নভেম্বর ২৩, ২০১৯ ১৬:২০ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানেরই আরেকটি প্রদেশ লোরেস্তানে। বিশেষ করে লোরেস্তানের কেন্দ্রিয় শহর খুররামাবাদে সরাসরি আমরা প্রবেশ করেছি এবং ঘুরে দেখেছি এখানকার শহরের আনাচে কানাচে কোথায় কী কী রয়েছে দেখার মতো, উপভোগ করার মতো। অনেক অনেক ঝরনা আর ফোয়ারার জন্য বেশ খ্যাতি রয়েছে খুররামাবাদের। ঐতিহাসিক বহু দূর্গও রয়েছে এই শহরে। রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সবুজের সমারোহপূর্ণ গ্রামের পর গ্রাম।

খুররামাবাদ শহরটি লোরেস্তান প্রদেশের কেন্দ্রিয় শহর। সুতরাং একটু সাজানো গোছানো তো হবেই। এর বাইরেও শহরটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে এখানকার চমৎকার কটি টিলা আর খুররামাবাদ নদীর কারণে। পাশেই রয়েছে 'নওজিওন' নামে একটি ঝরনা। স্থানীয় লোকজন অবশ্য এই ঝরনাটিকে 'নওজিও' নামেও অভিহিত করে থাকে। সেই উর্ধ্ব অবস্থান থেকে একবার যদি ঝরনার নিম্ন পতনের দৃশ্যের দিকে তাকানো যায় ভয়ে আপনি কিছুটা ঘাবড়ে যেতে পারেন। তবে ঘাবড়ানোর আসলে কিছু নেই। পড়বেন না আপনি। তো চলুন আজ এই 'নওজীবন' ঝরনার সৌন্দর্য দেখেই সফর শুরু করা যাক। এই ঝরনা দেখে আমরা সুযোগ পেলে আরও কিছু দর্শনীয় প্রাকৃতিক নিদর্শনের সঙ্গে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

নওজীবন ঝরনাটি বসন্ত ঋতুতে একেবারে পানিতে ভরপুর হয়ে যায়। এ সময় ঝরনা প্রবাহের পানি উপর থেকে আসে। এই ঝরনাটির সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে গেছে পরিপার্শ্বের সবুজ শ্যামল প্রকৃতির কারণে। ওষুধি গাছ গাছালিতে পরিপূর্ণ এই ঝরনার আশপাশ। ঝরনাকে স্থানীয় লোকজন 'টপ' বলেও অভিহিত করে থাকে। তাদের কথা উল্লেখ করে আপনাদের গাইড হয়তো বলবে এ এলাকার পাহাড়গুলো থেকে প্রচুর ঝরনা নীচে পতিত হয়। নওজীবনের পরই আপনাদের নজরে পড়তে পারে গ্রিথ ঝরনাকে। গ্রিথ ঝরনার সৌন্দর্য লোরেস্তানের সবচেয়ে সুন্দর এবং শ্যামলতম ঝরনা। সুতরাং ভাবতেই পারেন ঝরনাটি দেখতে কতোটা শুভ্র আর নয়নাভিরাম। এই ঝরনাটির একটা বিশেষত্ব রয়েছে। তা হলো ঝরনাটির সাতটি ধারা বয়ে গেছে একই উৎস থেকে সাত দিকে। পণর মিটার উচ্চতা থেকে পতিত এই ঝরনাটিকে ঝরনা না বলারও যেমন কারণ নেই তেমনি  উচ্চতাও এতো বেশি নয় যে মাথা ব্যথা করতে পারে দেখে।

খুররামাবাদ শহরের আশেপাশে ঝরনার সংখ্যা যে অনেক বেশি সে কথা আমরা আগেই বলেছি। এসব ঝরনার প্রতিটিই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। আমাদের পরামর্শ থাকবে আপনারা যারা খুররামাবাদে বেড়াতে যাবেন তারা অবশ্যই এইসব ঝরনার কেয়কটি অন্তত না দেখে ফিরবেন না। ইরানের অচেনা এই সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত না হয়ে যদি ফিরে যান পরবর্তীকালে দু:খ আর অনুতাপ প্রকাশ করার বিকল্প থাকবে না।

