নভেম্বর ১২, ২০১৯ ১৬:৩০ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম কেরমানশাহ প্রদেশের সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি প্রদেশ হামেদানের লালজিন শহরের দিকে। লালজিন শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি গ্রাম দাহানগের্দ। কৃষিকাজের দিক থেকে ওই গ্রামটির অবস্থান উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে যব, ভুট্টা, গোল আলু, শসাসহ বাগানে উৎপন্ন শস্য ও বিচিত্র ফলও উৎপাদিত হয় এই গ্রামে।

দাহানগের্দ গ্রামের আঙুরের সুনাম ইরানের সর্বত্র রয়েছে। সোনালি রঙের থোকা থোকা আঙুরের গুচ্ছ যদি দাহানগের্দের আঙুর বাগানে একবার ঝুলন্ত অবস্থায় কেউ দেখতে পায় সত্যি সত্যিই অবাক হয়ে যাবে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাবে। আঙুর সমৃদ্ধ এই গ্রাম থেকে আমরা এবার যাবো পশ্চিম ইরানেরই আরেকটি প্রদেশ লোরেস্তানে। বিশেষ করে লোরেস্তানের কেন্দ্রিয় শহর খুররামাবাদে সরাসরি চলে যাবো আমরা এবং ঘুরে বেড়াবো শহরের আনাচে কানাচে।

ইরানের পশ্চিমাঞ্চল সফরে গেলে গুরুত্বপূর্ণ এবং চমৎকার যে শহরটি অবশ্যই দেখতে যাওয়া উচিত সেই শহরটি হলো খুররামাবাদ। অনেক অনেক ঝরনা আর ফোয়ারার জন্য বেশ খ্যাতি রয়েছে খুররামাবাদের। ঐতিহাসিক বহু দূর্গও রয়েছে এই শহরে। রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সবুজের সমারোহপূর্ণ গ্রামের পর গ্রাম। খুররামাবাদ শহরটি লোরেস্তান প্রদেশের কেন্দ্রিয় শহর। সুতরাং একটু সাজানো গোছানো তো হবেই। এর বাইরেও শহরটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে এখানকার চমৎকার কটি টিলা আর খুররামাবাদ নদীর কারণে। খুররামাবাদ নদীটি শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে। শহরটি কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। এই খুররামাবাদে রয়েছে কাসি, বাবেলি, সাসানি, সালজুকি এবং খাওয়ারেজমশাহী ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা নিদর্শন। খুররাম নাম থেকেই বোঝা যায় শহরটি কতোটা শ্যামল সবুজ আর স্নিগ্ধ। প্রাকৃতিক লীলাবৈচিত্রময় এবং চিত্তাকর্ষক দৃশ্যাবলিতে পূর্ণ এই খুররামাবাদ শহরের আবহাওয়াও খুবই মনোরম এবং উপভোগ্য।

যারা প্রকৃতিপ্রেমি কিংবা যারা ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন দেখতে পছন্দ করেন তাদের সকলের জন্য এই খুররামাবাদ একটি দেখার মতো শহর। শহরে ঢোকার মুখেই পড়বে আকাশচুম্বি একটি কেল্লা বা দূর্গ। ওই দূর্গের উপরে উঠলে বোঝা যাবে কত উঁচু কেল্লাটি। এই কেল্লাটি খুররামাবাদ শহরের গর্ব। স্থানীয় অধিবাসেীদের মুখে মুখে একটি পরিভাষা উচ্চারিত হয়, সেটা হলো 'খুরমুভে'। যাই বলা হোক না কেন এই কেল্লাটিকে খুররামাবাদ শহরের যে-কোনো এলাকা থেকেই দেখতে পাওয়া যায়। ফালাকুল আফলাক শব্দের অর্থ হলো আসমানগুলোর আসমান। এই কেল্লাটি সাসানি শাসনামলের হলেও অনেক শাসনামলেরই নীরব সাক্ষী। কেল্লাটি একটি টিলার ওপরে স্থাপিত। তার মানে কেল্লার ওপরে উঠলে খুররামাবাদ শহর এবং নদী পায়ের তলায় স্থান পায়। কেল্লা মানেই হলো সামরিক কাজে ব্যবহার হওয়া। বাদশারা যখন কেল্লায় প্রবেশ করতো তখন সামরিক কার্যক্রমই চালাতো তারা। সে কারণে কেল্লার ভেতরে বহু বিভাগ তৈরি করা হয়েছে।

