২০১৯-১১-০৭ ১৬:৫৬ বাংলাদেশ সময়

ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির জীবন ও দর্শন নিয়ে আমরা কথা বলছি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে।

এ প্রসঙ্গে তার কয়েকটি বই বা রচনা নিয়েও আমরা বিস্তারিত কথা বলেছি। প্রতীকধর্মী গল্প ও রহস্যময় উপমায় সমৃদ্ধ সোহরাওয়ার্দির দু'টি বই 'জিব্রাইলের পাখা বা পালকের আওয়াজ' ও 'পিপড়া বা উই পোকার কথোপকথন' নিয়েও আমরা কথা বলেছি গত কয়েক পর্বে। আজ আমরা তার আরও একটি বিখ্যাত বই নিয়ে আলোচনা করব। তার এই বিখ্যাত ছোট্ট বই বা পুস্তকের নাম 'রিসালাহ ফি হাক্বিক্বাতাল ইশক' বা 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধ্যাত্মিক প্রেম বা খোদাপ্রেম নিয়ে এ পর্যন্ত যত বই লেখা হয়েছে সেসবের মধ্যে এমন সুন্দর বই খুব কমই লেখা হয়েছে। অত্যন্ত সুন্দরভাবে লেখা এ বই পরিপক্কতা, মানানসই কবিতা ও প্রতীকধর্মীতায় সমৃদ্ধ। বাহ্যিকভাবে এ পুস্তকের গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হযরত ইউসুফ ও ইয়াকুব নবী আর জোলায়খা। কিন্তু এ গল্পের মর্মার্থ পুরোপুরি ইরফান ও দর্শনের শিক্ষায় পরিপূর্ণ।  আসলে সোহরাওয়ার্দি তার দর্শন ও ইরফানি চিন্তাধারাকে তুলে ধরার জন্য এ পুস্তিকায় গল্প, কবিতা ও রহস্যময় নানা ধরনের প্রতীক বা উপমা ব্যবহার করেছেন।

ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির  'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা' শীর্ষক বই তার লেখা প্রতীকধর্মী অন্য বইগুলোর চেয়ে বেশ কিছুটা ভিন্ন ধরনের। মহান আল্লাহ থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতা এবং পৃথিবীতে তার নির্বাসিত ও অসহায় একাকীত্ব অবস্থার দুঃখ-বেদনা সোহরাওয়ার্দির অন্যান্য পুস্তকের মূল বক্তব্য।  কিন্তু প্রেমের বাস্তবতা শীর্ষক তার এ বইটিতে কেবল প্রেম বিষয়ক বক্তব্য বা চিন্তাধারাই স্থান পেয়েছে। 'প্রেম' ও তার দুই ভাই 'সৌন্দর্য' এবং 'দুঃখ বা বিরহ' সৃষ্টির  বিষয়ে বক্তব্য এসেছে এ বইয়ে। আসলে সোহরাওয়ার্দির 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা' শীর্ষক বইটিকে পবিত্র কুরআনের সুরা ইউসুফের কাব্যধর্মী ও শৈল্পিক তাফসির বা বিশ্লেষণ বলা যায়। এই কাহিনী ও ব্যাখ্যা বা তাফসির বুঝতে হলে ইরানের প্রথাগত সাহিত্য-রীতি এবং ইসলামী ও ইরানি আধ্যাত্মিক প্রেমের জ্ঞান বা ইরফান সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। কারণ এ বইয়ে ব্যবহার করা হয়েছে এইসব তত্ত্ব ও দার্শনিক বা ইরফানি জ্ঞান। এতে ব্যবহার করা হয়েছে সেই বিখ্যাত হাদিস যাতে বলা হয়েছে: মহান আল্লাহ সব কিছুর আগে সৃষ্টি করেছেন আকল্ বা বুদ্ধিবৃত্তিকে।

এভাবে শেইখ সোহরাওয়ার্দি আক্‌ল্, সৌন্দর্য ও ইশক্ বা প্রেম সৃষ্টির কাহিনী পুননির্মাণ করেছেন এবং এরপর সৃষ্টিশীল জরুরি এই পটভূমিকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন খোদাপ্রেমের পথ-পরিক্রমা বা পর্যায় হিসেবে মারেফাত বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান, ভালবাসা বা মুহাব্বাত এবং ইশক বা প্রমের স্টেশনগুলোকে!  

শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির  'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা' শীর্ষক বইয়ে বলছেন, মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন আক্‌ল্‌ বা বুদ্ধিবৃত্তি। এরপর আক্‌ল্‌কে দিয়েছেন তিনটি বৈশিষ্ট্য: প্রথমত স্বয়ং আল্লাহকে চেনার গুণ, মানুষকে চেনার গুণ ও অন্যকে চেনা তথা অন্য কথায় সোহরাওয়ার্দিকে চেনার গুণ। আকলের  প্রথম এই গুণ তখা খোদাকে চেনার গুণ থেকে সৃষ্টি হল 'সৌন্দর্য', দ্বিতীয় বৈশিষ্ট থেকে সৃষ্টি হল 'প্রেম' এবং তৃতীয় গুণ থেকে সৃষ্টি হল 'দুঃখ বা বিরহ'।

সোহরাওয়ার্দি তার শৈল্পিক ও রহস্যময় ব্যাখ্যায় আরও লিখেছেন: 'সৌন্দর্য' সৃষ্টি হয়েছে নিজ সৌন্দর্য থেকে, তাঁর মুচকি হাসি থেকে সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার ফেরেশতা।  'প্রেম ও ভালবাসা' এবং 'সৌন্দর্যে'র পারস্পরিক বন্ধন থেকে সৃষ্টি হয়েছে আকাশ ও ভূমণ্ডল।  আর এসব ঘটেছে হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টির আগেই। যখন হযরত আদমের যুগ এলো তখন মহান আল্লাহ তাঁর প্রতিনিধিকে নিয়োগ দিলেন ভূপৃষ্ঠে।  'সৌন্দর্য' এ বিষয়টি জানল এবং 'মাটির আদমের সঙ্গে' সফর করতে গেল। আদমকে দেখা সেই একই বিষয় এবং তার স্নেহের বন্ধনে ফেঁসে যাওয়া সেই একই বিষয়! 'সৌন্দর্য' আদমের সমস্ত অস্তিত্বে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক দিন চলে গেল। 'সৌন্দর্য' তার নিজ দেশে ফিরে যায় না। তার দুই ভাই 'প্রেম' ও 'দুঃখ' বা বিরহ সৌন্দর্যের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং তাকে খুঁজতে থাকে। তারা 'সৌন্দর্য'কে খুঁজে পায়। এ সময় 'সৌন্দর্য' আদমের সিংহাসন বা খাটে হেলান দিয়েছিল। তারাও সেখানে ঢুকতে চাইল। কিন্তু তাদেরকে ঢুকতে দেয় না । 'প্রেম' ও 'দুঃখ' এবং সব ফেরেশতা ও উচ্চ জগতের বাসিন্দা আদমের মহাগৌরব ও মহত্ত্ব দেখে সিজদা করলেন।  

সোহরাওয়ার্দি তার শৈল্পিক ও রহস্যময় ব্যাখ্যায় আরও লিখেছেন: হযরত আদমের পর 'সৌন্দর্য' নিজের জন্য নতুন জায়গা খুঁজতে থাকে এবং  হযরত ইউসুফ নবীর কাছে পৌঁছে।  'সৌন্দর্য' ইউসুফের মধ্যে ঝুলে গেল। 'সৌন্দর্যে'র ভাইগুলো আবারও তার ব্যাপারে অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা কিছুই করতে পারল না। কারণ, 'সৌন্দর্য' ও ইউসুফের মধ্যে আর কোনো পার্থক্যই রইল না। সৌন্দর্যের দুই ভাই প্রেম ও দুঃখ হতাশ হয়ে যায় এবং তারা একে-অপরের দেশের দিকে রওনা হয়। দুঃখ যায় কানানে তথা ফিলিস্তিনে এবং সেখানে দুঃখের ঘরে ইয়াকুব নবী তথা হযরত ইউসুফের পিতার সঙ্গী হয়ে তার সঙ্গে একাকার হয়ে যান।  এই একাত্মতা এত গভীর হয় যে ইয়াকুব নবী দুঃখের কাছে তাঁর দৃষ্টিশক্তিকে  উপহার দেন।  অন্য ভাই 'প্রেম'ও যেতে থাকে এবং যেতে যেতে মিশরে পৌঁছে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য