২০১৯-১১-০৭ ১৭:২২ বাংলাদেশ সময়

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে  সূরা আস-সাফফাতের ৩১ থেকে ৩৮ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৩১ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَحَقَّ عَلَيْنَا قَوْلُ رَبِّنَا إِنَّا لَذَائِقُونَ (31) فَأَغْوَيْنَاكُمْ إِنَّا كُنَّا غَاوِينَ (32) فَإِنَّهُمْ يَوْمَئِذٍ فِي الْعَذَابِ مُشْتَرِكُونَ (33)

“সুতরাং আমাদের বিপক্ষে আমাদের পালনকর্তার প্রতিশ্রুতিই সত্য হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে আমাদেরকে (আজাবের) স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।" (৩৭:৩১)

“(হ্যাঁ) আমরা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলাম। কারণ আমরা নিজেরাও ছিলাম পথভ্রষ্ট।" (৩৭:৩২)

“সুতরাং তারা সেদিন (আল্লাহর) শাস্তিতে (পরস্পরের) অংশীদার হবে।” (৩৭:৩৩)

গত আসরে আমরা বলেছি, পার্থিব জীবনে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তারা কিয়ামতের দিন তাদের গোনাহের দায় কাফের সর্দার ও পথভ্রষ্ট সমাজের নেতার ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করবে। তারা বলবে, এই নেতারাই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে। কিন্তু সেসব নেতা সেদিন জবাব দেবে, তোমরা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলে। অবাধ্য ও অহংকারী আত্মার অধিকারী ছিলে বলে তোমরা আল্লাহকে অনুসরণ না করে আমাদেরকে অনুসরণ করেছ। আমরা তোমাদেরকে জোর করে আমাদের অনুসরণ করতে বাধ্য করিনি। আমরা আগে থেকেই পথভ্রষ্ট ছিলাম; তোমরা আমাদেরকে অনুসরণ করতে আসার পরই কেবল আমরা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছি।

এরপর আজকের এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: কাফির ও মুশরিক নেতারা তাদের অনুসারীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ তর্ক করার পর এ সত্য উপলব্ধি করবে যে, আজ কিয়ামতের দিন এসব বেহুদা তর্কবিতর্ক করে লাভ হবে না। কারণ, তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর নির্দেশ জারি হয়ে গেছে এবং তাদেরকে এখনই জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা এবং তাদের অনুসারীদের সবাইকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই জাহান্নামের মধ্যে তাদের অপরাধ অনুযায়ী শাস্তির তারতম্য হবে। কিন্তু শাস্তি থেকে কেউই বাঁচতে পারবে না।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-

১- কিয়ামতের দিন অপরাধী ব্যক্তিরা একথা স্বীকার করবে যে, নবী-রাসূলরা পার্থিব জীবনে যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা আজ সত্য হয়েছে। কিন্তু সেদিনের স্বীকারোক্তি কোনো কাজে আসবে না।

২- পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা ও চলাফেরা করলে ভালো মানুষেরও পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দুনিয়াতে এ ধরনের মানুষের সঙ্গে থাকলে পরকালেও তাদের সঙ্গেই জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।

৩- অপরাধী ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদেরকে সমাজের নেতা বানালে সমাজে জুলুম ও পাপাচারই কেবল বাড়ে। এ ধরনের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জন্য জাহান্নামের শাস্তি অপেক্ষা করছে।

সূরা সাফফাতের ৩৪ ও ৩৫ নম্বর মহান আল্লাহ আয়াতে বলেছেন:

إِنَّا كَذَلِكَ نَفْعَلُ بِالْمُجْرِمِينَ (34) إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ (35)

“(হ্যাঁ) অপরাধীদের সাথে আমি এমনি ব্যবহার করে থাকি।” *৩৭:৩৪)

“(কারণ) যখন তাদের বলা হতো, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত।” (৩৭:৩৫)

