানো হয়েছে।  মহান আল্লাহ বলছেন: হে প্রশান্ত চিত্ত বা আত্মা!(১) তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে এস সন্তুষ্টচিত্তে ও সন্তোষভাজন হয়ে, আমার  প্রেমিক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও,  এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।-

ঈমান যখন সুনিশ্চিত বা ইয়াকিনের পর্যায়ে পৌঁছে তখন তা প্রশান্ত হয়। তার ওই প্রশান্তিতে থাকে প্রিয়তম ও প্রকৃত মাবুদের সন্তুষ্টি। তাই আল্লাহ তাকে দেন আদর্শ দাস হবার মেডেল বা মুকুট ও তাকে আদর্শ দাস হবার পোশাক দিয়ে সম্মান জানান। যারা সব সংকট ও পরীক্ষার ঘূর্ণাবর্তেও ঈমানে দৃঢ় ও অবিচল থাকেন তাদের এই ঈমান তাদেরকে কিয়ামতের অশেষ ভয়, ত্রাস ও উৎকণ্ঠাজনক পরিস্থিতির মাঝেও রাখবে প্রশান্ত। অনেকেই মনে করেন হযরত ইমাম হুসাইনের অনন্য ঈমান ও ত্যাগ-তিতিক্ষার অনাগত সাফল্যকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এই আয়াতে। মহান আল্লাহ আমাদেরকেও যেন এমন উচ্চ স্তরের ঈমান দান করেন। #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/০২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য