ঝরনা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। দুটো ঝরনার কথা বলেছি আমরা-একটি নওজীবন অপরটি গ্রিথ ঝরনা। এবারে বলা যাক মাখমাল কূহের কথা। মাখমাল কূহ এটি একটি পাহাড়। খুররামাবাদের লোকজন সপ্তাহান্তের অবসরে এই মাখমাল কূহ পর্বতের পাদদেশে বেড়াতে যায়। এই পাহাড়ের আরেকটি নাম আছে-তাঙ্গে শাবিখুন বা শাবিখুন প্রণালি। খুররামাবাদ শহরের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত এই পাহাড়টি বেশ উঁচু। মাখমাল কূহ পাহাড়ের শিলাগুলো শৈবালে ভর্তি। বৃষ্টির মওসুম যখন শুরু হয় তখন রোদে পোড়া পাহাড়ের কালো রঙের শৈবালগুলো সবুজ হয়ে ওঠে। পাহাড়ের নামেই পরিচিত চমৎকার এই ঝরনার অস্তিত্বের কারণে খুররামাবাদের মাঝে এই এলাকার জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাখমাল কূহের পরেই ফরেস্ট পার্ক শুরবের কথা বলতে হয়। এটি খুররামাবাদ শহরের আশেপাশে যতগুলো প্রাকৃতিক পার্ক রয়েছে সেগুলোর অন্যতম। এইসব পার্কের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ এখনো চলছে। এই যে ফরেস্ট পার্ক শুরবের কথা বললাম এই পার্কটি খুররামাবাদ মহাসড়ক ধরে পঁচিশ কিলোমিটার পেরিয়ে যাবার পর পোলে দোখতার বা ডটার ব্রিজ নামের চমৎকার জায়গায় অবস্থিত। মসৃণ পিচ ঢালা পথ ধরে এখানে যাবার পর দেখা যাবে অলাচিক মানে বেড়াবিহীন ছাউনি যার ভেতরে বসার বা বিশ্রাম নেয়ার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। ফরেস্ট পার্কে ভ্রমণে গেলে একজন মানুষের যত কিছু প্রয়োজন হয় সবকিছুরই সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। যেহেতু জাঙ্গাল পার্ক বা ফরেস্ট পার্ক সেহেতু এখানে যে প্রচুর গাছ গাছালি থাকবে তা তো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না। আর এইসব গাছগাছালির জন্য এখানকার আবহাওয়াও হয়েছে নাতিশীতোষ্ণ।

বলছিলাম যে ফরেস্ট পার্ক হবার কারণে এখানে রয়েছে প্রচুর গাছ গাছালি। এইসব গাছগাছালির জন্য এখানকার আবহাওয়াও হয়েছে নাতিশীতোষ্ণ। এ কারণেই প্রতি বছর যখন বসন্ত ঋতুর আগমণ ঘটে তখন বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু ভ্রমণ রসিক এই পার্কে বেড়াতে আসে। ভ্রমণকারীদের পদচারণায় এ সময়টা একেবারে জাকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে পুরো ফরেস্ট পার্কের পরিবেশ। খুররামাবাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পেরিয়ে এগিয়ে গেলে এই শহরের আরও একটি চমৎকার নিদর্শন দেখতে পাওয়া যাবে। এটি একটি পবিত্র স্থাপনা। খুররামাবাদ জামে মসজিদ। মসজিদের বর্তমান কাঠামোতে নতুন করে বেশ কিছু সংযোজন ঘটেছে। একটি হলো পিলারযুক্ত শাবেস্তান। এই শাবেস্তানটি চার কোণা সাতটি পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। আর সাত পিলারের উপরে নির্মাণ করা হয়েছে চমৎকার একটি গম্বুজ। না দেখলে বুঝতে পারা কঠিন যে এই গম্বুজটি কতোটা সুন্দর এবং অনন্য সাধারণ।

তো বন্ধুরা! আপনারা যারা প্রকৃতি পছন্দ করেন, প্রকৃতির সান্নিধ্যে অবকাশ যাপনের ইচ্ছা পোষণ করেন, তাঁরা ইরানের অন্যান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি এই খুররামাবাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার বিষয়টিকেও আপনার ভ্রমণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে নিতে ভুলবেন না। কেন বললাম, সেটা একবার ঘুরে এলেই উত্তর পেয়ে যাবেন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য