গোনাহগার ও অপরাধী ব্যক্তিদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার শাশ্বত আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: যখন নবী-রাসূলগণ আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর ইবাদত করার জন্য মানুষকে আহ্বান জানাতেন তখন কিছু মানুষ অহংকার করত এবং তারা সেই আহ্বান শুনতে কিংবা সে সম্পর্কে চিন্তা পর্যন্ত করতে রাজি ছিল না। এ ধরনের মানুষ অহংকার ও গোঁয়ার্তুমির কারণে কুফর ও শিরকের পথ বেছে নিয়েছিল বলে কাল কিয়ামতের ময়দানে তাদেরকে ভয়ঙ্কর শাস্তি ভোগ করতে হবে। 

কখনো কখানো ধন-দৌলত, পদমর্যাদা, বংশগৌরব ও ক্ষমতার বড়াই দেখাতে গিয়ে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সামনে এই উদ্ধত আচরণ করে আবার কখনো কখনো সমাজের বিপথগামী মানুষ অথবা পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করতে গিয়ে তারা আল্লাহর আহ্বানের সামনে ঔদ্ধত্ব দেখায়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, সত্যের আহ্বান মানুষের কানে পৌঁছার ও তা উপলব্ধি করার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে অহংকার। এই দম্ভ মানুষকে এতটা বিপথগামী ও পথভ্রষ্ট করতে পারে যে, সে আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতেও দ্বিধা করে না।

এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে সংঘটিত হতে যাওয়া যেসব ঘটনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার প্রত্যেকটি বাস্তবায়িত হবে এবং এর কোনো ব্যত্যয় হবে না।

২- মহান আল্লাহর সামনে উদ্ধত ও দাম্ভিক আচরণ হচ্ছে সব গোনাহ, অপরাধ ও পথভ্রষ্টতার মূল উৎস।

৩- নবী-রাসূলগণ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন; তাদের নিজেদের দিকে নয়। এই আহ্বান জানানোর ফলে ব্যক্তিগতভাবে তারা কখনো লাভবান হননি বরং সব সময় ইসলামের শত্রুদের অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন।

সূরা সাফফাতের ৩৬ থেকে ৩৮ নম্বর পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

) وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا آَلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ (36) بَلْ جَاءَ بِالْحَقِّ وَصَدَّقَ الْمُرْسَلِينَ (37) إِنَّكُمْ لَذَائِقُو الْعَذَابِ الْأَلِيمِ (38)

“এবং (মুশরিকরা) বলত, আমরা কি এক উম্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব।” (৩৭:৩৬)

“(কখনোই এমন নয়) বরং, তিনি সত্যসহ আগমন করেছেন এবং (অতীতের) রসূলগণের সত্যতা স্বীকার করেছেন।” (৩৭:৩৭)

“নিশ্চয় তোমরা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) বেদনাদায়ক শাস্তি আস্বাদন করবে।” (৩৭:৩৮)

এই তিন আয়াতে নবী-রাসূলদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করার সময় মুশরিকদের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: তারা অভিযোগ করত, নবী-রাসূলগণ কবিদের মতো আবেগতাড়িত ও কল্পনাপ্রসূত কথাবার্তা বলেন। তারা আরো দাবি করত, জিনপরীদের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে প্রভাবিত হয়ে নবী-রাসূলগণ সাহিত্যচর্চা করেন। তাদের নিজেদের বলার কিছু নেই। ইতিহাসে এসেছে, আরব উপত্যকার মানুষ বিশ্বাস করত, কবিদের সঙ্গে জিনদের সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের সম্পর্ক ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষে এত সুন্দর সাহিত্যকর্ম উপহার দেয়া সম্ভব নয়। কবিদের সম্পর্কে তাদের এই ধারনা তারা নবী-রাসূলদের ওপরও চাপিয়ে দিয়েছিল।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রতি অটল থাকার মানসিকতা সত্য গ্রহণের পথে অন্যতম অন্তরায়।

২- নবী-রাসূলদের আহ্বান মানুষের মাঝে যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য ইসলাম-বিদ্বেষীদের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে অবজ্ঞা করা ও কুৎসা রটনা।

৩- সব নবী-রাসূলের দাওয়াতের বিষয়বস্তু ছিল একই। তাঁরা সবাই মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদ ও একমাত্র তাঁর ইবাদত করার দিকে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন।# 

 

ট্যাগ

মন্তব্য