২০১৯-১১-০৬ ১৬:৩৫ বাংলাদেশ সময়

ইসলামের ইতিহাসের সব ইমাম তাঁদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যুক্তপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতেন।

কখনো রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে এবং কখনো আলেম ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ধর্ম ও দ্বীনি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলতেন। সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনি শিক্ষা প্রচার করার কাজে ইমামগণ সবচেয়ে বেশি আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এজন্য তাঁরা ছোট ছোট বাক্যে এবং অল্প কথায় খুতবা আকারে নিজেদের বক্তব্য পেশ করতেন। ইমাম জাওয়াদ (আ.)ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না।

উপদেশবাণী মানুষের অন্তরে কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে তা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত জাওয়াদ (আ.) বলেন: বক্তা যার কথা বলে শ্রোতা তার উপাসনা করে। বক্তা যদি আল্লাহর কথা বলে তাহলে শ্রোতা আল্লাহর উপাসনা করবে এবং বক্তা যদি শয়তানের কথা বলে তাহলে শ্রোতাও শয়তানের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং তার আনুগত্য করতে শুরু  করবে। 

বর্তমানে গণমাধ্যমের যুগে ইমামের এই বক্তব্যের প্রতি অতীতের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কারণ, এসব গণমাধ্যমের বেশিরভাগই বর্তমান যুগের অপশক্তিগুলোর পক্ষে কথা বলছে।

এসব গণমাধ্যম মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত করে তাকে ধর্মবিমুখ করে তোলার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ অবস্থায় সাধারণ মানুষকে এই অপশক্তির ফাঁদ থেকে উদ্ধার করার জন্য কী করণীয় রয়েছে? ইমাম জাওয়াদ (আ.) এ সম্পর্কে বলেন: ঈমানদার মানুষের সঠিক পথে চলার জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন: এক, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তৌফিক বা সাহায্য, দুই, সহজাত প্রবৃত্তি বা বিবেকের আহ্বানে সাড়া দেয়া এবং তিন, সঠিক পথে পরিচালনাকারী উপদেশ গ্রহণ করা।

আল্লাহ তায়ালার তৌফিক ছাড়া মানুষের পক্ষে ঈমান বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই তৌফিক লাভের শর্ত হচ্ছে মানুষকে বিবেকের ডাকে সাড়া দিতে হবে এবং কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই করতে হবে। উদাসীনতায় গা ভাসিয়ে দিলে আল্লাহর সাহায্য লাভ করা যায় না। কিন্তু কেউ যদি দীর্ঘদিন কুপ্রবৃত্তির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে সঠিক পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যায় তাহলে তার পক্ষে আর বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে হকের পথে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এরকম অবস্থায় কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাকে সঠিক পথের দিশা দিতে এগিয়ে আসে তাহলে তার উপদেশমূলক কথা ওই লক্ষ্যচ্যুত ব্যক্তিকে সৎপথে ফিরিয়ে আনতে পারে। 

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নবী বংশের পবিত্র ঈমানগণ নিজ নিজ যুগের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন এবং তাদেরকে সিরাতুল মুস্তাকিমে চলার দিশা দিতেন। একইসঙ্গে পরবর্তী ইমামগণ প্রয়োজনে তাঁদের পূর্ববর্তী ইমামদের বক্তব্য উদ্ধৃত করতেন। ইমাম জাওয়াদ (আ.) হযরত আলী (আ.)’র ভাষণ উদ্ধৃত করে বলেন, “যে কেউ আল্লাহ তায়ালার ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করে তাকে আল্লাহ সুখী জীবন দান করেন এবং জীবনে তার চলার পথ সহজ করে দেন। আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এমন একটি দূর্গ যেখানে শুধুমাত্র ঈমানদার ব্যক্তিরা আশ্রয় পায়। পরহেজগারি বা খোদাভীতি মানুষের মর্যাদা বাড়ায় এবং লোভ মানুষকে ধ্বংস করে। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব একটি সমাজকে সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় করে। অন্যের ছিদ্রান্বেষণকারী ব্যক্তি নিজেই অপমানিত হয় এবং অপরকে গালি দিলে তা নিজের দিকে ফিরে আসে।” ইমাম জাওয়াদ (আ.) আরো বলেন, “কেউ তাকওয়া বা খোদাভীতির বীজ বপন করলে সে তার সুমিষ্ট ফল ভোগ করতে পারে এবং তার সামনে থাকা বিপদ-আপদ দূর হয়ে যায়। এবং যদি কেউ জীবনযুদ্ধে ধৈর্য ধারণ করতে পারে তাহলে তার বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