ফালাকুল আফলাক কেল্লা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। বলছিলাম যে এই কেল্লার ভেতরে অনেক বিভাগ রয়েছে। যেমন নৃতাত্ত্বিক ও পুরাতাত্ত্বিক যাদুঘর। কেল্লার অভ্যন্তরে এই যাদুঘরটিও দেখার মতো। ফালাকুল আফলাক দূর্গ পেরিয়ে যাওয়া যেতে পারে কিউ হ্রদের দিকে। এই হ্রদটি খুররামাবাদের উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। খুররামাবাদের প্রাচীন নিদর্শন ও প্রাকৃতিক নিদর্শনের মধ্যে ফালাকুল আফলাক দূর্গের পরেই এই হ্রদটির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। কিউ নামের একটি পার্কের ভেতরে এই হ্রদটির অবস্থান। মাখমাল কূহ নামের পাহাড় থেকে আসা ঝরনার পানি থেকেই এই হ্রদটির জন্ম। কিউ স্থানীয় লোরি ভাষায় অর্থ দাঁড়ায় ধূসর কিংবা নীল। যেহেতু হ্রদের চারপাশ জুড়েই রয়েছে সবুজ বাগান, সেজন্য শীতকালে জলটৈটুম্বুর হ্রদের বুকে সেই বাগানের প্রতিবিম্ব পড়ে, পড়ে আকাশের নীলের মনোরম রঙের প্রতিবিম্বও। সে কারণেই এরকম নাম হয়েছে হ্রদটির। আবার গ্রীষ্মকালের শুরুতে কিংবা বসন্তের দিকে কিউ হ্রদ নৌকা ভ্রমণের জন্য উপযোগী এবং উপভোগ্য একটি স্পটে পরিণত হয়।

কিউ হ্রদের পর যাওয়া যেতে পারে বমে লোরেস্তানে। বম মানে হলো ছাদ। তার মানে দাঁড়ায় লোরেস্তানের ছাদ অর্থাছ সবচেয়ে উঁচু এলাকা। খুররামাবাদের মধ্যে পর্যটনের জন্য সবচেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় একটি স্থান এটি। বিশেষ করে রাতের বেলায় এখানকার দৃশ্য একেবারেই অন্যরকম। একবার ভাবুন আপনি লোরেস্তানের ছাদে অবস্থান করছেন রাত্রিবেলায়। চারদিকে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। আপনি যেদিকেই তাকাচ্ছেন শুধু আলো আর আলো, নানা রঙের নিয়ন বাতি আর গাড়িঘোড়ার লাইটের বহমান আলো, শহরের বাড়িঘরের আলো-সব দেখতে পাচ্ছেন। আনমনেই আপনার মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। সুতরাং পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের সবচেয়ে বড় বিনোদন ও অবকাশ যাপন কেন্দ্রের শিরোপা যে অর্জন করবে এই বমে লোরেস্তান তাতে আর অবাক হবার কী আছে।এখানকার আবহাওয়া আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানুষের বিশেষ করে ভ্রমণকারীদের মনটাকে সতেজ করে তোলে নিমেষেই। 

বমে লোরেস্তানের যে পরিবেশের কথা বললাম আমরা তার পাশাপাশি আপনি যদি সেখানকার স্থানীয় কারও অতিথি হিসেবে আপ্যায়িত হন তাহলে কেমন লাগবে। হ্যাঁ! এরকম রসম মানে রীতি রয়েছে এই এলাকায়।ঘর বাড়ি পরিষ্কার করে মেহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় রাত্রি যাপনের জন্য।এভাবে আতিথ্য বরণ করে সকাল বেলা যাওয়া যেতে পারে ঝরনার দিকে। সকাল বেলার ঝরনা অন্যরকম এক আবহ তৈরি করে প্রকৃতির পাশাপাশি মানরব প্রকৃতিতেও। পাশেই রয়েছে 'নওজিওন' নামে একটি ঝরনা। স্থানীয় লোকজন অবশ্য এই ঝরনাটিকে 'নওজিও' নামেও অভিহিত করে থাকে। সেই উর্ধ্ব অবস্থান থেকে একবার যদি ঝরনার নিম্ন পতনের দৃশ্যের দিকে তাকানো যায় ভয়ে আপনি কিছুটা ঘাবড়ে যেতে পারেন। তবে ঘাবড়ানোর আসলে কিছু নেই। পড়বেন না আপনি। পড়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়ার সকল ব্যবস্থাই রয়েছে এখানে। আপনার গাইড হয়তো আপনাকে এক ফাঁকে জানাতে পারে যে এই ঝরনাটির উচ্চতা মাত্র পঁচানব্বুই মিটার। মাথা ধরবে না তো আপনার ... হা হা হা।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য