বিশ্বের সকল মানুষ দুঃখ-কষ্ট থেকে দূরে থাকতে এবং শান্তিময় জীবনযাপন করতে চায়। সেইসঙ্গে সে চায় এমন কারো ওপর নির্ভর করতে যে তাকে সব ধরনের বিপদ আপদ থেকে নিরাপদে রাখবে।

ইমাম জাওয়াদ (আ.) এ সম্পর্কে আরো বলেন, “দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত হয়ে সুখময় জীবন যাপনের জন্য আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। এরপর তিনি একটি ঘোরতর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেন, ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে বেদআত বা নতুনত্ব আনয়ন দ্বীনকে ধ্বংস করে দেয়।  যে আমল বা কাজ খালি চোখে ধর্মীয় ও ভালো কাজ বলে মনে হয় এবং মানুষ সওয়াব লাভের আশায় করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলামে যে আমলের কোনো অস্তিত্ব নেই তাকে বেদআত বলে।  এক কথায় কুরআন ও হাদিস দ্বারা স্বীকৃত নয় সমাজে প্রচলিত এমন প্রতিটি ধর্মীয় কাজ ও আচরণই বেদআত।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুনাফিক ও খারেজিদের মাধ্যমে এই ভয়াবহ বিপজ্জনক কাজগুলো চালু হয়েছে যা মুসলিম সমাজের প্রচণ্ড ক্ষতি সাধন করেছে। বর্তমান যুগেও ওহাবি, বাহায়ি, কাদিয়ানি এবং দায়েশসহ অন্যান্য তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অতীতের সেই মুনাফিক ও খারেজিদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে মুসলিম সমাজের ক্ষতি করে যাচ্ছে। ঠিক এ কারণে ইমাম জাওয়াদ (আ.) বেদআত সম্পর্কে বারবার সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, বেদআদ গোটা দ্বীনকেই ধ্বংস করে ফেলতে পারে।

ইমাম জাওয়াদ (আ.) তাঁর বক্তব্যে সমাজ পরিচালনার জন্য সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের কথা তুলে ধরে মূলত ইমামের যুগের অযোগ্য ও অসৎ নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তৎকালীন খলিফা মামুনুর রশিদ এবং তার ভাই মু’তাসিম সারাক্ষণ এই ভয়ে তটস্থ থাকতেন যে, কখন না জানি ইমাম জাওয়াদ (আ.) তাদের ক্ষমতার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ান। এ কারণে তারা ইমামের গতিবিধির ওপর ঘনিষ্ঠ দৃষ্টি রাখার জন্য নবম ইমামকে মদীনা থেকে বাগদাদে নিয়ে আসেন। অবশ্য শাসকগোষ্ঠী ইমামের প্রতি বাহ্যিক সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তাঁকে এই অজুহাতে বাগদাদে নিয়ে আসেন যে, প্রখ্যাত আলেমদের সঙ্গে ইমামকে ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নিতে হবে।

কিন্তু আব্বাসীয় খলিফাদের এ ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ইমাম জাওয়াদ (আ.) নিজের অনুসারীদেরকে রাজ দরবারে অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেন। ফলে ইমামের কিছু অনুসারী পরিচয় গোপন করে আব্বাসীয় খেলাফতের উঁচু পদ গ্রহণ করতে সক্ষম হন। মামুনের মৃত্যুর পর ক্ষমতা গ্রহণকারী মু’তাসিম গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে ইমামের এসব তৎপরতার কিছু কিছু জানতে পারে। এ কারণে সে ইমামকে চিরতরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র আঁটে। ইমাম জাওয়াদ (আ.)’র অন্যতম স্ত্রী ও মামুনুর রশিদের কন্যা উম্মুল ফাজলের মাধ্যমে ইমামের খাবারে বিষপ্রয়োগ করা হয়। এর ফলে ২২০ হিজরিতে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইসলামের এই মহান ইমাম শাহাদাতবরণ করেন।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য